অভিমত
মোবাইল সংস্কৃতি ও আত্মকেন্দ্রিকতা
আমরা মোবাইল বা ফেসবুকের কল্যাণে অনেক খবর আগেই পেয়ে যাচ্ছি। সিলেটে খাদিজাকে কুপিয়েছে বদরুল, আমরা টেলিভিশন বা পত্রিকায় হয়তো এ খবরটা একটু পরে জানতাম। কিন্তু ফেসবুকের কল্যাণে আমরা সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের আগেই জেনেছি। গণজাগরণ মঞ্চের অহিংস আন্দোলনের ঘটনাও ফেসবুকের মাধ্যমে বেশি প্রচার হয়েছে; যা পরবর্তী সময়ে সব মিডিয়া গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। এ কথা সর্বজনবিদিত যে ফেসবুক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে এই মোবাইল বা ফেসবুক কি আমাদের আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে? যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধুদের ঘরোয়া আড্ডায় আগের মতো কি এখন সেই আন্তরিকতা লক্ষ করা যায়? সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই যেন পছন্দ করে।
‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম কত আগে কথাটা বলে গেছেন। সেই কথাই যেন সত্যি হতে চলেছে। আগের সেই সোনালি দিনগুলি নিয়ে আফসোস করে তাই তো কিছু আবেগ অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ, নীরবে নিভৃতে।
আমরা যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি। ইটপাথরের নগর সভ্যতা আমাদের রোবট বানিয়ে দিচ্ছে। আবেগ অনুভূতি বোধশক্তি সব যেন কমে যাচ্ছে। প্রাণ খুলে হাসতে ভুলে যাচ্ছি। গল্প করার সময় কই আমাদের? বাসায় কেউ এলে কেমন আছি বলতে না পারলেই যেন বেঁচে যাই। মোবাইল চেপেই গত মাসে জেনেছি, যে আত্মীয় বাসায় এসেছেন তিনি কেমন আছেন। এখন আবার প্রশ্ন করে বা কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করার কী প্রয়োজন। এ রকম মানসিকতা যেন গড়ে উঠছে আমাদের মধ্যে।
আমাদের শিশুরা তাদের দাদা-দাদির কাছে ঘেঁষতে চায় না এখন, চায় না রাতে তাঁদের পাশে শুয়ে গল্প শুনতে। তারা মোবাইলে তখন বন্ধুদের সঙ্গে ইমোতে কথা চালাচালিতে সময় পার করছে। গ্রাম থেকে আসা মুরুব্বিরা আশা করেন ছেলের বা মেয়ের ঘরের নাতি-নাতিনদের সঙ্গে কথা বলে প্রাণ জুড়িয়ে নেবে। কিন্তু সেটা করতে না পারায় সপ্তাহ পার না হতেই তাঁরা ছেলেমেয়েকে বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য টিকেট কেটে দিতে বলেন। একটা প্রজন্ম যদি এভাবে গড়ে ওঠে, তা হলে আমাদের মায়া-মমতা-ভালোবাসা শব্দগুলো শুধু অভিধানেই থেকে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পারিবারিক বন্ধন বলে কিছু আর থাকবে না।
নাগরিক জীবনে সামাজিক অনুষ্ঠানেই আজকাল পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে। কারণ কর্মব্যস্ত জীবনে সবাই যার যার পেশা নিয়ে বা জীবনজীবিকা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। যান্ত্রিক জীবনে একটু গল্প করা বা সংসার জীবনের বাইরে মনের কথা খুলে বলার পরিবেশ হচ্ছে সামাজিক অনুষ্ঠান। কেমন যাচ্ছে দাম্পত্য জীবন, পড়াশোনা, পারিবারিক জীবন এসব নিয়ে মিঠে খুনসুটি করার উপযুক্ত স্থান সামাজিক অনুষ্ঠান। এর বাইরে বন্ধুর বাড়িতে আড্ডা বা বার্ষিক বনভোজন এসব আয়োজনেও মন খুলে কথা বলা যায়।
তবে আজকাল দেখা যায় ভিন্নচিত্র। বন্ধুদের আড্ডায় কতদিন পর সবার সঙ্গে সবার দেখা হয়। কে কোথায় কেমন আছে সেটা জানার জন্য মনটা উশখুশ করে কারো কারো। কিন্তু দু-একজন বাদে বেশির ভাগ মানুষকে দেখা যায় হাতে রাখা লেটেস্ট মডেলের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। কেউ হয়তো ফেসবুকে চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত, কেউ বা ইউটিউবে গিয়ে কোনো মুভি দেখছে, নইলে লেটেস্ট কোনো মিউজিক ভিডিও নিয়ে ব্যস্ত।
বনভোজনে গেলে দেখা যায়, বাবা-মায়ের সঙ্গে আসা শিশু-কিশোররা ব্যস্ত মোবাইল নিয়ে। বাবা-মা ব্যস্ত তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে। নতুন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা করার বদলে মোবাইল নিয়েই চুপচাপ থাকছে। মানসিকভাবে ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছে শিশুরা। তারা মনে করে এটাই জীবন। এর বাইরে কোনো পৃথিবী নেই। তাদের পৃথিবী হচ্ছে বিদেশি টেলিভিশনের কিছু সিরিয়াল আর রিয়েলিটি শো। অর্থাৎ আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বেড়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিকতার মধ্য দিয়ে।
আরেকটি বিষয় ইদানীং দেখা যায় কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর সেখানকার মূল যে বিষয় সেটা থেকে সরে গিয়ে অনেকেই সেলফি তোলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কে কার সঙ্গে সেলফি তুলছে কোনো তোয়াক্কা নেই। বিনা অনুমতিতেই তোলা হচ্ছে সেলফি। ন্যূনতম ভদ্রতার লেশমাত্র নেই, কাউকে কাছে পেয়ে মুখচোখ ভেংচি কেটে তুলছে সেলফি।
সেলফি সংস্কৃতি আমাদের ব্যক্তিজীবনকে কি প্রকাশ্য করে দিচ্ছে না? আমাদের যে হাজার বছরের সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য রয়েছে সেগুলো থেকে কি দূরে সরে যাচ্ছি না? অবশ্যই আমরা প্রিয়জনদের পাশে নিয়ে ছবি তুলব। তাদের জড়িয়ে ধরে আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করব। তবে তার মধ্যে শালীনতাবোধ অবশ্যই থাকা উচিত। কারণ পারিবারিক মূল্যবোধ এখনো আমাদের অনেকের কাছে মূল্যবান।
এখন সবকিছুর মধ্যে অভিনয়টা ঢুকে গেছে। সবকিছুতেই রং মাখানো সং সাজানোর বিষয়টা বোঝা যায়। ফেসবুকে যখন আমরা কারো মৃত্যুর খবর দিচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে লাইক পড়ে যাচ্ছে। কেউ গুরুতর অসুস্থ, সেই ছবি ফেসবুকে আপলোড করার সঙ্গে সঙ্গে লাইক পড়ে যাচ্ছে। তার মানে কি? আমরা কেউ বুঝে কেউ না বুঝে আধুনিক হয়ে ওঠার ভান করছি।
আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে কোন বয়সে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তুলে দিচ্ছি এই যন্ত্রটি? সেদিকে একটু নজর দেওয়া দরকার, এখনই।
আমরা চাই আমাদের পারিবারিক বন্ধন অটুট থাক। পাশাপাশি বিশ্বের কোথায় কখন কী ঘটছে সেটা জানার জন্য জানালাটাও খোলা রাখব। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠুক জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয়। মায়া-মমতা-ভালোবাসা এ শব্দ থেকে কখনোই যেন সরে না যাই আমরা।
লেখক : ছড়াকার, সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম