অভিমত
পদ্মরা কতবার ধর্ষিত হবে?
ধরে নিই মেয়েটির নাম পদ্ম। একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। তাকে পাড়ার কয়েকজন বখাটে উত্ত্যক্ত করে প্রতিদিন। মেয়েটি প্রথম প্রথম কাউকে কিছু বলেনি। কলেজে আসা-যাওয়ার সময় বখাটেরা যখন তাকে নানা রকম অশ্লীল কথাবার্তা আর ইঙ্গিত করে, তখন ভয়ে কুঁকড়ে যায়। মাথা নিচু করে চুপচাপ কলেজের পথে এগিয়ে যায়।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় বখাটেরা ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। একজন প্রথমে ওর মুখের কাছে এসে বাজে প্রস্তাব দেয়। পদ্ম কিছু বলে না, মাথা নিচু করে থাকে। তারপর বখাটেরা চলে যায়। বরাবরের মতোই পদ্ম মাথা নিচু করে বাসার দিকে এগিয়ে যায়। বাসায় গিয়ে মাকে প্রথমে কথাটা বলে। মা রাতে বাবাকে বিষয়টা জানায়। বাবা পরের দিন এলাকার মাতবর শ্রেণির একজনকে কথাটা জানায়। মাতবর একদিন বখাটেদের ডেকে শাসিয়ে দেন।
দিন যায়। পদ্ম কলেজে যাওয়ার সময় কয়েকদিন আর বখাটেদের দেখে না। ‘যাক এ যাত্রা রক্ষা পাওয়া গেল,’ এটা ভেবে পদ্ম স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। কিন্তু কাল কেউটে সাপ যে ওত পেতে ছিল, সে খবর পদ্মর জানা হয় না।
একদিন কলেজ থেকে বাড়ির ফেরার পথে একটি মাইক্রোবাস এসে পদ্মর সামনে থামে। সেই বখাটেরা মাইক্রো থেকে নেমে পদ্মর মুখে রুমাল ধরার সঙ্গে সঙ্গে সে অজ্ঞান হয়ে যায়। তারপর পাঁজাকোলা করে মাইক্রোতে তুলে নিয়ে যায়। তারপর আর কিছু মনে নেই পদ্মর। সন্ধ্যার সময় যখন জ্ঞান ফেরে তখন দেখে একটি পুরোনো স্কুলঘরের ভেতরে পড়ে আছে। সারা শরীরে কেউটেদের ছোবল।
তারপর সেই স্কুলঘর থেকে কোনোমতে বের হয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়। বাড়ি ফিরে মাকে ঘটনাটা খুলে বলে। মা যা বোঝার বুঝে নেন। বাবা থানায় গিয়ে সেই বখাটেদের নামে ধর্ষণের মামলা করেন। পুলিশ দু-একজনকে ধরে থানাহাজতে আটকে রাখে। বাকিরা পালিয়ে থাকে। তারপর মামলা তার আপন গতিতে চলে।
পদ্মর কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, লোকলজ্জার ভয়ে। পাশাপাশি যারা পালিয়ে ছিল তারা এলাকায় মহড়া দিয়ে পদ্মদের বাড়ি এসে হুমকি দিয়ে যায় মামলা তুলে নেওয়ার জন্য।
একসময় কোর্টে দাঁড়িয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীর নানা রকমের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে পদ্ম যেন প্রকাশ্যে আরেক দফা ধর্ষণের শিকার হয়।
এদিকে থানা-পুলিশের সময়ক্ষেপণের কারণে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বখাটেরা খালাস পেয়ে যায়। পদ্মকে কেউ ধর্ষণ করেনি এরকম প্রতিবেদন বের হয়।
পদ্ম আবার কলেজে যেতে চায়, কিন্তু পাড়ার লোকজন নানাভাবে কথা শোনায়। আজেবাজে কথা বলে বেড়ায়। পদ্ম একবার ভাবে নিজেকে শেষ করে ফেলবে, আবার পরক্ষণেই ভাবে বাবার কথা, মায়ের কথা। মুখ বুজে সহ্য করে যায় সব অপমান। সমাজের কাছে তৃতীয়বার যেন ধর্ষণের শিকার হয় পদ্ম।
আর ওই বখাটেরা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়ায় পদ্মদের বাড়ির চারপাশে। মাঝে মাঝে জানান দেয়, মাতবরের কাছে বিচার দেওয়ার ঝাল মিটিয়ে দিয়েছি।
এটা কোনো গল্প নয়। এটা এ সমাজের একটি চিত্র। এ সমাজে পদ্মরা এভাবেই প্রথমবার বখাটেদের দ্বারা, দ্বিতীয়বার আইনের দ্বারা আর তৃতীয়বার ধর্ষণের শিকার হয় সমাজ দ্বারা।
আমরা মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি এ প্রথাকে। কারণ ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার ৪ উপধারার ভিত্তিতে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ করা হচ্ছে এখন। এর ফলে ধর্ষণের শিকার একজন মেয়েকে আইনজীবী যে প্রশ্ন করছে তা ধর্ষণের শামিল। কিন্তু তাঁরা একবারের জন্যও ধর্ষকের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না। তাই এই আইনের উপধারা বাতিলের সুপারিশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতিসহ আইন-সংশ্লিষ্টরা।
দেশে বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা যে হারে বাড়ছে, তাতে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট আইন সহায়তাদানকারী আইনজীবীরাও। আমরা দিনে দিনে আধুনিক হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের কিছু আইন চলছে দেড় শ বছরের পুরোনো আইনি প্রক্রিয়ায়। এর ফলে সমাজে সুষ্ঠু বিচার পাচ্ছে না একজন নির্যাতনের শিকার নারী। তাকে প্রমাণ করতে হয় ভরা মজলিসে যে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আদালতে উপস্থিত পুরুষরা তখন বেশ মজা নিয়ে বর্ণনা উপভোগ করে সেই নারীকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করে চলে।
কেন এই আইন বাতিল হবে না? এ নিয়ে শুধু ‘বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচারে চারিত্রিক সাক্ষ্যের ব্যবহার’ বিষয়ক পরামর্শ সভা করে আলোচনার দরকার নেই। জোর আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। এবং তা এখনই।
আমরা দেখি যেসব বেসরকারি সংস্থা নারী নির্যাতন নিয়ে কাজ করে, তারা ওই সভা-সেমিনারে বেশ সোচ্চার থাকেন। কিন্তু কোনো একটি বিষয় নিয়ে জোর আন্দোলন করেছেন, এ রকম কোনো ঘটনা চোখে পড়েনি। এই আইনটি বাতিল নিয়ে কেন তারা রাজপথে নামছেন না?
আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী। তিনি অনুভব করতে পারবেন নারীর সেই অপমানের কথা। কীভাবে একজন ধর্ষণের শিকার নারীকে জেরা করা হয় আদালতে। সমাজ তাকে কীভাবে দেখে। দেড় শ বছরের পুরোনো এই আইনটি পরিবর্তনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করার দায়িত্ব নিতে পারেন আমাদের নারী নেত্রীরাই।
পাশাপাশি এটাও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ধর্ষণের শিকার নারীর কোনো লজ্জা নেই, লজ্জা ধর্ষকের, লজ্জা এ সমাজের। ধর্ষণের শিকার নারীর বিষয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। এবং আদালতে যেন আসামিপক্ষের আইনজীবী নির্যাতিতাকে অশালীনভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে না পারেন, সে জন্য বিচারককে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ দিতে হবে।
লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম