ক্ষত সারতেই সময় পার, ঘুরে দাঁড়াবে কবে!
নদীর পানি নেমে গেছে। কিন্তু নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজার থেকে এখনো মুছে যায়নি ভয়াবহ বন্যার ক্ষত। কোথাও ধ্বংসস্তূপ, কোথাও কাদায় মাখা দেয়াল, কোথাও ভেঙে পড়া স্থাপনার চিহ্ন। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাটের সামনে বসে কেউ হিসাব করছেন কী হারিয়েছেন, আবার কেউ কাদা-মাটি সরিয়ে নতুন করে ব্যবসা শুরুর চেষ্টা করছেন। নদী স্বাভাবিক গতিতে ফিরলেও ত্রিশূলীর মানুষের জীবন এখনও ফেরেনি স্বাভাবিক ছন্দে।
২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার প্রায় তিন সপ্তাহ পর সরেজমিনে ত্রিশূলী বাজারে দেখা যায়, ধীরে ধীরে ফিরছে কর্মচাঞ্চল্য। তবে এই ফেরা অনেকটাই সংগ্রামের। বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, পণ্য, সড়ক ও সেতু। অনেক পরিবার হারিয়েছে শেষ সম্বল। কেউ স্বজন হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ হারানো ব্যবসা ও ঘর নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন।
রসুয়া জেলার পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা ভোতেকোশী নদীর ভয়াবহ ঢল ত্রিশূলী নদীর প্রবাহকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। প্রবল স্রোত নদীর দুই পাড়ের জনপদে আঘাত হানে। ত্রিশূলী বাজার ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রাথমিক হিসাবে বাজারসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬০টি বাড়ি বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ত্রিশূলী নদীর ওপর থাকা দুটি পাকা সেতুও।
বন্যার স্রোত শুধু মানুষের বসতভিটা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই আঘাত করেনি; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোও। ত্রিশূলী ও দেবীঘাট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্যার ভয়াবহতার শিকার হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ে। পরে বিকল্প ব্যবস্থায় ত্রিশূলী বাজার ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়। তবে অবকাঠামোর ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।
বিদ্যুৎ ফিরে এলেও মানুষের জীবনে স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। যাদের ঘর ভেসে গেছে, তাদের সামনে এখন আশ্রয়ের প্রশ্ন। যাদের দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সামনে নতুন করে পুঁজি জোগাড়ের চিন্তা। অনেক ব্যবসায়ী পণ্য ও দোকান হারিয়ে এখন শূন্য থেকে শুরু করার অপেক্ষায়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরিষ্কার করে কেউ কেউ ব্যবসা শুরুর চেষ্টা করছেন। কিন্তু আগের অবস্থায় ফিরতে তাদের কত সময় লাগবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ত্রিশূলীর আরেকটি বড় সংকট যোগাযোগব্যবস্থা। বন্যার ধাক্কায় নদীর দুই পাড়ের যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও সংযোগপথ ভেঙে গেছে। ফলে বাজার, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও কর্মস্থলে যাতায়াতেও দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঝুলন্ত সেতুগুলোও এখন পুনর্গঠনের অপেক্ষায়। নেপাল সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ৫৩টি ঝুলন্ত সেতু মেরামত ও পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। নুয়াকোটের কেইউরেনি বাজার, তারুকাঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্গত অঞ্চলের বিস্তীর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো পুনর্গঠনে আরও সময় প্রয়োজন।
ত্রিশূলীর বর্তমান চিত্র আসলে একদিকে ধ্বংসের, অন্যদিকে মানুষের অদম্য ঘুরে দাঁড়ানোর। বাজারের কোথাও এখনো বন্যার রেখে যাওয়া কাদার স্তর। কোথাও পড়ে আছে ভাঙা কাঠামোর অংশ। কোথাও আবার ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনে নতুন করে পণ্য সাজানোর প্রস্তুতি। মানুষের চোখেমুখে ক্ষতির ছাপ স্পষ্ট হলেও জীবন থেমে নেই।
ত্রিশূলীর এই সংকটকে শুধু একটি বাজারের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিংসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীতীরবর্তী বহু জনপদে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। কোথাও মানুষ ঘর হারিয়েছেন, কোথাও জীবিকার প্রধান উৎস হারিয়েছেন।
দুর্যোগের ক্ষত সারাতে এখন বড় ধরনের পুনর্গঠনের প্রস্তুতি চলছে। নেপাল সরকার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষকে পুনর্বাসন এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। নেপাল সরকার প্রাথমিক পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে।
তবে ত্রিশূলীর মানুষের কাছে বড় অঙ্কের পুনর্গঠন পরিকল্পনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এখন দৈনন্দিন জীবন ফিরিয়ে আনা। ঘর হারানো মানুষ চান নিরাপদ আশ্রয়। ব্যবসায়ীরা চান দোকান ও ব্যবসা পুনরায় চালুর সুযোগ। শিক্ষার্থীরা চান স্কুলে স্বাভাবিক পরিবেশ। রোগীরা চান নির্বিঘ্নে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পৌঁছানোর ব্যবস্থা। আর নদীতীরের মানুষ চান ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের আগে কার্যকর সতর্কতা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা।
ত্রিশূলী নদীর পানি এখন অনেকটাই শান্ত। যে নদী কয়েক সপ্তাহ আগে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিল, এখন সেই নদীই যেন স্বাভাবিক জীবনের সাক্ষী। কিন্তু নদীর পাড়ে দাঁড়ালে বোঝা যায়, পানি নেমে যাওয়ার অর্থ দুর্যোগ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। পানি নেমে যাওয়ার পরই শুরু হয় মানুষের আসল লড়াই—ঘর পুনর্নির্মাণ, জীবিকা ফিরিয়ে আনা, যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা এবং হারানো স্বাভাবিক জীবনকে আবার ফিরে পাওয়া।
ত্রিশূলীর মানুষ সেই লড়াইটাই করছেন। কেউ নিজের হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন, কেউ ভাঙা ঘরের পাশে নতুন করে ঘর তোলার জায়গা খুঁজছেন, কেউ আবার দোকানের অবশিষ্ট মালামাল গুছিয়ে বসছেন। তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু প্রত্যাশা এক—দ্রুত পুনর্বাসন এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
বন্যার ক্ষত সারতে সময় লাগবে। ভেঙে যাওয়া সেতু আবার তৈরি হবে, রাস্তা মেরামত হবে, দোকানে আবার পণ্য উঠবে, ঘরবাড়িও হয়তো একদিন আগের মতো দাঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু ত্রিশূলীর মানুষের মনে ২৬ আগস্টের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
প্রশ্ন এখন—কত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে ত্রিশূলী? ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন করে গড়ে উঠতে কতটা সময় লাগবে এই জনপদের? আর ভবিষ্যতের বন্যা থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখতে পুনর্গঠন কতটা টেকসই হবে?
নদী তার নিজের গতিতে ফিরে গেছে। এখন ত্রিশূলীর মানুষের পালা—ক্ষত বুকে নিয়েই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর।

শহীদুল ইসলাম বাবর, নেপাল