অভিমত
সরকারের জন্য খুব মায়াই হয়!
আমরা হলাম গিনিপিগ। আমাদের কোনো ভালো-মন্দ নেই। আমাদের নেই প্রতিবাদ করার ভাষা। কার কাছে জানাব আমাদের সমস্যার কথা? যাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন, তারা তো নিজেরাই অসহায়। কারণ তাঁদের দলের অনেকেই আজ এই সমস্যা তৈরি করে বগল বাজাচ্ছেন। আর একবার গাইছেন—বন্ধু, তুই লোকাল বাস, আরেকবার গাইছেন—বন্ধু, তুই সিটিং বাস।
ফোকসম্রাজ্ঞী মমতাজকে যদি কাছে পেতাম একবার জিজ্ঞেস করতাম। মমতাজ আপা, কে আপনাকে এই বন্ধু তুই লোকাল বাস গানটা গাইতে বলেছে? আপনি গানটা গেয়েছেন বলেই তো আজ সিটিং সার্ভিস আর লোকাস বাস নিয়ে দেশে চলছে তুঘলকি কাণ্ড।
খুবই অবাক লাগে যখন পত্রিকায় পড়ি—রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধ, নাকি চালু থাকবে- এ বিতর্কে বাস-মিনিবাসের বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান থমকে আছে। যেসব পরিবহন মালিক বাস-মিনিবাস বন্ধ করে পরিবহন সংকট সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। উপরন্তু গত ২ মে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় বাস-মিনিবাসের সিটিং সার্ভিস চালু রাখার সময়সীমা আরো তিন মাস বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সময়সীমা দেখে আমরা কী বুঝে নেব? সরকার পরিবহন মালিক সম্প্রদায়কে তোয়াজ করছে। কারণ তারা যদি একবার বেঁকে বসে তা হলে সারা দেশ অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তখন জনগণ বিরক্ত হয়ে যাবে এই সরকারের ওপর। সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
শুধু কি তাই? আরো ব্যাপার আছে বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবহন কোম্পানির কর্তৃত্ব কোনো না কোনোভাবে সরকারি দলের লোকদের হাতেই। এটা হয়তো সব সরকারের আমলেই থাকে।
সুতরাং সরকার কাদের বিচার করবে?
এই অবস্থায় নিজেদেরকে গিনিপিগ ছাড়া আর কোনো ভালো প্রাণী ভাবা বোধকরি উচিত হবে না। আমাদের কাজ হচ্ছে দিন-রাত পরিশ্রম করে উপার্জন করা। মাস শেষে বাড়িঅলাকে বেতনের প্রায় অর্ধেক দিয়ে দেওয়া। আর সারা মাস কোনো রকমে বউ ছেলেমেয়ে দিন গুজরান করা। আর পাঁচ বছর পর ভোটের সময় কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া। ভোটের সময় নেতাদের প্রতিশ্রুতি এক কান দিয়ে শোনা আরেক কান দিয়ে তা বের করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ তখন প্রতিশ্রুতির যে ঢল নামে সেগুলো যদি সংরক্ষণ করা যেত খামোখা আমাদের ভারত গিয়ে তিস্তার পানির জন্য আবেদন করা লাগত না। সেই প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভরে যেত পানির অভাবে ফেটে যাওয়া মাটি। ফসল ফলাতে পারত আমাদের কৃষক ভাইয়েরা।
ভোটের আগের দেওয়া ইশতেহারের সেই সব কালো কালো অক্ষরের কথাগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যায় ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই। কে শোনে কার কথা। অল্প টাকায় চাল খাওয়ানো থেকে শুরু করে কত বড় বড় বুলি আওড়ানো, সব বেমালুম কর্পূরের মতো উড়ে যায়। আমরা আবার আগের সেই কলুর বলদ হয়ে যাই। কখনো মনে হয় ক্রীতদাস নিজেদের। খাবি-দাবি কোনো কথা বলবি না। অন্যায় দেখবি কোনো প্রতিবাদ করবি না। করলেই শূলে চড়ানো হবে।
পরিবহন সেক্টরের কথা বলতে গিয়ে কত কথা বলে ফেললাম। নিজেদের ‘গিনিপিগ’ থেকে শুরু করে ‘কলুর বলদ’ বানিয়ে ছাড়লাম। পাঠক, যদি আপনাকে এই দুটি নামে ডেকে ভুল করে থাকি তবে স্বজ্ঞানে ক্ষমা করে দেবেন।
কারণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে (গত ১৬ এপ্রিল থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত) যখন বাস না পেয়ে হাঁটা শুরু করেছিলাম অফিস থেকে বাসার উদ্দেশে, তখন নিজেকে ওই দুটি প্রাণী ছাড়া আর কোনো কিছু ভাবতে পারিনি।
পরিশেষে বলব, আমাদের বর্তমান সরকারের জন্য খুবই মায়া হয়। কত অসহায় তারা। জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে তারা দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু কিছু করতে পারছে না। তারা জানে এই জনগণই তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল। সরকার এটাও জানে এই জনগণ যদি মনে করে পরবর্তীকালে আর এই দলকে ক্ষমতায় দেখতে চাই না, সেটাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকারের জন্য মায়া আর করুণা করা ছাড়া আমাদের মতো ‘গিনিপিগ’ আর ‘কলুর বলদ’দের কীই বা করার আছে।
লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম