অস্তিত্বহীন ৭৪ শিশুর ভুয়া জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, বিচারের মুখোমুখী ইউপি সচিব
লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য অস্তিত্বহীন ৭৪ শিশুকে জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত্যু দেখানো হয়েছে। এতে অস্তিত্বহীন এসব শিশুদের জন্য করা হয়েছে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন। ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) আবুল বাছের ভুয়া এসব জন্ম এবং মৃত্যু নিবন্ধন করেন। ঘটনাটি ঘটেছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী মোহন ইউনিয়নে।
এদিকে বাছেরের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন। পরবর্তীতে তিনিও ঘটনাটি স্বীকার করেছেন। বৃহস্পতির এক চিঠিতে নিবন্ধন সহকারীর ক্ষমতা প্রত্যাহারসহ তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত বাছের চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিবন্ধন সহকারী)। বর্তমানে তিনি সদরের টুমচর ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত রয়েছেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় সূত্র জানা যায়, বিডিআরআইএস সিস্টেমে ৭৪ টি অস্তিত্বহীন শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে ভুয়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছে। চররমনী মোহন ইউনিয়নের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা (নিবন্ধন সহকারী) এ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ডেপুটি জেনারেল (যুগ্মসচিব) মো. লুৎফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে ওই চিঠি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। বাছেরের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের (সমন্বয় ও সংস্কার) সচিব, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ ৭ টি দপ্তরে এ চিঠি প্রদান করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আর জানা গেছে, বাছের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ২৭ আগস্ট ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। সেখানে তিনি লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্র অর্জনের লক্ষ্যে বিডিআরআইএস সিস্টেমের ৭৪ টি অস্তিত্বহীন শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে মৃত উল্লেখ করে ভুয়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বাছেরের নিবন্ধন সহকারীর ক্ষমতা প্রত্যাহার করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ এর (১)(গ) এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিধিমালা ২০১৮ এর ১৯(৪) বিধি মোতাবেক অন্য কোন ব্যক্তিকে নিবন্ধন সহকারীর দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। ভুয়া নিবন্ধনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষিত বিডিআরআইএস সিস্টেমের তথ্যের শুদ্ধতা নষ্ট করার জন্য বাছেরের বিরুদ্ধে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন ২০০৪ এর ২১(১) এবং ২১(৩) ধারা মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং অসদাচরণের জন্য বাছেরের বিরুদ্ধে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী চাকুরী বিধিমালা ২০১১ এর ৩৪ বিধি মোতাবেক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে আবুল বাছের বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অতিরিক্ত চাপে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে ৭৪টি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করেছি। উক্ত নিবন্ধনগুলো সঠিক নয়। তাই উক্ত নিবন্ধনগুলো বাতিল করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি’।
চররমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শুভ্রজিত রায় বলেন, বাছের চররমনী মোহন ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। এখন তিনি টুমচর ইউনিয়নে কর্মরত আছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, অভিযোগটি নিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিষ্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে বাছেরের লিখিত জবাব দেওয়ার কথা ছিল। জবাব দিয়েছেন কি না তা এখনও আমাদের জানা নেই। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় থেকে আমাদের কাছে কোনো চিঠি আসেনি। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেবেন জেলা প্রশাসক। চিঠি আসলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবুল কালাম আজাদ, লক্ষ্মীপুর