হলি আর্টিজান
ভয়াল জঙ্গি হামলার এক বছর
শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশকে উলট-পালট করে দেওয়া জঙ্গি হামলার বছর পার হলো আজ। আধুনিক বাংলাদেশে গুলশানের ৭৯ নম্বর রোডের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর ঘটনাটি মানুষের বিবেকের গভীরে নাড়া দিয়ে যায়। গুটিকয়েক উগ্রবাদী ধর্মের নামে জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালিয়ে মানবিক বোধকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীতে ভালোবাসা, মমতা বা টান বলে কিছুই নেই; আছে শুধুই ঘৃণা! এক বিস্ময়কর অসভ্যতা আর চরম অসম্মানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। যে বিদেশিরা আমাদের উন্নয়নে কাজ করতে এসেছিলেন, তাঁদের জল্লাদের মতো মেরে ফেলে বিপথগামীরা প্রমাণ করে শুভবোধ বলে আসলে কিছু নেই, উগ্র ধর্মীয় মতবাদই শেষ কথা।
গেল বছর রমজান মাসের আজকের দিনে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় যাওয়া ২০ জন বিদেশি নাগরিকসহ ৩০-৩৫ জনকে জিম্মি করে ৮-১০ জনের উগ্রবাদী সন্ত্রাসী। খবর পেয়ে ওই সন্ত্রাসী দলকে ঠেকাতে গিয়ে তাদের হামলায় প্রাণ হারান ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন। সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত টিম অভিযান পরিচালনা পর্যন্ত সারারাত জঙ্গিরা বিভিন্ন কায়দায় ২০ জন নিরস্ত্র ও অসহায় মানুষকে মেরে ফেলে। এদের মধ্যে বাংলাদেশি ছাড়াও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান, নয়জন ইতালি, সাতজন জাপানি একজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। জিম্মিদের মধ্যে জঙ্গিদের পছন্দমাফিক ১৩ জনকে রেহাই দেয় তারা।
নিহতদের মধ্যে ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ হোসেন, এলিগ্যান্ট কোম্পানির চেয়ারম্যান রুবা আহম্মেদের একমাত্র কন্যা অবিন্তা কবির এবং মিউজিক ভিডিওর জনপ্রিয় মুখ ইশরাত আখন্দও ছিলেন। সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা সব জঙ্গিকে মেরে ফেলতে সক্ষম হন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দায় স্বীকার করে। আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে রেড এলার্ট জারি করে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিম নিরাপত্তার অভাবের কথা বলে বাংলাদেশে খেলতে আসতে অনীহা জানায়।
সেই সময় রাষ্ট্রের তরফে দুইদিনের শোকও ঘোষণা করা হয়েছিল। ঘটনার পর ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওচিত্র মোতাবেক মুক্তি পাওয়া জিম্মিদের মধ্যে অধ্যাপক হাসনাত ও তাহমিদ নামের এক যুবককে পিস্তল হাতে হলি আর্টিজানের ছাদে জঙ্গিদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে দেখা যায়। তাদেরও জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে জনমনে এমন বিশ্বাস থাকলেও পুলিশ তা প্রমাণ করতে পারেনি। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করলেও আদালতের আদেশে তারা এখন জামিনে মুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
কমান্ডো হামলায় পাঁচজঙ্গির সঙ্গে মারা যান ওই রেস্তোরাঁর পাঁচক সাইফুল ইসলাম। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখন পর্যন্ত ওই পাঁচকের লাশ তাঁর পরিবার বুঝে পায়নি। অন্যদিকে জঙ্গি হামলায় শহীদ পুলিশের এসি রবিউল ইসলামের পরিবারও অনেকটা অসহায় অবস্থায় আছে। দুই সন্তানের জননী রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমাকে যোগ্যতা অনুযায়ী একটি সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন পুলিশপ্রধান তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। রবিউলের নিজ হাতে গড়ে তোলা মানিকগঞ্জের নিজগ্রাম কাটিগ্রামে সুবিধাবঞ্চিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষায়িত বিদ্যালয় ‘ব্লুমস’ও রয়েছে অর্থসংকটে।
