ঈদের স্মৃতি
‘আজকে খুশির দিন কালকে ঈদের দিন’
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ঈদের আগের সন্ধ্যা। চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা তখনো আসেনি। তাই পরদিন ঈদ হবে কি হবে না এমন একটা অনিশ্চয়তা চলছে। আমার মেয়ে তখন স্কুলে পড়ে। ফোনে কথা বলছে সমবয়সী বোনদের সঙ্গে। সম্ভবত বিষয়বস্তু সবারই প্রায় অভিন্ন। ঈদের ড্রেস নিয়ে কথা হচ্ছে। এ প্রান্ত থেকে আমার মেয়ে বলছে, এপর্যন্ত ওর পাঁচটা ড্রেস হয়েছে। ছোট চাচ্চু আরেকটা দেবে। ওই প্রান্তেও নিশ্চয়ই ড্রেসের সংখ্যা নিয়ে কথা হচ্ছে। একপ্রান্তের ফোনালাপ শুনতে শুনতে আমি শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। ঈদের মূল সুরটি সম্ভবত একই আছে কিন্তু কত আলাদা ছিল তখন ঈদের আনন্দ আর আয়োজন!
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও রুচিতে বড় রূপান্তর হয়েছে এখন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে আমরা ছোটরা জানতাম ঈদ উপলক্ষে একটি নতুন জামা হয়তো পাব। সারা বছর এর জন্য প্রতীক্ষা ছিল। সব ঈদে যে আবার সত্যিই সবার জামা জুটত তেমনটি নয়। জামা না জোটার মতো কারণ ঘটলে বড় বোনেরা অপেক্ষাকৃত ভালো জামাটি ধুয়ে ইস্ত্রি করিয়ে রাখতেন। কয়েক সেট নয়, একটি নতুন জামা পেলেই তখন আমাদের আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো আনন্দ হতো। ভাগ্য প্রসন্ন হলে কোনো ঈদের নতুন জামার সঙ্গে নতুন প্যান্ট এবং জুতোও এসে যেত। সে আনন্দ প্রকাশ করার নয়। আমার ধারণা, আমাদের সেই আনন্দ পাঁচ-ছয় সেট ড্রেসের ভিড়ে এ সময়ের ছোটরা পায় না।
গ্রাম আর শহরের ঈদে কিছুটা ভিন্ন আমেজ থাকত। আমরা শহরতলিতে বড় হয়েছি। সময়টি গত শতকের ষাটের দশকের শেষ দিক। এখনো মনে পড়ে ঈদের আগের সন্ধ্যা থেকে যে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ত, এ সময়ের ছোটরা বিশেষ করে শহুরে পরিবেশের ছোটরা তা অনুভব করতে পারে না।
ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ ছিল আলাদা। বড়রা শিখিয়েছেন ঈদের চাঁদ দেখা এবং চাঁদকে সালাম দেওয়ায় সওয়াব হয়। বাড়ির পশ্চিমে বন্দর র্যালি ব্রাদার্সের পাটকল। তারপরে শীতলক্ষ্যা নদী। তাই পশ্চিমটা বেশ ফাঁকা। মেঘমুক্ত আকাশ থাকলে পড়ন্ত বিকেলে আমরা বড়দের সঙ্গে জড়ো হতাম পশ্চিমের খালপাড়ে। তারপর পশ্চিম আকাশে অন্তহীন তাকিয়ে থাকা। সন্ধ্যা নামার আগেই কেউ বলে উঠলেন ওই যে চাঁদ। সঙ্গে সঙ্গে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ত। কোথায় চাঁদ? যারা দেখেছেন তর্জনি উঁচিয়ে নিশানা তাক করতেন। ওই যে সাদা মেঘটার একটু বাঁয়ে। না না আরেকটু ওপরে তাকাও। তারপর একসময় দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ত সরু একফালি বাঁকা চাঁদ। চাঁদ দেখে চাঁদকে সালাম দেওয়া রেওয়াজ ছিল। চাঁদ বলে দিত কাল ঈদ নিশ্চিত।
