মমতা সব সময়ই গোলযোগ পাকান
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরের বিষয়ে আমি আশাবাদী। এর প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমটি হলো, অটল বিহারি বাজপেয়ি বা মনমোহন সিং তাঁদের সরকার চালানোর জন্য মমতার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন; নির্ভরশীল ছিলেন কোয়ালিশন সরকার গঠনের জন্য।
দ্বিতীয় কারণ, কোয়ালিশন সরকারের যে বাধ্যবাধকতা তার বাইরে তাঁরা যেতে পারেননি। এটা নির্বাচনী রাজনীতির পাটিগণিতীয় ব্যাপার।
তিন নম্বর বিষয়টি হলো, নরেন্দ্র মোদি ইচ্ছে করলেই মমতাকে বাদ দিয়ে চুক্তি করতে পারেন। মমতাকে বাদ দিলে নরেন্দ্র মোদির কিছুই হবে না।
মমতাকে বাদ দিলে কিছুই হবে না, এর যথেষ্ট কারণ আছে। কংগ্রেস এবং বামপন্থী দলগুলো মমতার ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছে। মমতাকে তাঁরা বকাবকি করছে। মমতার ইনটেনশন নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে।
মমতাকে নিয়ে দুটো কথা বলে রাখি। পাকিস্তানে শিল্প দেখার কী আছে? মমতা পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তিনবার রিসিভ করেন, রেড কার্পেট সংবর্ধনা দেন। কলকাতা প্রেসক্লাবের ১৭ জনকে পাকিস্তানের শিল্প দেখান। পাকিস্তানে কী শিল্প আছে মশাই?
দুই বাংলার মধ্যে সম্পর্ক মমতা সর্বনাশ করেছেন। মমতা পানি বিশেষজ্ঞ নন। উনি ঝুলির থেকে বের করে ছেড়ে দিচ্ছেন। ‘আমি তিস্তা দেব না’, এটা তিনি হঠাৎ করে বললেন।
২০১১ সালে মমতা (পানি নিয়ে) বিরোধিতা করেছিলেন। সেখানে তিনি কমিশন গঠন করেছিলেন কল্যাণ রুদ্রকে প্রধান করে। কমিশন গঠন করা হলেও সে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি।
নরেন্দ্র মোদি বাজপেয়ি কিংবা মনমোহন সিং নন। ভারতের অন্য দল (কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট) বাংলাদেশ, তিস্তা এগুলো নিয়ে চিন্তিত নয়। তাদের সার্বিক ব্যাপার হচ্ছে তারা মনে করে বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু।
সম্প্রতি দ্য হিন্দু পত্রিকা আর সিএসডিএস (সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ডেভেলপিং সোসাইটি) একটা জরিপ করেছে ১১টা শহরে। সেখানে ২৫ হাজার লোকের ওপর সার্ভে করা হয় ভারতের বন্ধুদেশ কোনটি সে সম্পর্কে। কলকাতা বা ত্রিপুরায় নয়, বাংলাভাষী এলাকা বাদে গোটা ভারতে এই জরিপ হয়েছে। সেখানে প্রশ্ন ছিল, কোন দেশটিকে তারা সবচেয়ে বেশি বন্ধু বলে মনে করে। সবাই ভেবেছিল রাশিয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল সেটি বাংলাদেশ। ৪৮ শতাংশ মানুষ বলেছে, বাংলাদেশ আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। এবার যদি আপনারা ভারতের মিডিয়া কাভারেজটা দেখেন, সেখানে লেখা হচ্ছে পে ব্যাক টাইম, শেখ হাসিনা শ্যুড বি গিভেন দিস, দ্যাট এবং মমতাকে যথেষ্ট মিডিয়া ক্রিটিসিজমের মুখে পড়তে হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি সব সময়ই একটা গোলযোগ পাকান।
এ বছরের মধ্যে শুধু তিস্তা নয়, অন্য নদীগুলো নিয়েও সাত থেকে আটটা চুক্তি হবে বলে আমি মনে করি। এখানে কংগ্রেসও সমর্থন করবে। আর আসাম, মেঘালয়ের মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোও সহযোগিতা করবে।
বাংলাদেশ ইজ ভেরি স্ট্রং নেশন। শুধু ইন্ডিয়ান আর্মির সহযোগিতার কারণে এমনি এমনি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এ দেশের মানুষের বিরাট স্যাক্রিফাইসের কারণে। আওয়ামী লীগ প্র্যাক্টিক্যাল ইন্ডিয়ান পলিটিকস বেশি বোঝে।
বাংলাদেশ চায় চীন-ভারতের সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো থাক। কারণ আমাদের দুজনেরই প্রয়োজন।
রাশিয়া ভারত থেকে যদি মিগ বানায়, তাহলে সেই মিগ বাংলাদেশও কম দামে কিনতে পারে। ইন্ডিয়ান আর্মি মনে করে, বাংলাদেশের আর্মির সঙ্গে হিস্টোরিক সম্পর্ক আছে। বাংলাদেশ আর্মিরা চীনের বিভিন্ন স্টাফ কলেজে যায়। কিন্তু তারা এটা নিয়ে আমাদের এখানে আসতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত কৃষকের দেশ। আপনি কত বড় বড় চুক্তি করছেন তা কৃষক বুঝবে না। তারা বুঝবে পানি আসছে কি না। না আসলে আপা কি আনল!
বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনেছে এটা কোনো সমস্যা না। সমস্যা চীনের খেলাধুলা নিয়ে। আমি পানি দিতে পারিনি তাই সাবমেরিন ইস্যু নিয়ে যেন অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া না হয়, মমতার এখন টাকা পয়সার দরকার। তা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ।
সুবীর ভৌমিক, ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক
(বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর নিয়ে এনটিভির এক অনুষ্ঠানে কথা বলেন সুবীর ভৌমিক। তাঁর কথাগুলো পাঠকদের জন্য লেখা আকারে প্রকাশ করা হলো।)

সুবীর ভৌমিক