তারপরও জঙ্গিদের হুমকি ও তাণ্ডবকে পেছনে ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। গেল এক বছরে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, সিলেট ও দেশের অপরাপর অঞ্চলে সফল অভিযান চালিয়ে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বড় অংশকে কব্জায় আনতে পেরেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও র্যাব। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও ধ্বংস করা গেছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় এখনো যেখানে বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ সেখানে, গুলশান ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশে তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি।
জঙ্গিবাদ এখন বৈশ্বিক সংকট। এমন একটা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও এলিট ফোর্স র্যাবের তৎপরতায় জঙ্গিরা অনেকটাই কোণঠাসা। ইতোমধ্যে তামিমসহ গুরুস্থানীয় বেশ কয়েকজন জঙ্গিকে নির্মূল করা সম্ভবপর হয়েছে। পুরোটা না হলেও খানিকটা হলেও হলি আর্টিজান হামলায় হারানো ভাবমূর্তি ফেরানো গেছে। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেই প্রশংসিত হচ্ছে। যদিও এখন পর্যন্ত গুলশানের আতঙ্ক কাটেনি।
গেল তিন বছরের উপর্যুপরি জঙ্গি হামলা এবং ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শনের পর এখন আমাদের ভাবার সময় এসেছে কেন বাংলাদেশে উগ্রপন্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে? জঙ্গিবাদকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে জানা জরুরি যে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের কারণ কি? কাউন্টার টেররিজমকে অধিকতর কৌশলী ও কর্মক্ষম হয়ে উঠতে হলে সবার আগে জানতে হবে কারণ; তারপর কার্যকরণ নির্ধারণ।
সমাজবিজ্ঞানী, নিরাপত্তা গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক ও দায়িত্বশীল আধিকারিকদের ‘টেরোরিজম’ বিষয়ক ভাবনাটাকে আরও শাণিত করা সময়ের দাবি। তাদেরকে চিন্তা করতে হবে কেন এবং কোন প্রেক্ষিতে একজন মানুষ ভালোবাসায় পূর্ণ সুন্দর জীবন ও মমতায় ভরা সংসার ছেড়ে উগ্রবাদের আদর্শকে ধারণ করে আত্মঘাতী হয়? সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, কারো মধ্যে হতাশার বোধ, অন্যদের তুলনায় বঞ্চিত অনুভব করা, সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হওয়া, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন অনুভব করা, ক্ষমতাসীনদের নিপীড়নে জর্জরিত যারা তাদেরকে ষড়যন্ত্রীগোষ্ঠী খুব সহজেই জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদে ভেড়াতে পারে। তার ওপর ইদানিংকার যুবসমাজ খুব এডভেঞ্চারপ্রিয়। জঙ্গিবাদে নাম লেখানোর পর তাদের যখন বেহেশতি নেশায় পেয়ে বসে পিতা-মাতাকেও কতল করতে তাদের বুক কাঁপে না। এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রকদের ভাবার সময় এসেছে দেশের মানুষ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বঞ্চিত অনুভব করছে কি না? করলে সবার আগে জরুরি বঞ্চনার অবসান করা।
বাকি পথটুকু ঠিকই আছে। বাংলাদেশ এখনো লাইনচ্যুত হয়নি। বিভিন্ন সেক্টরে অবাধ দুর্নীতি ও প্রবল অসাধুতা সত্ত্বেও বৈদেশিক কর্মীদের রেমিট্যান্স ও পোশাক শিল্পের বাণিজ্য টিকে থাকায় দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। এবার দরকার সবার সহাবস্থানে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ। যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, নারী-পুরুষ এক টেবিলে পাশাপাশি বসে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতে পারবে।
দেশের সকল অপরাধীর শাস্তিটা নিশ্চিত করা হোক আর হলি আর্টিজান ট্র্যাজেডি থেকে যুবসমাজকে এই শিক্ষা দেওয়া হোক যে, নির্মমতায় অকালে নিজের ও দশের প্রাণহরণটা জীবন নয়। ঈশ্বর অথবা মহাপ্রকৃতি এই অমূল্য জীবন আমাদের একবারই দেয়। সেই জীবনকে আলোকিত করে মানুষকে ভালোবেসে দেশটাকে সম্মানের জায়গায় আসীন করার নামই পবিত্র জীবন। আমরা দুঃসময় ভুলে গিয়ে সেই জীবনের জয়গানই গাইব।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

ফারদিন ফেরদৌস