বাড়ির আঙিনায় ২০০ প্রজাতির ফুলের রাজ্য, তাতেই কর্মসংস্থান
চিত্রা আর হরি নদীর কূল ঘেঁষা ছোট্ট মেঠো পথ। সেই রাস্তা ধরে আধা কিলোমিটার এগোতেই চোখ জুড়িয়ে যায় সারি সারি বিচিত্র সব গাছে। কোথাও টকটকে লাল, কোথাও সোনালী হলুদ, আবার কোথাও ধবধবে সাদা বা মনভোলা গোলাপি ফুলের মেলা। পাতা বাহারি আর হরেক জাতের ফুলের সৌরভে চারপাশ যেন এক রঙিন ক্যানভাসে আঁকা চিত্রকর্ম।
গ্রামীণ এই অপরূপ দৃশ্যের দেখা মিলবে নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের রামনগরচর গ্রামে। স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা সুচিত্র বিশ্বাসের বাড়ির আঙিনা ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০ প্রজাতির ফুলের এক বিশাল নার্সারি। শখের বশে শুরু করা এই উদ্যান এখন কেবল তার ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমই নয়, বরং স্থানীয় অনেকের আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছয় বছরের চাকরি ছেড়ে ২০২৪ সালে নিজ বাড়ির আঙিনার এক একর জমিতে এই ফুলের নার্সারি গড়ে তোলেন সুচিত্র বিশ্বাস। সুচিত্র বলেন, চাকরির চারদেয়াল ভালো না লাগায় গ্রামে ফিরে নার্সারি করার সিদ্ধান্ত নিই। বর্তমানে আমার নার্সারিতে বাগানবিলাস, জবা, গাদা, গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা ও কৃষ্ণচূড়াসহ প্রায় ২০০ প্রজাতির বৈচিত্র্যময় দেশি-বিদেশি ফুলের চারা রয়েছে। ভেজালমুক্ত ও সঠিক জাতের চারা সরবরাহ করায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। প্রথম বছরেই প্রায় এক লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছি। পাশাপাশি অনলাইনেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার আসছে।
কেবল বাণিজ্যিকভাবে চারা বিক্রিই নয়, সাধারণ মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি আনাই সুচিত্রের মূল লক্ষ্য। প্রতিদিন বিকেলে দূর-দূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী আসেন তার এই ফুলের রাজ্যে। ঘুরে দেখা, ছবি তোলা কিংবা পছন্দের চারা কিনে নিয়ে যাওয়ার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে গ্রামটি।
সম্প্রতি নার্সারি পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ডি. ডি. মল্লিক (ধর্মদাস মল্লিক) বলেন, গ্রামীণ জনপদে এমন নান্দনিক উদ্যোগ সত্যিই বিরল। একসময় এখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস।
এদিকে, এই নার্সারিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে গ্রামীণ কর্মসংস্থান। চারা তৈরি, টব প্রস্তুত করা, নিড়ানি ও পানি দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন সুচিত্রের পরিবারের নারী সদস্যসহ স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিক। নার্সারিতে কর্মরত শ্রমিক আকাশ বিশ্বাস বলেন, নদীর তীরে ছায়াঘেরা পরিবেশে ফুলের চারা পরিচর্যা করা অনেক সহজ ও শান্তির। রাজমিস্ত্রির মতো কষ্টের কাজ না করে গ্রামেই এমন কাজের সুযোগ পেয়ে আমরা ভীষণ উপকৃত হয়েছি।
জুন থেকে অক্টোবর—এই কয়েক মাস চারা বিক্রির ভরা মৌসুম হলেও সুচিত্রের নার্সারিতে বছরজুড়েই থাকে ক্রেতা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের ভিড়। জেলা শহর নড়াইল ছাড়িয়ে আশেপাশের জেলা থেকেও প্রতিনিয়ত মানুষ আসছেন চারা কিনতে। নড়াইল সদর উপজেলার বনগ্রাম থেকে আসা ক্রেতা কৃষ্ণ দেব জানান, পরিবারের সবাইকে নিয়ে হরি নদের তীরের এই চমৎকার নার্সারিতে এসে তার মনে হয়েছে যেন কোনো আধুনিক পার্কে ঘুরছেন।

এম. মুনীর চৌধুরী, নড়াইল