রায়ের প্রতিক্রিয়ায় কেন এ আক্রমণ?
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বাতিল করা রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখার পর এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে গেছে। এ রায়কে কেন্দ্র করে সরকারি দল আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা একতরফা প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করে যাচ্ছেন, কয়েকজন আবার দাবিও জানিয়েছেন পদত্যাগ ও অপসারণের। সরকারের পক্ষ হয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে রায় নিয়ে একতরফা সমালোচনাও করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, আইনি কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁর পদে থেকে কমিশনের পক্ষে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন কি না। অভিযোগ উঠেছে, এ রায় নাকি বাইরের কেউ লিখেও দিয়েছে- এমন।
সবগুলো বিষয়ই উদ্বেগের। কারণ সব ক্ষেত্রে সমালোচনাকারীরা আদালতকে বিশেষ করে প্রধান বিচারপতিকে প্রতিপক্ষ ভেবে আক্রমণ করছেন। আদালতের পক্ষে পাবলিকলি এর জবাব দেওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের মন্ত্রীদের নিরঙ্কুশ স্পেস থাকার কারণে বাইরে থেকে সমালোচনার মাত্রা বাড়ছে। এতে করে বিচার বিভাগকে আইন ও নির্বাহী বিভাগের মুখোমুখি করে তোলার একটা চেষ্টা চলছে।
এ রায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনি পরাজয়, এটা হতেই পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও সরকার এ রায়কে তাদের রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়ার মানসিকতায় থাকার কারণে এমনটা ঘটছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি রায়কে এরই মধ্যে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করে বাইরে থেকে তাদের দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। অথচ মামলা চলাকালীন এ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি তারা। এ ছাড়া অন্য অনেক রায়ে তারা আদালত স্বাধীন নয় বলেও অভিযোগ করেছিল, কিন্তু এ মামলার রায়ের পর তারা স্বাধীন বিচার বিভাগ বলে প্রশংসা করছে। বিএনপির এমন প্রতিক্রিয়া আদতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়ার পাল্টা প্রতিক্রিয়া বলেই মনে হচ্ছে, কারণ সরকারি দল নিজেই যেহেতু আইনি পরাজয়কে রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে জ্ঞান করছে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি এ সুযোগটা না নিলেই বরং অবাক হতে হতো।
আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা, মন্ত্রীরা যে ভাষায় এর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন তা কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূতই নয়, অনেকটা সামাজিক শিষ্টাচারকে অস্বীকার করাও হচ্ছে। এতে করে তারা হয়তো দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে হাততালি পাচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষজন এ নিয়ে বিরক্ত হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের মানসিকতা সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা পাচ্ছে।
প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগের এমন প্রতিক্রিয়া ধারা নতুন না। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা বিভিন্ন সময় সংসদ ও সংসদের বাইরে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছে। আপিলের রায় ঘোষণার পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগে, এবং পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তাঁরা অনেকটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছেন।