আনন্দ উপচে পড়ত তখন আমাদের ছোটদের মনে। সবাই ছুটছি বাড়িতে। কে আগে খবর পৌঁছাতে পারে। এর পরের উৎসব হচ্ছে দল বেঁধে পাড়াময় ঘুরে ঘুরে বড়দের সালাম করা। এটি চাঁদ দেখার সালাম। এ দায়িত্ব সারার পর আমরা ছোটরা একটি মিছিল বের করতাম। সেই মিছিলের একটিই স্লোগান ছিল, ‘আজকে খুশির দিন কালকে ঈদের দিন’। এই রাতটিকে সাধারণভাবে চাঁদরাত বলা হতো। প্রকৃত পক্ষে ঈদের উৎসব শুরু হয়ে যেত এই রাত থেকেই।
চাঁদ রাতের আনন্দটা চোখে দেখার মতো নয়। যেন আনন্দের ফল্গুধারা ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকটা নির্ঘুমই কেটে যেত রাত। ঘুমোনোর আগ পর্যন্ত শুনতাম রান্নাঘরে বাটনা বাটার শব্দ। মা-বোনদের ব্যস্ত সময়। সকালে তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। তাই বিকেলে কিনে আনা মোরগগুলো পলোর নিচ থেকে বের করা হচ্ছে। কক শব্দ। জবাই করা হচ্ছে। এসব বন্দোবস্ত করতে মাঝরাত কেটে যাবে। তারপর একটু ঘুমানো। ফজরের ওয়াক্তে বড়দের উঠে পড়া। ধীরে ধীরে সরগরম হতে থাকে বাড়ি, পাড়া, রাস্তাঘাট।
এদিন আর ডাকতে হতো না। সুবোধ বালকের মতো উঠে পড়তাম ভোরে ভোরেই। সকালেই গোসল করার রেওয়াজ। কলতলায় ডাক পড়ত। বড় আপাদের দায়িত্ব আমাদের গোসল করানোর। জানি এদিন নতুন সুগন্ধি সাবান থাকবে।
সাবান থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ ছড়াবে। তারপর বেশ করে সাবান ডলে গোসল করিয়ে দেবেন। ঘরে এনে ভালো করে হাতে-পায়ে সর্ষের তেল মাখানো হবে। আমাদের চোখ খাটের ওপর রাখা নতুন শার্ট-প্যান্টের দিকে। কিন্তু এক্ষুনি ওসব পরতে মানা। তার আগে পায়জামা-পাঞ্জাবি। কপাল ভালো থাকলে কখনো নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি জুটত। নয়তো আগেরবারেরটি ধুয়ে ইস্ত্রি করা। ঈদের পোশাক যা-ই কেনা হোক, এর বাইরে আব্বা দুটো জিনিস অতিরিক্ত কিনে দিতেন। একটি স্যান্ডো গেঞ্জি, আরেকটি নকশা করা নতুন টুপি। অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে। আমার স্ত্রী বিষয়টা জানেন বলে আর সব কেনা কাটার সঙ্গে আমার জন্য স্যান্ডো গেঞ্জি আর টুপি কিনবেনই।
প্রথমে গেঞ্জি তারপর পায়জামা-পাঞ্জাবি, টুপি, স্যান্ডেল পরে প্রস্তুত হয়ে যেতাম। আপা পাঞ্জাবিতে একটু আতর মাখিয়ে দিতেন। এবার আব্বার সঙ্গে মসজিদে যাওয়া। ঈদের নামাজ পড়ার মধ্যে একটি আলাদা আনন্দ ছিল। নামাজ শেষে বড়দের কোলাকুলি করা দেখতে খুব মজা লাগত। নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথে চোখে ভাসত নতুন শার্ট-প্যান্ট, জুতো। কতক্ষণে পরব- তর সইত না যেন। যত্ন করে পোশাক পরিয়ে মাথা আঁচড়ে দিতেন আপা। বেরুনোর আগে একটু খোরমা আর সেমাই খেতে হবে। এটিই রেওয়াজ। খাওয়া শেষ করে ঈদের সালাম আর সেলামি পর্ব। প্রথম নিজের বাড়ি দিয়ে শুরু। আব্বা, মা, বোন আর নানি প্রস্তুত হয়ে থাকতেন সেলামি নিয়ে। দুই আনা, চার আনা জমা হতে থাকত পকেটে। এরপর পাড়াময় ছুটে চলা। সবার কাছ থেকে হয়তো সেলামি পেতাম না। তবে যা জমা হতো তা মন্দ না। রাস্তায় বেরুনোর আগে একটু হলেও খিচুড়ি মাংস খেতেই হতো। তারপর রাস্তায় বেরিয়ে সেলামিতে পাওয়া পয়সার সদগতি করা। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় এদিন অনেকটা স্বাধীনতা দেওয়া হতো বাড়ি থেকে। পকেট গরম তাই ঈদের দিনে আইসক্রিম-অলার কাছে গিয়ে একটু অভিজাত হতে ইচ্ছে হতো।
আমাদের সময় এ কালের মতো এত সব ফ্যান্সি আইসক্রিম ছিল না। আইক্রিম-অলাদের কাছে দুই ধরনের আইসক্রিম বাক্স ছিল। একটি চারকোণা আকারের বড় বাক্স। অন্যটি গোল লম্বা অনেকটা বড় আকারের ফ্লাক্সের মতো। তিন ধরনের আইসক্রিম থাকত। সবচেয়ে সস্তাটি ছিল দুই পয়সা দামে। তিনটি তামার পাইকে বলা হতো দুই পয়সা। এই আইসক্রিম হতো বরফের মধ্যে মিষ্টি পানি জড়িয়ে দেওয়া। সব আইসক্রিমই ছিল কাঠি-অলা। ছয় পয়সাকে বলা হতো এক আনা। এক আনা দামের আইসক্রিম ছিল মাঝারি মানের। এই আইসক্রিমে বরফের সঙ্গে দুধের মিশ্রণ থাকত। তাই আইসক্রিম হতো সাদা রঙের। অভিজাত আইসক্রিমের দাম ছিল দুই আনা। এটি এক আনা দামের আইসক্রিমের মতোই দুধে জড়ানো ছিল। তবে আইসক্রিমের মাথায় আধা ইঞ্চি মতো জায়গায় থাকত দুধের সর দিয়ে তৈরি একরকম ক্রিম। আর তার মাথায় বসানো থাকত একটি কিশমিশ। সাধারণত দুই আনার আইসক্রিম কেনার সামর্থ্য আমার ছিল না। তাই বেশ আভিজাত্য নিয়ে ঈদের দিন একাধিক দুই আনা দামের আইসক্রিম খেয়ে ফেলতাম।
এ ছাড়া বেলুন, চরকি ইত্যাদি নানা খেলনাও কেনা হতো ঈদের দিনে। বন্ধুদের বাড়িতে গেলে খিচুড়ি, পোলাও, মাংস খাওয়ার জন্য টানাটানি হতো। সেদিকে খুব বেশি মনোযোগ দিতে ইচ্ছে হতো না। ঈদের দিনে ঘুরে বেড়ানো, ছুটে বেড়ানোটাই ছিল মহানন্দের। অন্য কোনোভাবে সময় অপচয় করতে মন সায় দিতো না। কিন্তু বিকেলের দিকে রাস টানতে হতো। আমার কলেজে পড়ুয়া বোনদের চলনদার হতে হতো। তারা সেজেগুজে বান্ধবীদের বাড়িতে যাবেন।
হাতের লাঠি হিসেবে যেতেই হবে সঙ্গে। না করার পথ নেই। আমার এতে আগ্রহ যে থাকত না, তা নয়। আপুদের বাসায় গেলে আরো একপ্রস্থ সেলামি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত। আর আদর-আপ্যায়ন তো আছেই।
রাত হয়ে এলেই বুকের ভেতরে একটি হাহাকার অনুভব করতাম। দিন শেষে অন্ধকার নামছে মানে ঈদের দিনেরও যবনিকা পড়ছে। মনকে সান্ত্বনা দিতাম- আর তো আড়াই মাস। আসছে কোরবানির ঈদ। সারা দিনের ছুটোছুটির ক্লান্তিতে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসত। না চাইলেও একটু পোলাও-মাংস খেতে হতো ঘুমোনোর আগে। তারপর ঈদের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়তাম।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ কে এম শাহনাওয়াজ