বিরল রোগ ও একজন সামান্তলাল সেন
ছোটবেলায় তাঁর একটা অভ্যাস ছিল। কলাগাছে ইনজেকশন দিতেন। মানে ডাক্তারি। হয়তো মনের মধ্যে শখ ছিল ডাক্তার হবেন। ওই শখটা পরে বাস্তবে রূপ পায় ১৯৬৭ সালে। যখন তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। বলছিলাম বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আলোচিত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. সামান্তলাল সেনের কথা। যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক। বিরল ও জটিল সব রোগের ‘সফল’ চিকিৎসক। ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদার ও মুক্তামনিদের ‘নায়ক’। শুধু এসব বিরল রোগীদের কাছেই নয় দেশ-বিদেশের বড় চিকিৎসকদের কাছেও তিনি এখন ‘নায়ক’!
১৯৪৯ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তখন সেখানে ইলেকট্রিসিটি ছিল না। হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করতেন। দিনাজপুরের সেন্ট ফিলিপস স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৬৪ সালে। তারপর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ১৯৬৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট। ১৯৭২ সালে চিকিৎসা পেশা শুরু করার পর অক্লান্ত পরিশ্রম করে দেশের ১৬টি মেডিকেল কলেজে গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র বার্ন ইউনিট। তাঁরই উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশ্বমানের হাসপাতাল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট।
এখানেই শেষ নয়। বিরল সব রোগের চিকিৎসা করে দেশ বিদেশে এখন আলোচিত নাম ডা. সামান্তলাল সেন। আবুল বাজনদার, মুক্তামনি আর তোফা-তহুরার সফল অস্ত্রোপচারের পর দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানের সফলতার কথা এখন বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক বিদেশি চিকিৎসক ও গবেষক এখন বাংলাদেশে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই সফলতার পেছনে মূল মন্ত্র কি তারা জানতে এসেছেন। এখনো অনেকে আসছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তাক লাগানো চিকিৎসার মাইলফলক স্থাপন হয় ২০১৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. আবুল কালামের নেতৃত্বে বৃক্ষমানব হিসেবে পরিচিত আবুল বাজনদারের হাতে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়। বাজনদারসহ এ পর্যন্ত বিশ্বে সাতজন রোগীকে শনাক্ত করা গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশেই চারজন। আর সারা বিশ্বের মধ্যে বাজনদার ছিলেন তৃতীয় বৃক্ষমানব। এর আগে যে দু’জন এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের সফল চিকিৎসা করতে পারেনি উন্নত বিশ্বও। তারা দু’জনই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু বৃক্ষমানব আবুল বাজনদার এখন সামন্তলাল সেনের নেতৃত্বে চিকিৎসা নিয়ে রীতিমতো স্বাভাবিক জীবন শুরু করেছেন।
সর্বশেষ বিরল রোগে আক্রান্ত শিশু মুক্তামনির চিকিৎসা করতে যখন ব্যর্থ হয় চিকিৎসা শাস্ত্রের অভিজাত দেশ সিঙ্গাপুর; তখন আবারও বিশ্বে চমক দেখিয়ে দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম, সামন্তলাল সেনসহ দেশের একদল চিকিৎসক। ১২ আগস্ট ঢামেক হাসপাতালে মুক্তামনির সফল অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে সে সুস্থ আছে।
সামন্তলাল সেনের ঐকান্তিক ইচ্ছেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন ঢামেক হাসপাতালে। ২০১৩/১৪ সালে রাজনৈতিক ডামাডোলে সারা দেশে পেট্রলবোমায় ঝলসে যাওয়া মানুষ যখন মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তখন শত শত আগুনে পোড়া মানুষকে নতুন জীবন দিয়েছেন ডাক্তার সামন্তলাল সেন আর তাঁর বার্ন ইউনিট। সে সময়ও বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকদের প্রশংসা দেশ-বিদেশে ছড়িয়েছিল। একাধিক জোড়াশিশু আলাদা করার কৃতিত্বের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে সামন্তলাল সেনের নাম। এ ছাড়া সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কাজ তো আছেই।
১৯৭২ সালে ডাক্তারি পাস করার পর এক বছর ইন্টার্নশিপ করে সামান্তলালের পোস্টিং হয়েছিল হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানা হেলথ কমপ্লেক্সে। সেখানে তখন রাস্তাঘাট কিছুই ছিল না। ১৯৭৫ সালের পরে বদলি হয়ে ঢাকায় চলে আসেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। ডা. আর জে কাস্ট (রোনাল্ড জোসেফ কাস্ট) তখন অর্থোপেডিক সার্জন। বাংলাদেশে এসেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য। পঙ্গু হাসপাতালে চার বছর কাজ করার পর ঢাকা মেডিকেলে বদলি হয়ে যান তিনি। ১৯৮০ কি ’৮১ সাল হবে তখন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম বার্ন রোগী দেখলেন তিনি। প্লাস্টিক সার্জনদের চিকিৎসার একটা পার্ট হচ্ছে এই রোগীদের চিকিৎসা করা এবং ঠোঁট কাটা, তালু কাটা চিকিৎসা করা। পোড়া রোগীদের দেখে তাঁর জীবনের অনেক কিছু বদলে যেতে লাগল। চেহারা সুন্দর করবেন কি? ৮০ শতাংশ রোগী মাটিতে পড়ে ছিলেন। মশারির নিচে যেভাবে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা হতো, তাতে সামান্তলালের ওই স্বপ্নটাই পরিবর্তন হয়ে গেল। চেহারা সুন্দর কিংবা বড়লোক হওয়ার ভূত বিদায় নিল। তখন তাঁর মাথায় একটাই চিন্তা, এই অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোর জন্য কী করা যায়?
১৯৮৬ সালের ঘটনা। ওই বছর প্রথম সরকারের কাছে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ডিপার্টমেন্ট করার জন্য প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। বহু দুয়ার ঘুরতে হয়েছে সামান্তলালকে। অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘উনি ঘুরতেছেন ধান্দা নিয়া। টাকাটুকা মেরে ইন্ডিয়া চলে যাবেন। ’ এগুলো মনে রাখেননি তিনি। ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ৩০ তারিখে পৃথক বার্ন ইউনিট চালু করেন। এই হাসপাতাল তৈরি করার পর আজকে যে চিকিৎসা নিয়ে মানুষগুলো বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, এটাই তো সামান্তলালের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে একটা ভালো বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে সব সময় ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকে, তারা সুচিকিৎসা পাচ্ছেন। এ ছাড়া কুমিল্লা, সিলেট এবং রংপুরে ভালো বার্ন ইউনিট করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরসহ ১৬টি মেডিকেল কলেজে বার্ন ইউনিট চালু করা হয়েছে। সেখানে সব সুবিধাই মোটামুটি আছে।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট বর্তমানে ৩০০ বেডের বার্ন ইউনিট। আগামী বছর এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এটা হবে ৫০০ বেডের হাসপাতাল। এটা বিশ্বের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির অনন্য একটি প্রতিষ্ঠান। এত বড় প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর কোথাও নেই। এই প্রতিষ্ঠানটিতে হয়তো বাইরের দেশের লোকজনও চিকিৎসা ও পড়াশোনা করতে আসবে। আজকে এই আবুল বাজানদার ও মুক্তামণিকেই দেখলেই সেটা অনুমান করা যায়।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

মর্তুজা নুর