বদরুলের যাবজ্জীবন ও ছাত্রলীগের ভবিষ্যৎ-শিক্ষা
কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিস হত্যাচেষ্টার রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে একমাত্র আসামি বদরুল আলমকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
এ রায় গুরুত্বপূর্ণ বিবিধ কারণে। প্রথমত, দ্রুততার সঙ্গে এ বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এক নারীর ওপর আঘাতের বিচার হয়েছে।
গত বছরের ৩ অক্টোবর সিলেটের এমসি কলেজ প্রাঙ্গণে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে উপর্যুপরি চাপাতির আঘাতে আহত হন খাদিজা। ঘাতক বদরুল একের পর এক কোপাতে থাকে খাদিজাকে। এরপর আহত খাদিজাকে এমসি কলেজে থাকা কয়েকজন তরুণ সিলেটের হাসপাতালে পাঠালে সেখান থেকে ঢাকায় এবং এরপর সাভারের দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে প্রাণে বাঁচা, এখন সুস্থতার পথে খাদিজা।
ঠিক মৃত্যুর মুখ থেকে এভাবে ফিরে আসা ঘটনাকে সত্যিকার অর্থে বিরল এবং সেটাই হয়েছে খাদিজার ক্ষেত্রে। আদালত তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে সে বিষয়টিও উল্লেখ করে বলেছেন, ‘খাদিজা অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক জীবন্ত কিংবদন্তি নারী। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত পাষণ্ড প্রেমিকের চাপাতির নৃশংস আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত খাদিজা দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মৃত্যুর কাছে হেরে না যাওয়া সমগ্র বিশ্ব নারী সমাজের প্রতিভু, বিজয়িনী, প্রতিবাদী।’
এ মামলা নিষ্পত্তিতে পাঁচ মাস সময় লেগেছে মূলত খাদিজার জন্য। খাদিজার জীবনের ঝুঁকি যখন দূরে সরে যায় তখনই মূলত চার্জশিট হয়, আর সর্বশেষ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন খাদিজাই। তবু এটা এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে দ্রুতগতির রায়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এক নারীর ওপর নির্যাতনের বিশেষত প্রাণে মারার অপচেষ্টার এ রায়ের ক্ষেত্রেও আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার ৩০ পৃষ্ঠার রায়ে বলেন, আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসে খাদিজাকে নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে কোপানোর অভিযোগে আসামি বদরুলের যথোপযুক্ত শাস্তি নারীদের সুরক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত বদরুল আলম প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করতে চেয়েছিল খাদিজাকে। বিচারে এ বিষয়টিও উঠে এসেছে। রায়ে আদালত বলেন, মানব-মানবীর মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা চিরন্তন। প্রেম-ভালোবাসায় মিলন, বিরহ থাকবেই। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে এমন পৈশাচিক, নৃশংস আচরণ মোটেই কাম্য ও আইন সমর্থিত নয়।
আদালতের এসব পর্যবেক্ষণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
এদিকে, রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী খাদিজার চাচা। তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অপরদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী এ রায়কে ‘আবেগপ্রবণ রায়’ হিসেবে উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে গিয়ে তাঁর ভাষায় ন্যায়বিচার পাবেন বলে জানিয়েছেন।
খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বদরুলের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশের পর অনেকেই সন্দিহান ছিলেন আদৌ বিচার হবে কি না, তা নিয়ে। কারণ বদরুল ছিল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগের সহসম্পাদক। খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার সময়ও তার সে সাংগঠনিক পরিচয় বর্তমান ছিল। কিন্তু এরপর ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি জানায় ছাত্রাবস্থায় চাকরিতে যোগ দেওয়ার কারণে ছাত্রলীগের পদ বাতিল হয়েছে তার। ফলে তারা সাংগঠনিকভাবে কোনো বহিষ্কারের চিঠিও দেয়নি।
সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী চাকরিতে যোগ, কিংবা বিয়ে করলে ছাত্রলীগের পদ বাতিল হয়ে যায়- এটা সত্য। কিন্তু একটা নৃশংস ঘটনা ঘটার পর ‘ও এখন আমাদের আর নাই’ এমন অস্বীকার তত্ত্ব নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদ বাতিলের যে ব্যবস্থা আছে সেটা ছাত্রলীগ কিংবা কোনো ছাত্রসংগঠনই পালন করে বলে দেখা যায় না। বদরুলের ক্ষেত্রে তখনই গঠনতন্ত্র আসল যখন সে মানুষ হত্যায় চাপাতি হাতে নিয়ে ঘটনাস্থলেই ধরা পড়ল, এবং সাংগঠনিক পরিচয় প্রকাশ পেল। অপরদিকে, এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যেখানে ছাত্রনেতারা ঘটা করে বিয়ে করছেন এবং সেসব বিয়েতে কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত থাকছেন।