রায় নিয়ে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বিচারপতিদের তাঁরা চাকরি দেন, একের পর এক ষোড়শ সংশোধনী পাস করে যাবেন তাঁরা; মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, আদালতের হাত সংসদ পর্যন্ত লম্বা হয় নাই; তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার নাই; মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেছেন, আপনি কি স্বয়ম্ভূ ভগবান; রাশেদ খান মেনন বলেছেন, এ রায় কোনো বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, তা বিবেচনায় আনতে হবে; শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন, আপনি (প্রধান বিচারপতি) রায় দিয়েছেন, রায় নিয়ে বসে থাকেন; এমন অনেক কিছুই।
১ আগস্ট আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গত ১২ আগস্ট ঝালকাঠিতে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন সেটা রাজনৈতিক শিষ্টাচার নয়ই, এটা তাঁর সাংবিধানিক পদ ও মর্যাদায় উচ্চে থাকা এক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি চরম অবমাননা। ওই অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে ছিঁচকে উকিল বলেও কটূক্তি করেছেন। এ ছাড়া তাঁর আক্রমণের সঙ্গে ছিল ‘তুমি’ শব্দের ব্যবহার।
তিনি বলেন, ‘আজকে চিফ জাস্টিসের মতো লোক যদি পার্লামেন্ট নিয়ে প্রশ্ন করে- তাকে আমি বলতে চাই, আমরা যারা আজকে পার্লামেন্টের সদস্য, এদেশ স্বাধীন না হলেও আওয়ামী লীগ এই দেশে মাথা তুলে থাকত, আমরা পার্লামেন্টের সদস্য থাকতাম। কিন্তু তোমার মতো ছিঁচকে উকিল এই দেশের চিফ জাস্টিস হতে পারত না। এটা স্মরণ রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর অবদানের কারণে আজকে তোমার মতো ছিঁচকে উকিল এই দেশের চিফ জাস্টিসের মর্যাদা পেয়েছে।’
সাংবিধানিক পদ ও মর্যাদায় চার নম্বরে থাকা একজন প্রধান বিচারপতিকে কটূক্তি করা নিঃসন্দেহে শিষ্টাচারবহির্ভূত। তা ছাড়া তিনি নিজে যে অবস্থানে আছেন সেটাও সাংবিধানিক মর্যাদাপ্রাপ্ত, এমন অবস্থায় উচ্চপদস্থ এক সাংবিধানিক পদধারীর প্রতি এমন আক্রমণ ও কটূক্তি অনাকাঙ্ক্ষিত।
এবার দেখি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা সত্যিই কেমন ছিলেন? প্রধান বিচারপতি তাঁর পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন চুয়াত্তরে সিলেট বারে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে। হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ১৯৭৮ থেকে; এরপর বিচারপতি থেকে প্রধান বিচারপতি। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রী কি পদে থেকে মিথ্যা বলেননি? উচ্চ মর্যাদায় আসীন এক সাংবিধানিক পদের প্রতি এমন আক্রমণাত্মক হয়ে শিষ্টাচার লঙ্ঘনের পাশাপাশি রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে শপথ লঙ্ঘন করেননি?
প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে? কারণ যে বিচার বিভাগ আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু তারা বিষয়টির সিদ্ধান্তদাতা, কিন্তু তারা এখানে একতরফাভাবে আক্রমণের শিকার হওয়ার কারণে পারছে না এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে। তা ছাড়া কেবল একজন মন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেননি, অনেকেই করেছেন; করে যাচ্ছেন। ফলে ভয়ঙ্কর এক অবমাননা করা সত্ত্বেও তাঁরা পার পেয়ে যাবেন। এতে করে আগামীতে একইভাবে প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগ নিয়ে অনেকেই ফ্রি-স্টাইল আক্রমণ, কটূক্তি ও বক্তৃতা করে যাবেন। এটা আশঙ্কার।
আমির হোসেন আমু কেবল এমন ব্যক্তি আক্রমণেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এর চেয়েও ভয়ঙ্কর কথা বলেছেন। ‘এ দেশ স্বাধীন না হলেও আওয়ামী লীগ এই দেশে মাথা তুলে থাকত। আমরা পার্লামেন্টের সদস্য থাকতাম’- এমনটাও বলেছেন তিনি। বাংলাদেশের মন্ত্রী হয়ে তিনি কীভাবে দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে এভাবে হালকাভাবে দেখতে পারেন? দেশ স্বাধীন না হলেও আওয়ামী লীগ মাথা তুলে থাকত, আর উনিও এমপি থাকতেন মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার এর চেয়ে বড় কোনো বাক্য আর থাকতে পারে কি না জানি না। এ ধরনের বিশ্বাস বাংলাদেশে থাকা পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিবিদরাই করে থাকেন বলে দেখে আসছি। আওয়ামী লীগের মধ্যকার এমন নেতাও এ ধরনের কথা বলতে পারেন, অবিশ্বাস্যই ঠেকে।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রধান বিচারপতির অপসারণ চেয়েছেন। তিনি এ জন্য নৈতিকতার দোহাই দিয়েছেন। অথচ এ মন্ত্রীই গত বছর আদালত অবমাননার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ওই সময় আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ে জানিয়েছিলেন শপথ ভঙ্গের কথা। শপথ ভঙ্গ করলে এ ক্ষেত্রে তাঁর মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার কথা ছিল, তবু তিনি আছেন মন্ত্রিসভায়। আদালত কর্তৃক অপর দণ্ডপ্রাপ্ত ও শপথভঙ্গকারী অপর মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক একইভাবে প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেছেন। সমালোচনা করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মাহবুব-উল-আলম হানিফ সহ অনেকেই।
এরই মধ্যে গত রোববার ভয়ঙ্কর এক অভিযোগ এনেছেন শেখ ফজলে নূর তাপস। তাপস সংসদ সদস্য, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য সচিব। তাঁর অভিযোগ, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্য সংবলিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক ড্রাফট করে দিয়েছেন।’ আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের কর্মসূচি চলাকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে এ মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ ফজলে নূর তাপসের এ বক্তব্য বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুবাদে। ধরে নিচ্ছি তিনি ওভাবেই বলেছেন। কারণ স্ব-নির্ধারিত সংক্ষুব্ধ পক্ষ মাঝে মাঝে বচনে নিয়ন্ত্রণ হারায়। হতে পারে এটা তেমনই এক, মুখ ফসকে বের হয়ে যাওয়া এক বক্তব্য অথবা হাততালি-আকাঙ্ক্ষায় তেমন কোনো। তিনি যে অভিযোগ করেছেন সেটা উদ্বেগের। সত্য হলেও উদ্বেগের, মিথ্যা হলেও একই। কারণ তাঁর বক্তব্যের আগে কখনো এটা এক সেকেন্ডের জন্যে হলেও মনে আসেনি আদালতের রায় অন্য কেউ ড্রাফট করে দিতে পারেন। যেহেতু এটা একজন দায়িত্বশীল পদে থাকা, অবস্থানে থাকা আইনজীবী নেতা, আইনপ্রণেতা উচ্চারণ করলেন তখন এটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখার অবকাশ রয়েছে।
তিনি এমন অভিযোগের পরও এ প্রশ্ন তুলব না বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে কীভাবে বাতিল করে দিলেন ত্রয়োদশ সংশোধনী? প্রশ্ন করব না কেন নিষ্ক্রিয় এক মামলাকে সক্রিয় করে কেন তুললেন তিনি যাতে দেশের পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থা পাল্টে যায়? এসব প্রশ্ন তুলব না, কারণ এখনো বিশ্বাস করতে চাই খায়রুল হকের বিবেচনা থেকেই তিনি রায় লিখেছিলেন।
শেখ ফজলে নূর তাপস কারো নাম উল্লেখ করেননি, কিন্তু বলেছেন একটা ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক রায়ের ড্রাফট লিখে দিয়েছেন। এতে মনে হচ্ছে ওই সাংবাদিক এবং অন্য অনেক রায়ে বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শক হিসেবে অনেকেই থাকেন, যাঁরা কেবল সিদ্ধান্তই দেন না, শত শত পৃষ্ঠার রায়ও লিখে দেন। কী ভয়ঙ্কর! এবার বক্তার প্রতি মোহ, অন্ধ আবেগ সৃষ্ট আস্থা আর রায়ের প্রতি বিরোধিতা কাটিয়ে কেউ ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে যেসব প্রশ্ন সামনে আসে তা হলো- আদালতের ভাষা আর সাংবাদিকের ভাষা কি এক? মনে হয় না। কোনো সম্পাদকের সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকাতে আইন-আদালতসহ সব ধরনের সংবাদ থাকে বলে সাংবাদিক আইনজ্ঞ হয়ে যান, আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে একটা আস্ত রায়ের ড্রাফট করে দিতে পারেন, বিষয়টা কি হাস্যকর ঠেকছে না? আর ইংরেজিতে লেখা বলে এটা ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক লিখে দিলেন, বাংলা হলে কি বলা হতো বাংলা দৈনিকের সম্পাদকের কাজ। এ ছাড়া এ ধরনের কিছু করতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বাইরে কারো সাহায্য নেওয়া বা চাওয়া কেবল ব্যক্তিত্বহীনতার প্রমাণই না, এ ধরনের অভিযোগ করাটাই একই দোষে দুষ্ট হয়ে যায়! বিচারালয় কিংবা অন্য যেকোনো মাধ্যমের উচ্চপদে কেউ গেলে সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বটাও যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটা অটুট থাকে- এ বোধ আশা করি সবার থাকে।
