বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের নির্মাণাধীন ভাস্কর্যে জুতোর মালা, নিন্দার ঝড়
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত চত্বর অপসারণ নিয়ে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানোর অভিযোগ উঠেছে। ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, বীরশ্রেষ্ঠের ভাস্কর্যের গলায় ঝুলছে জুতোর মালা। এ ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করে দেশের জন্য সর্বোচ্চ বীরত্বের স্বীকৃতি পাওয়া বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্যে এমন অবমাননাকর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, রাতের আঁধারে কারা ঘটাল এই ন্যক্কারজনক ঘটনা।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে যান সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান। কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গিয়ে তিনি ভাস্কর্য থেকে জুতোর মালা খুলে ফেলেন। পরে বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করেন এবং ঝিনাইদহ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করার উদ্যোগ নেন।
কামালুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাস্কর্যে জুতোর মালা দেখতে পাই। পরে সেটি অপসারণ করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহের নন, তিনি পুরো বাংলাদেশের গর্ব। মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়ে তিনি যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, তার স্মৃতির প্রতি এমন অবমাননা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এর আগেও তার নামে নির্মিত স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এবার জুতোর মালা পরানোর ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমানের অভিযোগ, বারবার একই ভাস্কর্যকে লক্ষ্য করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এবার ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানোর ঘটনাও পূর্বপরিকল্পিত। একটি গোষ্ঠী চায় না বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ঝিনাইদহে স্থাপন হোক। তাদেরই কোনো একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে হামলা, ভাঙচুরের পর এবার জুতোর মালা পরিয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।
ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, ঝিনাইদহ জেলা কমিটি। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু তোয়াব অপু বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতোর মালা দিয়ে অবমাননা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির ঘৃণ্য অপতৎপরতা। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের চেতনাবিরোধী এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাই।
আবু তোয়াব অপু আরও অভিযোগ করেন, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর দুদফা হামলা ও ভাঙচুরের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমলেও দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবার ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানো হয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। রাতে কে বা কারা এই ন্যক্কারজনক কাজ করেছে, তা খুঁজে বের করা হবে। সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুলিশ সুপারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
এর আগে গত ১৭ জুলাই ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত চত্বর অপসারণ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভা চত্বরটি অপসারণের কাজ শুরু করেছিল। তখনই ভাস্কর্য নির্মাণের প্রকল্প-সংক্রান্ত মূল ফাইল খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে। চত্বর অপসারণ নিয়ে সেই বিতর্কের মধ্যেই এবার ভাস্কর্যে জুতোর মালা পরানোর ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মনজুরুল আহসান, ঝিনাইদহ (সদর-কালীগঞ্জ-কোটচাঁদপুর)