অভিমত
‘কুকুর হইতে সাবধান!’
খুব ছোটবেলা আমাকে একবার কুকুর কামড় দিয়েছিল। তাই কুকুর দেখলেই সাবধানে থাকি। রাস্তাঘাটে যখন দেখি ঘেউ ঘেউ করছে, খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেলা করতাম।
কিন্তু এই প্রাণীটির প্রতি অদ্ভুত এক মায়া জন্মে গেছে, গত বছর আগস্ট মাস থেকে। ঢাকার নিকুঞ্জ ১-এ আমার নতুন কর্মস্থলের অস্থায়ী অফিস। সেখানে প্রতিদিন সকালে যাই। প্রধান ফটকের সামনে বেশ ভাব নিয়ে দুটি কুকুর বসে থাকে। প্রথম প্রথম তারা দুজন একটু ঘাড় বাঁকা করে তাকাত আমাকে দেখে। আমি খানিকটা ভয় পেয়ে যাই, হিস হিস করতাম, তখন দুজনেই ঘেউ ঘেউ করত। কিন্তু বেশ কয়েকদিন আমাকে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতে দেখে তারা হয়তো বুঝে নিয়েছে মানুষটি আমাদের প্রতিষ্ঠানেরই একজন, তাই তার প্রবেশে কোনো প্রকার বাধা সৃষ্টি না করাই ভালো। একসময় আমার প্রবেশের সময় তারা কোনো শব্দ না করে চোখ বন্ধ করে থাকে। আমি যথারীতি প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। তবে ভেতরে একটু ভয় থেকেই যায়, কারণ তাদের দুজনের ওপর দিয়ে পা উঠিয়ে আমাকে প্রবেশ করতে হয়। অফিসের সবাই এভাবে প্রবেশ করাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
দিন যেতে থাকে। একসময় বিষয়টা আমার কাছে আর ভয়ের ব্যাপার থাকে না। মামুলি হয়ে যায়। আমি জানতে পারি তাদের দুজনের নাম কাজল আর রেখা। ছেলে কুকুরের নাম কাজল আর মেয়ে কুকুরের নাম রেখা। এই পাড়াটা বেশ উচ্চবিত্তদের আবাসস্থল। কিছুদিন আগে কুকুর নিধন অভিযানের সময় অনেক কুকুর ধরে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক কুকুরকে নাকি তখন কিছু খাইয়ে মেরেও ফেলা হয়েছিল। জানতে পারি, এই কাজলকে কিছু খাওয়ানো হয়েছিল। তখন আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা ওষুধ খাইয়ে বমি করিয়ে কাজলকে বাঁচিয়েছিল। এলাকার কয়েক ব্যক্তি কুকুর দুটিকে পৌরসভার গাড়িতে তুলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের জন্য পারেনি।
তো যা হোক, সেই কৃতজ্ঞতাই হোক আর ভালোবাসার কারণেই হোক কাজল আর রেখা এখন প্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী অফিসে পাহারাদার হিসেবে থাকে। অপরিচিত লোকজন দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে উপস্থিতি জানান দেয়। আর অফিসের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানসহ বেশ কয়েকজনকে বের হতে দেখলে খানিকটা দূরের দোকান পর্যন্ত এগিয়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত বিস্কিট কিনে না দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের গা ঘেঁষে নানাভাবে কাতরতা প্রকাশ করবে। সে এক অন্যরকম দৃশ্য। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি। আর ভাবি, কীভাবে বোঝে এই প্রাণীটি যে তাঁরা দোকানে যাচ্ছেন। সেখানে গিয়ে ও রকম গা ঘেঁষে দাঁড়ালে কিছু কেনে দেবেন?