এর বাইরে, এটা তো প্রধান বিচারপতির লেখা প্রথম কোনো রায় না। দীর্ঘ পেশাগত জীবনে তিনি অনেক রায় লিখেছেন। ইংরেজিতে তিনি দুর্বল এমনও তো না। তাহলে কেন উঠল এমন প্রশ্ন? শেখ ফজলে নূর তাপস প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছেন এটা খোলা চোখেই হাস্যকর ঠেকে। তবু এ হাস্যকর বক্তব্য দেখছি অনেক ফেসবুক আওয়ামী-সমর্থক বন্ধু পূর্ণবিশ্বাস রেখে প্রচার করে চলেছেন। বিশাল এক রহস্য উন্মোচন হয়ে গেছে বলে তাদের মুখের তৃপ্তির হাসির রেখা দেখে প্রথমে হেসেছিলাম কিছুটা, পরক্ষণে বিভ্রান্তির সামগ্রিক দেশচিত্র ভেবে হতাশই হতে হলো। মনে পড়ে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চের ঘটনা, যখন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডাদেশ পাওয়া দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে একশ্রেণির লোক তুমুল আক্রোশে হামলে পড়েছিল দেশের সর্বত্র। টের পাই বিশ্বাস কতখানি প্রবল হলে সাঈদীকে চাঁদে দেখা যায়, আবার ফজলে নূর তাপসের অভিযোগমতো প্রধান বিচারপতির রায় ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক ড্রাফট করে দিয়েছেন এ বিশ্বাসও করা যায়!
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ছাপিয়ে দেশে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে রায়ের পর্যবেক্ষণ। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-মন্ত্রীই নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না ঠিক কোথায় তাঁদের আপত্তি। তাঁরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুকে অপমানের কথা, কিন্তু দীর্ঘ রায়ে কোন পাতায় কোন বাক্যে এমন অপমান কিংবা কথিত অস্বীকার সেটা উল্লেখ করতে পারছেন না। অবস্থাটা কবি শামসুর রাহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতার মতো সবাই চিলের পেছনে ছুটছে, শোনা কথায় কান দিয়ে। কবিতার শেষাংশে শামসুর রাহমান পণ্ডশ্রমের কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখানে দলীয়ভাবে তাদেরকে সে বিষয়টি দেখানোর কেউ নেই; অথবা যারা আছে তারাও কষ্ট করে রহস্য উন্মোচনের চেয়ে বিষয়টা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উপকরণ হিসেবেই উপস্থাপন করতে চাইছে।
সংসদ সংবিধানে সংশোধনী এনেছে, আদালতে উত্থাপিত সে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের শুনানি, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনি পরাজয় ঘটেছে। এটা আইনি বিষয়, সে হিসেবে একে আইনি পরাজয় হিসেবেই দেখা সঙ্গত ছিল। কিন্তু সরকার পুরো বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে নিয়েছে। বিএনপি রায়কে গ্রহণ করেছে বলে সরকারকে যেকোনো মূল্যে এর বিরোধিতা করতে হবে এমন এক মানসিকতাও চলে এসেছে। ফলে আইনি বিষয়টা চলে গেছে রাজনীতির মাঠে। এতে করে আওয়ামী লীগ ও সরকারের নেতা, মন্ত্রীরা শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগকে আক্রমণ করে যাচ্ছেন। অথচ তাঁদের কে বোঝাবে বিষয়টা আইনের, রাজনীতির না।
বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে করে সবকিছু ঠিকঠাকমতো চললে এখান থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিজয়লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। আছে নৈতিক পরাজয়ের শঙ্কা, কারণ তারা যে প্রক্রিয়ায় প্রধান বিচারপতি ও বিচার বিভাগ নিয়ে মেতেছে, তাতে করে আর যাই হোক দেশের মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। অন্যায় চাপ প্রয়োগকে স্বেচ্ছাচারের নতুন পন্থা হিসেবেই দেখছে দেশবাসী। যা তাদের রাজনৈতিক নৈতিক আচরণের বড় ধরনের এক পরাজয় হিসেবেই ভবিষ্যৎ চিহ্নিত করবে।
কবির য়াহমদ : প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম।

কবির য়াহমদ