তাহলে পুনর্নির্মাণই হোক
কোনটা ভাস্কর্য আর কোনটা মূর্তি, সেটা নিয়ে এখন আলোচনা অনেকটা বিমূর্তই হবে বটে। খোদ ইসলামী তাত্ত্বিকদের মধ্যেও এ নিয়ে বিস্তর বিরোধ আছে। বিভিন্ন ইসলামী রাষ্ট্র বা সমাজে এ নিয়ে নানা ধরনের অনুশীলন আছে। কারণ, প্রতিটি সমাজের কিছু সংস্কৃতি বা জীবনাচরণ থাকে, যাকে চাইলেই ধর্ম ফেলে দিতে পারে না।
আমাদের দেশে এই ভাস্কর্য নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা চালু আছে। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলে, এ দেশে যেসব মাওলানা বা আলেম এর সমালোচনা করেন, তাঁরা ক্ষেত্রবিশেষে আলাদা মাসআলা দিয়ে থাকেন। কোনটা মানছেন আর কোনটা মানছেন না, ধরা মুশকিল। তবে গড়পড়তা দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাস্কর্য নিয়েই এ দেশের আলেম সমাজ, বর্তমানে যার একটা অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছে কওমিপন্থী আলেমগণ, বেশি উদ্বিগ্ন হন। যেমন ধরুন কিছু বছর আগে, বিমানবন্দরের সামনে লালনের ভাস্কর্যটা ভেঙেই ফেললেন তাঁরা। কী দোষ ছিল লালনের? তিনি তো গ্রিক বা পাশ্চাত্যের কেউ নন! বাঙালির মনের মানুষ। সম্প্রতি পতনের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে হাইকোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটি।
এই বিরোধিতার কারণ হিসেবে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা ভাস্কর্য এবং কোনো সংস্কৃতির বিরোধী নই। বাংলাদেশের ঐতিহ্য বা ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে মিল রেখে ভাস্কর্যটি করা হলে আপত্তি থাকত না। কিন্তু এটিকে গ্রিক দেবীকে হায়ার করে এনে করা হয়েছে। সে জন্যই আমাদের আপত্তি।’
বটেই! বাংলাদেশ একটি বহু ভাষিক, বহু ধর্মের মানুষের দেশ। যেহেতু বিচারব্যবস্থা একটা জাতীয় বিষয়, তাই সবার পছন্দকে বিবেচনা করাটা যৌক্তিকই বটে। আর এখানে ‘গ্রিক দেবীকে হায়ার করে আনার’ এ বিষয়ের সঙ্গে আমি একমত হেফাজত মহাসচিবের সঙ্গে। তবে আমার বোঝার ধরনটা একটু অন্য রকম।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য স্থাপন আসলে আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতারই প্রকাশ। কিংবা এটাকে বলতে পারেন আমাদের পাশ্চাত্য-নির্ভরতা। আমাদের দিনের সূর্য এখনো পূর্বে উঠলেও জ্ঞানের সূর্য কিন্তু এখনো পশ্চিমেই উদিত হয়। পশ্চিমের এই আরাধনা আমাদের জাতিসত্তার ধারণাকে যেমন দুর্বল করে, তেমনি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির খোঁজখবর আর তার বিকাশও বাধাগ্রস্ত করে। ব্রিটিশদের দেওয়া কালো গাউন আর আইনেই তাই আমরা আটকে থাকি যুগের পর যুগ। আমাদের স্বতন্ত্রতা তৈরি হয় না। এখানে এটাও বলে রাখা জরুরি যে এ দেশের আলেম-ওলামারাও ইসলাম পালনের ক্ষেত্রে আরবসহ বিভিন্ন ইসলামী ধারাকে হুবহু অনুসরণের চেষ্টা করেছে, স্থানীয় সংস্কৃতি কখনো ধারণ করতে তো চায়ইনি, বরং তাকে অনেক ক্ষেত্রে বিজাতীয় বলে তাচ্ছিল্যও করেছে। ফলে ইসলামের সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির একটা বিরোধ সব সময়ই ছিল এবং চলছে।
তবে এখানটায় মেলাতে পারি না, যেসব আলেম এখন ভাস্কর্য নয়, বরং গ্রিক দেবীর কারণে বিরোধিতা করছেন বলে দাবি করছেন, সেই তাঁরাই বা তাঁদের আলেমরা কেন বিমানবন্দরে গড়া লালনের মূর্তি উপড়ে ফেলার চেষ্টা করলেন? সেটি অপসারণের জন্য দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন? তখন তাঁদের যুক্তি ছিল, সামনে হজক্যাম্প, এটা হাজিদের জন্য সমস্যা তৈরি করবে। আর এমন সমস্যার কথা বললে তো হাজিদের চোখ বন্ধ করে হাঁটতে হবে! তাহলে এটা বলা কি সমীচীন হবে যে দুর্জনের ছলের অভাব হয় না!