একদিন আমি দেখলাম মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ব্যক্তি অফিস থেকে বের হয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কাজল তাঁর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে প্রধান ব্যক্তি তাঁর হাত দিয়ে পা দিয়ে কাজলের পুরো শরীর চুলকে দিলেন। আমি বললাম, ভাইরে ভয় লাগে না? উত্তরে বললেন, মানুষ বেইমানি করে এই কুকুর কখনো বেইমানি করে না।
আমার চেতনায় একটা কিছু ঘটে গেল। কুকুর সম্পর্কে ছোট থেকে ভয় ছিল, ঘৃণা ছিল, সব দূর হয়ে কর্পূরের মতো উবে গেল।
আমিও সেই কাজলকে মাঝে মাঝে বিস্কিট কিনে দিয়েছি। তারা দুজন আমাকে দেখেও দৌড়ে আসত। একসময় আমাদের এক নারী সহকর্মী তাঁর বাসা থেকে নিয়মিত মাংসের হাড্ডি থেকে শুরু করে সব ধরনের বাসি খাবার অফিসে আনা শুরু করে দিলেন। নিজে দুপুরে খাওয়ার পর বাসা থেকে আনা সেই মাংসের হাড্ডি আর বাসি খাবার কাজল আর রেখাকে দিয়ে আসতে শুরু করল। তারা দুজনেই অরাকে ভীষণ পছন্দ শুরু করল।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় নারী সহকর্মী অরাকে দেখে কাজল আর রেখা দোকান পর্যন্ত এগিয়ে আসত। দুই প্যাকেট বিস্কিট কিনে নিজে খুলে কাজল আর রেখাকে খাইয়ে তারপর বাড়ির দিকে রওনা করত।
একসময় আমরা আমাদের স্থায়ী অফিস নিকুঞ্জ ২-এ চলে আসি। কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় এখনো সেই অরা বিশ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে নিকুঞ্জ-১ গিয়ে কাজল আর রেখাকে বিস্কিট খাইয়ে আবার স্থায়ী অফিসে আসেন। তারপর এক সহকর্মীর সঙ্গে বাড়িতে ফেরেন।
কুকুরপ্রীতির গল্পটা এতটুকুই। কিন্তু এর অবতারণা অন্য কারণে। কেউ হয়তো ভেংচি কেটে বলতে পারেন, ধান ভানতে শিবের গীত গাইছে। আদিখ্যেতার আর শেষ নেই।
সম্প্রতি বনানীতে একটি হোটেলে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এক বন্ধুর সঙ্গে ওই দুই ছাত্রী গিয়েছিলেন ধনীর দুলালের জন্মদিনের পার্টিতে। ধনীর দুলালের অনেক অনুরোধের পরই দুই ছাত্রী গিয়েছিলেন সেই পার্টিতে। একসময় দুই ছাত্রীর পুরোনো বন্ধু চলে আসে। পরে কী হয়েছে দেশবাসীর অজানা নেই।
কুকুর মানুষকে কামড়ায়। জলাতঙ্ক রোগ হয়। ভাগ্য ভালো থাকলে ভ্যাকসিনে রোগ সারে। নইলে একসময় মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে হয়।
আমরা কি কখনো মানুষ কুকুরকে দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাই? বা দেখার বা বোঝার চেষ্টা করি? আপনার চারপাশেই সেই কুকুর ঘোরাফেরা করে। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায় না, বোঝা যায় না। এরা কুকুরের মতোই ছোঁক ছোঁক করে আর জিহবা বের করে লালা ঝরায়।
আপনি কার সঙ্গে মিশছেন, কে আপনার বন্ধু হতে চাচ্ছে, একটু খেয়াল করলেই টের পাওয়া সম্ভব। মানি, হয়তো সব সময় টের পাওয়া যায় না, কারণ এরা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, এদের কোন কথাটায় মধু থাকে আর কোন কথাটা লোভের, বুঝতে পারাটাও কঠিন হয়ে পড়ে।
হে আমার ভগ্নি, আপনি যে পথে চলছেন সে পথের চারপাশে কুকুরের চলাফেরা, এটা আপনাকে মানতে হবে। চর্ম চোখে সেই কুকুরদের দেখা পাওয়া যায় না। কারণ তারা মানুষের মতোই ঘোরাফেরা করে। দামি গাড়ি নিয়ে কখনো সাধারণ বেশে আপনাকে দেখে ছোঁক ছোঁক করে আর লালা ঝরায়। তাদের বাবাদের আছে কাড়ি কাড়ি টাকা। প্রশাসন তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি আর টাকার কাছে নতজানু হয়ে যায় কখনো কখনো।
দিনশেষে যা ক্ষতি হওয়ার তা আপনারই। আলামত নষ্ট করার জন্য মামলা নিতে টালবাহানা চলবে। সমঝোতার প্রস্তাব আসবে। আরো কত হুমকি-ধমকি।
ওই যে কুকুর দুটির কথা বললাম, কাজল আর রেখা। ওরা কখনো বেইমানি করে না। আপনার একটু ভালোবাসা পেলে অপরিচিত কেউ ঘরে এলে ঘেউ ঘেউ করে তাড়িয়ে দিয়ে আপনাকে রক্ষা করবে। কিন্তু মানুষরূপী কুকুর, আপনার সরলতার সুযোগে আপনার সর্বনাশ করে ছাড়বে।
অবশ্যই ঘর থেকে বের হতে হবে। পড়াশোনা করে দেশ ও জাতির দায়িত্ব নিতে হবে। রাজনীতি, খেলাধুলা আর শিল্প-সংস্কৃতির সব শাখায় বিচরণ করতে হবে। প্রশাসনের উচ্চ পদে আসীন হতে হবে। নিজেদের ভেতরে সেই মশাল জ্বালিয়ে রাখতে হবে সর্বদা। যে মশালে চেনা যায় কে ভালো আর কে মানুষরূপী কুকুর।
তাই আমার প্রিয় ভগ্নি আর কন্যারা, মানুষ কুকুর হইতে সাবধান।
লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক

সারওয়ার-উল-ইসলাম