একজন ছাত্রের বিয়ে করাটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু যখন একজন ছাত্র ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি পান, আর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাঁর নেতৃত্ব চলে যাওয়ার কথা; কিন্তু এরপর কেবল বিয়ের কারণে ওইসব ছাত্রনেতার সাংগঠনিক পদ বাতিল হয়েছে বলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে সংগঠন এমন নজির নাই। তা ছাড়া অনেক বিবাহিত ছাত্র বিভিন্ন সংগঠনের পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন, এটা ছাত্রলীগেও হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ‘ও আমাদের নয়, দায়িত্ব নেব না’ এমন বাক্য উচ্চারণ করতে দেখা যায় না। এটা নীতিগত প্রশ্নে যে সাংঘর্ষিক সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বদরুলের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের অস্বীকার তত্ত্ব ভালো কোনো দৃষ্টান্ত হয়নি। ছাত্রলীগ পারত সে দায় নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বদরুলকে বহিষ্কার করতে। ‘ও এখন আমাদের নয়’ এ ধরনের তত্ত্ব কপচানোর মাধ্যমে ব্যক্তির দায়কে সংগঠনের ওপর নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তারা টের পায়নি সবকিছু অস্বীকার করার উপায় থাকে না। সাংগঠনিকভাবে স্বীকার করে নিলে সংগঠনের মধ্যে মুখোশের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অপরাপর বদরুলরা সতর্ক হতো। কিন্তু সেটা হয়নি।
খাদিজা আক্রান্ত হওয়ার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বদরুলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয় প্রকাশের পর স্রেফ একটা প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ছাত্রলীগ দায় এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, সেটা কী পেরেছে আদৌ? পারেনি! কারণ একটা সময়ে সব সমালোচনা গিয়ে পড়ে ছাত্রলীগের ওপর। যখন বিবৃতি এলো তখন আর ফেরার পথ ছিল না তাঁদের, কিন্তু স্বীকার করে নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে সে প্রশংসা কুঁড়াতে পারত ছাত্রলীগই। তরুণ ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে সেটাই ছিল কাঙ্ক্ষিত।
বদরুলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের যে শাস্তি ঘোষণা হয়েছে প্রাথমিক বিচারে, আমরা আশা করি উচ্চ আদালতের রায়ের ক্ষেত্রেও সেটা অব্যাহত থাকবে। আদালত সব পক্ষের বক্তব্য, ঘটনার পূর্বাপর এবং আলামতের ভিত্তিতে যে রায় দিয়েছেন সেখানে দীর্ঘ পরিকল্পনার মাধ্যমে হত্যা চেষ্টার কথা ওঠে এসেছে, ওঠে এসেছে বদরুল ও খাদিজার পূর্বপরিচয়ের কথাও। রায়ের পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য আমাদের আশাবাদী করছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত এ রায় টিকবে বলে।
এ মামলার একজন তৃতীয় পক্ষের পর্যবেক্ষক হিসেবে বলতে পারি, ব্যক্তি বদরুল, ছাত্রলীগ নেতা বদরুল- কেউই আমাদের শত্রু ছিল না। আমাদের মূল দৃষ্টি ছিল কৃত অপরাধের ওপর, আর সে হিসেবে ন্যায়বিচার হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। দ্রুতগতিতে সম্পাদিত এ রায় নিঃসন্দেহে দৃষ্টান্তমূলক।
বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ পুলিশ প্রশাসন ও সরকারকে। বড় একজন ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে বদরুল পার পায়নি- এটাই সন্তুষ্টি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যম এ নৃশংস ঘটনাকে সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও দাবির মধ্যে শেষ পর্যন্ত রাখতে পেরেছিল বলে ছাত্রলীগ নেতা ও সন্ত্রাসী বদরুল আলমের বিচার সমাপ্ত হলো।
খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলার বিচার নিয়ে এত এত সন্তুষ্টির বাইরে হতাশার জায়গা একটা থেকে গেল; আর সেটা অস্বীকার তত্ত্ব ও বদরুলের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কাগজ-কলমে ছাত্রলীগ বদরুলের সাংগঠনিক পরিচয় অস্বীকার করেছে ঠিক, কিন্তু এ অস্বীকার যৌক্তিক ছিল না, ছিল না অনুকরণ ও অনুসরণযোগ্য কিছু। এখন হয়তো শোধরানোর সুযোগ নাই, তবে ভবিষ্যৎ-শিক্ষার প্রয়োজন আছে ছাত্রলীগের।
কবির য়াহমদ : কবি ও সংবাদকর্মী।
ইমেইল: kabiraahmed007@gmail.com

কবির য়াহমদ