আদালতের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যটি নিয়ে আরেকটি অভিযোগ অনেকেই তুলেছেন। তা এর শ্রী। গ্রিক দেবীকে অযথা শাড়িই বা পরাতে গেলেন কেন এর ভাস্কর্য মৃণাল হক, যাকে অবশ্য অনেকে ভাস্কর্যশিল্পী না বলে বলেন ভাস্কর্য-ব্যবসায়ী। আর গোটা কাজ এত এবড়োখোবড়ো করে করেছেন, ফলে এটি দেখতে ভালো হয়নি। মনে হয় স্বয়ং গ্রিক দেবী থেমেসিসও এটি দেখলে লজ্জা পেতেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, তাঁর কাছেও এই ভাস্কর্য ভালো লাগেনি। কওমি আলেমদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের সুপ্রিম কোর্টের সামনে গ্রিক থেমেসিসের এক মূর্তি লাগানো হয়েছে। সত্য কথা বলতে কি, আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। কারণ, গ্রিক থেমেসিসের মূর্তি এখানে কেন আসবে? এটা তো আমাদের দেশে আসার কথা নয়। সেখানে মূর্তি বানিয়ে তাকে আবার শাড়িও পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার করা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তাঁরও মূল আপত্তি গ্রিক দেবী থেমেসিসে, ভাস্কর্যে নয়। যেমনটি বলেছে কওমি আলেমদের সংগঠন হেফাজতে ইসলামও। অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যেও আমি এমন অভিযোগ পেয়েছি। সুতরাং সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্য অপসারণের যে দাবি উঠেছে, তার সঙ্গে আমি একটু দ্বিমত করে প্রস্তাব করতে চাই, এটি বদল করে অন্য কোনো ভাস্কর্য স্থাপন করা হোক। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নিজেও বলেছেন এই ভাস্কর্য অপসারণের জন্য, যা করার তিনি করবেন। তাই তাঁর কাছেও অনুরোধ, বিষয়টা একটু অন্যভাবে দেখা। কারণ, ভাস্কর্য তো সমস্যা নয়, সুতরাং সেটি অপসারণের কিছু নেই; বরং যেটি সমস্যা, তার সমাধান করতে পারি আমরা। এ জন্য তিনি একটি কমিটি করেও দিতে পারেন দেশের প্রখ্যাত ভাস্কর্যশিল্পীদের নিয়ে। যাঁরা বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য ও দেশি সংস্কৃতিকে মাথায় রেখে একটি ভাস্কর্যের প্রস্তাব রাখবেন।
কারণ, এরই মধ্যে আমরা দেখছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে হেফাজতের দাবির মুখে ভাস্কর্য অপসারণের অনেক সমালোচনা হচ্ছে। কারণ, আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অনেকের মতে, দেশে রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের অন্যায্য দাবিও সরকার তার ক্ষমতার রাজনীতির কারণে মেনে নিচ্ছে। ফেসবুকে তো এমন প্রশ্নও কেউ কেউ তুলছেন যে এমন একসময় আসবে, যখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যও অপসারণের দাবি এলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। বিষয়টি যাতে এমন না হয় ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।’
সুতরাং সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বিষয়টা যাচাই করে দেখা উচিত যে তারা কি আসলেই গ্রিক দেবীর কারণেই এর বিরোধিতা করছেন, নাকি প্রকৃতপক্ষে ভাস্কর্যবিরোধী? কোনো ধরনের যুক্তির ধার না ধরে সরকার যদি ভাস্কর্য অপসারণ করে, তাহলে আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হবে যে অন্য যে কারো চেয়ে হেফাজতই বেশি প্রভাবশালী। হেফাজতের যেকোনো সিদ্ধান্ত সরকার মেনে নিতে বাধ্য হলে এমন ধারণাই দিন দিন পোক্ত হবে। তখন কিন্তু আওয়ামী লীগকে ফের প্রগতিশীল জনগণের কাছে ধরনা দিতে হবে তাদের সামলানোর জন্য। তখন ‘রাখাল বালক আর বাঘের গল্পটা’ পুনরাবৃত্তি হলে কী বলবেন আওয়ামী লীগ ও তার সঙ্গী-সাথি সমর্থকরা!
কিছু ধর্মান্ধ মানুষের বেকুবির নমুনা এরই মধ্যে আমরা দেখতেও পাচ্ছি। পয়লা বৈশাখের মাত্র একদিন আগে, চট্টগ্রামে চারুকলা শিক্ষার্থীদের আঁকা বৈশাখী আলপনা পোড়া পেট্রল দিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তারা। মঙ্গল শোভাযাত্রাকেও তাঁরা দেখছেন ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে। এমন অবস্থায়, যদিও মুখে বলছে তারা ভাস্কর্য বা সংস্কৃতিবিরোধী নয়, কিন্তু বাস্তবে তা কতটা সত্য, সেটা বোঝা সত্যিই মুশকিল আছে! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দলকে মনে রাখতে হবে, তাদের সমর্থন বা ছাড়ের কারণে একটু একটু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি পেতে থাকবে হেফাজতের মতো শক্তিগুলো, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেহারা দিন দিন রুগ্ণ হবে বৈকি! হয়তো আওয়ামী লীগকে সেই ১৯৫৫ সালে বাদ দেওয়া ‘মুসলিম’ শব্দটা দলের নামের পেছনে লাগানোরও দরকার হতে পারে। হয়তো হেফাজতই দাবি করে বসল!
লেখক : জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

তপন মাহমুদ