৩১ জুলাই থেকে ওবায়দুল কাদেরকে দেখেনি কেউ
৩১ জুলাই ২০২৪। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সেদিনের আয়োজন ছিল ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা।
দেশ তখন কোটা আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায় পার করছে। সরকারের ওপর চাপ, দলের ভেতরে অস্বস্তি, মাঠে উত্তেজনা; সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের জন্য সময়টি ছিল সবচেয়ে কঠিন। এমন সময় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের ডাকলেন। ধারণা ছিল, তারা কথা বলবেন, মতামত দেবেন, সংকট মোকাবিলার পথ খুঁজবেন।
কিন্তু যা হওয়ার কথা ছিল, তা হলো না। সকাল গড়িয়ে যখন ওবায়দুল কাদের সভাকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক শতাধিক নেতা—সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন সময়ের সংগঠক। তারা অপেক্ষা করছিলেন আলোচনার জন্য।
কিন্তু ওবায়দুল কাদের আলোচনায় না গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে বক্তব্য শুরু করলেন। এতেই পরিস্থিতি বদলে গেল। সভাকক্ষ থেকেই প্রতিবাদ শুরু হলো।
‘আমাদের ডেকেছেন, আগে আমাদের কথা শুনুন। সংবাদ সম্মেলন করতে হলে আমাদের ডাকলেন কেন?’ একজন নয়, অনেকেই একসঙ্গে এমন প্রশ্ন তুলতে থাকেন। হট্টগোল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কেউ কেউ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাকের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ ওঠে, তার ছেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন—তাহলে তিনি কেন এই বৈঠকে? ওবায়দুল কাদের কয়েকবার সবাইকে শান্ত হতে বলেন। কিন্তু পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে ফেরেনি।
একপর্যায়ে বক্তব্য শেষ না করেই তিনি সভাকক্ষ ছেড়ে নিজের কক্ষে চলে যান।
তিনি বেরিয়ে যাওয়ার সময় সভাকক্ষে ‘ভুয়া... ভুয়া...’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে।
স্লোগানটি করিডোর পেরিয়ে দলীয় কার্যালয়ের বাইরে পর্যন্ত অনুসরণ করেছিল তাকে।
এটি শুধু একটি বৈঠক ভেঙে যাওয়ার ঘটনা নয়। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি ছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হওয়ার একটি মুহূর্ত। যাদের একসময় মাঠের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মী বলা হতো, তারাই প্রকাশ্যে দলের সাধারণ সম্পাদকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
এর ঠিক আগে, জুলাইজুড়ে ওবায়দুল কাদের কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন করেন। আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, ঐক্যের ডাক এবং দলীয় কর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশনা ছিল তার বক্তব্যের মূল বিষয়।
৩১ জুলাইয়ের ওই অনুষ্ঠানের শুরুতেও তিনি বলেছিলেন, ‘বিভেদ ভুলে সবাইকে নাশকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং আওয়ামী লীগ মাঠে থাকবে।’ কিন্তু সেই বক্তব্য শেষ করার সুযোগও তিনি পাননি।
রাজনীতিতে অনেক সময় একটি দিনের দৃশ্যই ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ৩১ জুলাইয়ের সেই সভাকক্ষের বিশৃঙ্খলা ছিল তেমনই একটি ঘটনা।
মাত্র পাঁচ দিন পর, ৫ আগস্ট ২০২৪, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগের প্রায় সব শীর্ষ নেতা আড়ালে চলে যান। আর ওবায়দুল কাদেরও এরপর আর জনসম্মুখে দেখা দেননি।
দীর্ঘদিন ধরে যিনি প্রায় প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলনে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জবাব দিতেন এবং দলের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতেন; হঠাৎ করেই তিনি জনচক্ষুর আড়ালে চলে যান।
৩১ জুলাইয়ের সেই অসমাপ্ত সংবাদ সম্মেলন যেন শুধু একটি বৈঠকের সমাপ্তি ছিল না; বরং একটি রাজনৈতিক অধ্যায়েরও শেষ দৃশ্য ছিল সেটি।
সেদিন সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়া ওবায়দুল কাদেরকে কেউ থামাতে পারেনি।
আর কয়েক দিনের মধ্যেই, বাংলাদেশের রাজনীতিও আর আগের জায়গায় ফিরে যায়নি।

নিজস্ব প্রতিবেদক