স্মরণ
দাদা, সাক্ষাৎকার আর নেওয়া হলো না
কালিকাপ্রসাদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সংগীতের কাঁটাতারের কোনো বেড়া হয় না।’ তাই তাঁকে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী বলব কি না জানি না। কালিকাপ্রসাদের গান সম্পর্কে ধারণা থাকলেও তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় হয়নি, যতটুকু কথা হয়েছে সাংবাদিকতার সূত্র ধরে।
‘ভুবন মাঝি’ ছবির প্রিমিয়ার ও সংবাদ সম্মেলনের জন্য গত পয়লা মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় স্টার সিনেপ্লেক্সে যাই। যথাসময়ে আমরা পৌঁছে যাই সেখানে। দেখি ছবির আমন্ত্রিত অতিথিরাও একে একে আসছেন। সঠিক সময়ে ছবির পরিচালক ফাখরুল আরেফিন উপস্থিত থাকলেও অন্য শিল্পীরা আসতে একটু দেরি করেন সেদিন।
যখন সন্ধ্যা ৭টা বাজল, তখন আমি বুঝতে পারলাম সংবাদ সম্মেলনে ছবির সব শিল্পীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নাও পেতে পারি। পরিচালক ফাখরুল আরেফিনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘অপর্না, মিজান ভাই ও পরম দাদার আসতে আর কতক্ষণ লাগবে? ’ পরিচালক বললেন, ‘ওরা পথে আছে। আসছে।’
পরিচালককে খুব চিন্তিত মনে হলো। কারণ সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, লেখক ও অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, নাট্যব্যক্তিত্ব ও পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান সবাই এরই মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁরা সবাই ছবির শিল্পীদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
আমারও চিন্তা হলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে মিজান ভাইয়াকে ফোন করে বললাম, ‘ভাইয়া, আপনারা কোথায় এখন?’ ভাইয়া জানালেন, ‘আমি এক গাড়িতে আসছি। অন্য এক গাড়িতে ওরা আসছে। নাইস, কালিকা দাদাও এসেছেন।’
আমি বললাম, ‘ভাইয়া, আমার সঙ্গে পরমদার পূর্ব পরিচয় থাকলেও কালিকা দাদার সঙ্গে নেই। ভুবন মাঝি ছবিটা এখনো দেখিনি কিন্তু ছবির গান অনেক চমৎকার করেছেন কালিকা দা। আমি তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। আপনি তাঁর বাংলাদেশের নাম্বারটা একটু দেবেন প্লিজ।’ মিজান ভাই বললেন, ‘কালিকা দাদার নাম্বারটা আমার কাছে এখন নেই। আমি তোমাকে নাম্বার নিয়ে রাতে দিব। তুমি কথা বলো। আর আমাদের পৌঁছাতে আর বেশিক্ষণ লাগবে না।’
যা হোক এর কিছুক্ষণ পর সোয়া ৭টার দিকে কালিকাপ্রসাদকে আমি সরাসরি দেখলাম। খুব দ্রুত হেঁটে এসে পরম দাদা, অপর্না, মিজান ভাই ও কালিকা দাদা সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিলেন। আমি যে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সে পাশ দিয়ে পরম দাদা সংবাদ সম্মেলনে এলেন কিন্তু কালিকা দাদা অন্য পাশ দিয়ে গিয়ে দাঁড়ান। ছবির প্রথম প্রদর্শনী তাই পরম দাদাকে আমি অভিনন্দন জানালাম, কিন্তু কালিকা দাদার সঙ্গে কোন আলাপ হলো না।
সংবাদ সম্মেলনে আমিই বোধহয় একমাত্র সেদিন কালিকা দাদা, পরমদা ও অর্পনাকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রথম প্রশ্ন কালিকাপ্রসাদকেই করেছিলাম, ‘দাদা, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে আপনি সংগীত পরিচালনা করেছেন। কেমন লেগেছে সংগীত পরিচালনা করে?’
দাদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার ও পরমের দুটো সত্তা আছে। এক. আমরা ভারতবাসী, দুই. আমরা বাঙালি। মুক্তিযুদ্ধকে আমরা আমাদেরও ঐতিহ্যের অংশ মনে করি। আমার বাড়ি ঠিক কলকাতায় নয়। আমার বাড়ি শিলচরে। সেখানেই আমার বড় হওয়া। জন্মগতভাবেও আমি একাত্তরের সন্তান। ১৯৭১ সালেই আমার জন্ম। বড় হয়েও আমার অঞ্চলে অনেক ঘটনা আমি দেখেছি। আমি গান গাইছি অনেক দিন ধরে কিন্তু সেই অর্থে চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা এটাই প্রথম। ঘটনাচক্রে আমি ভুবন মাঝি ছবির সংগীত পরিচালনা করেছি। আমি সেভাবে গানও লিখি না। বাংলাদেশে আমার গানও লেখা হলো। একবার শাহবাগ আন্দোলনের সময় প্রাণের তাগিদে গান লিখেছিলাম আর এখন আরেফিনের ছবিতে লিখলাম।’
এরপর দাদাকে ধন্যবাদ জানিয়ে পরমদা ও অপর্নাকে প্রশ্ন করলাম। আমার প্রশ্নের পরই সংবাদ সম্মেলন শেষ হলো। সবাই সিনেমা হলে ঢুকতে ব্যস্ত। আলাদা করে কালিকা দাদা, অপর্না, মিজান ভাই কিংবা পরম দাদার ছবি নেওয়ার সুযোগ হলো না। সবার সঙ্গে হলে বসে ছবিটি দেখলাম।
ছবি দেখা শেষ হলে বাইরে এসে দেখি ফাখরুল ভাই পায়চারি করছেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘ছবিটি কেমন লাগল? ’ প্রথমেই ভাইয়াকে বললাম, ‘ছবির গান অনেক ফাটাফাটি। ছবির শেষ অংশটুকু বেশি ভালো ছিল।’ ভাইয়া বললেন, ‘প্রিমিয়ার শোতে ছবির লাইটিং ও অন্যান্য কিছু সমস্যা দেখলাম। ছবি মুক্তি দেওয়ার আগে এটা ঠিক করে নেব।’
৩ মার্চ ছবি মুক্তি পেল। ছবির সব শিল্পীরা প্রচারণা নিয়ে খুবই ব্যস্ত। বুঝতে পারলাম মিজান ভাই কালিকা দাদার নাম্বার দেওয়ার কথা একদম ভুলে গিয়েছেন। আমিও আর মনে করিয়ে দেইনি। গতকাল মঙ্গলবার আমার অফিসে সাপ্তাহিক ছুটি। বাসায় বসে নারী দিবসের জন্য কী লিখব সেটা ভাবছিলাম। হঠাৎ আনন্দ বাজার পত্রিকায় দেখলাম ‘গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রয়াত দোহারের কালিকাপ্রসাদ’। খুব বিস্মিত হলাম। শিরোনাম দেখে বিশ্বাস করতে পারলাম না। পুরো খবর পড়ার পরও মনে হয়েছিল, ‘কোথায় কি কোনো ভুল হয়েছে?’
এরপর টিভি ছেড়ে কলকাতার তারা বাংলা চ্যানেলে দেখলাম কালিকা দাদাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে অনেক অনুষ্ঠান হচ্ছে। নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর অফিস থেকে ফিচার এডিটর বিধান রিবেরু দাদার ফোন এলো। ফোন দেখেই প্রথমে অনুমান করতে পেয়েছিলাম, কেন তিনি ফোন করেছেন। অনুমান সত্যিই হলো, দাদা বললেন, ‘খবরটা নিশ্চয়ই দেখেছেন। আপনার তো কালিকাপ্রসাদের একটা সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ছিল। নিয়েছেন কি?’ আমি বললাম, ‘না, দাদা, শেষ পর্যন্ত নিতে পারিনি। নাম্বার জোগাড় করতে পারিনি।’
দাদার সঙ্গে কথা বলার পর ফাখরুল আরেফিন ও মাজনুন মিজান ভাইয়াকে ফোন দিলাম। প্রথমেই কেউই ফোন রিসিভ করলেন না। এরপর প্রথমে মিজান ভাই ও পরে ফাখরুল ভাই কল ব্যাক করলেন। মিজান ভাইয়াকে বললাম, “ভাইয়া, সাক্ষাৎকারটা আর নেওয়া হলো না। ভাইয়া বললেন, ‘কলকাতায় ফেরার আগের রাতে ডিনারের সময় হঠাৎ করে কী প্রসঙ্গে যেন তোমার ব্যাপারে কালিকাদা ও পরমের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল।’
এর কিছুক্ষণ পর ফাখরুল ভাইয়া ফোন করে জানালেন তিনি কলকাতায় যাচ্ছেন। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে আরো বললেন, ‘তোমরা দাদাকে ভালোভাবে শ্রদ্ধা জানিও। এবার দাদার বাংলাদেশের নাম্বার ছিল না। তাই তোমাকে হয়তো দেওয়া হয়নি।’
কালিকা দাদা এখন আর নেই। আমার সাক্ষাৎকারও আর কখনো নেওয়া হবে না। শুধু একটা আফসোস থেকেই গেল। প্রিয় কালিকা দাদা, আপনার সঙ্গে আমিও একমত। সংগীতের কাঁটাতারের কোনো বেড়া হয় না। আমি রংপুর অংঞ্চলের মেয়ে। আপনি সব সময় রংপুরের ভাওয়াইয়া সংগীতের প্রশংসা করতেন। দাদা, আপনার গাওয়া লোকগান বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, থাকবেন আপনিও। থাকবে ‘দোহার’। আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকবেন।
লেখক : সাংবাদিক

নাইস নূর