সংবিধান সংশোধনী : জনগণের কী আসে-যায়?
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন ও নীতি নির্ধারণী বিষয়ে সাধারণ মানুষকে (সংবিধান যাদের রাষ্ট্রের মালিক বলেছে এবং যাদের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়) কখনই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ষোলটি সংশোধনী আনা হয়েছে আমাদের সংবিধানে। এর বেশির ভাগই, শাসকশ্রেণি বা ক্ষমতাসীনরা তাদের প্রয়োজনেই করেছে। কখনো তা হয়েছে সামরিক শাসকের সংসদের হাতে, আবার কখনো হয়েছে গণতান্ত্রিকভাবে (গ্রহণযোগ্য বা অগ্রহণযোগ্য) নির্বাচিত সংসদের দ্বারা।
সত্যিই গণতন্ত্র এমন এক অদ্ভুত ব্যবস্থা, যেখানে জনগণের ক্ষমতা চর্চার একটা মাত্র উপায় আছে, তা হলো ভোটাধিকার। প্রতি পাঁচ বছরে একবার ভোট দিয়ে ৩০০ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করা পর্যন্তই এই ক্ষমতা। কখনো কখনো কষ্ট করে এই ভোটটাও দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি আমাদের। ক্ষমতাসীনরা আমাদের হয়ে কাজটা করে দিয়েছেন।
আরেকটি দিক দিয়েও বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা আলাদা। যদিও সংসদ সদস্যদের প্রধান কাজই হলো রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা, সংশোধন করা, বাতিল করা। কিন্তু ভোটের আগে এ বিষয়ে তাদের খুব বেশি খরচ করতে হয় না। দিতে হয় না কোনো প্রতিশ্রুতি। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করার মহাপরিকল্পনার কথা শোনান তাঁরা। তাতেই কেল্লা ফতে!
কিন্তু ভোটের পরই আমরা দেখি ক্ষমতাসীনরা সংসদে নানা ধরনের বিল উত্থাপন করতে শুরু করেন। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে, এ দেশের অধিকাংশ সংসদেই ক্ষমতাসীনরা ছিলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই তাদের পক্ষে যেকনো বিল পাস করা আদতে পানি-ভাতের মতো ছিল। বিরোধী দলের কণ্ঠ এতই ক্ষীণ থাকে যে কণ্ঠভোটে সবসময় সরকারি দলই জয়যুক্ত হয়। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আপত্তি সত্ত্বেও ৫৭-এর মতো বিতর্কিত ধারা রেখে যেমন পাস হয়, আইসিটি আ্যাক্ট তেমনি অনায়াসেই পাস হয়ে যায় সংবিধানের সংশোধনীগুলোও। তাতে জনগণের মত আছে কি নেই, কে শুনেছে কোন কালে?
একটু পেছনে ফিরলেই আমরা এর বহু নজির দেখতে পাব। আমাদের সংবিধানের প্রথম চারটি সংশোধনী হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। আমরা হয়তো অনেকেই জানি, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতেই জয়লাভ করেছিল। কিন্তু এটা তো ঠিক, পরে এই সংসদে যে চারটি সংবিধান সংশোধনী আনা হয় সে ব্যাপারে ভোটের আগে জনগন খুব কমই জানত। কিন্তু এর মানে কি এই যে, যারা সেসময় আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল, তারা সবাই এই চারটি সংশোধনীর সব বিষয়ের সঙ্গে একমত ছিলেন? কিন্তু গণতন্ত্র এমনই, ভোট দিয়েই যেখানে জনগণের সব দায় মিটে যায়। পরের পাঁচ বছর তার খুব কমই মত দেওয়ার সুযোগ ঘটে।
আমাদের সংবিধানের পরের ছয়টি অর্থাৎ পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম সংশোধনী হয়েছিল দুটি সামরিক সরকারের সংসদের হাতে, যেগুলোর নির্বাচনী ফলাফলও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। অথচ এই ম্যান্ডেটহীন সংসদেও পাস হলো ছয়টি গুরুত্বপূর্ন সংশোধনী। এর মধ্যে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী করাই হয়েছিল যথাক্রমে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক সরকারের বিভিন্ন কাজের, বিশেষ করে সামরিক ফরমান ও অধ্যাদেশগুলোর বৈধতা দেওয়ার জন্য।
আমরা হয়তো অনেকেই জানি, ক্ষমতায় এসেই সামরিক ফরমান বলে আমাদের সংবিধানের মূলনীতি পর্যন্ত বদলে দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে লাখো শহীদ রক্ত দিয়ে যে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি করা হয়েছিল, সেই জনগণকে তোয়াক্কা না করেই তা সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হলো। আর এই আদেশসহ আরো অনেক সমারিক ফরমান বৈধ করে নেওয়া হলো পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে।
তেমনি এরশাদ সাহেব তার সমারিক আমলে জারি করা সব আদেশ বৈধ করে নিলেন সপ্তম সংশোধনীর দ্বারা। তিনি আরো একধাপ এগিয়ে, জনগণের কোনো মতামত না নিয়ে, অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত করে দিলেন ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। মুহূর্তেই অন্যান্য ধর্মের মানুষকে নামিয়ে দিলন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে। কিন্তু এটা তো সত্য, আমার মতো বহু মুসলমানই মনে করে একটা রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকতে পারে না। আর বহু ধর্ম আর জাতির একটা দেশে গণতন্ত্রের প্রধান শর্তই হওয়া উচিত ধর্মনিরপেক্ষতা।
যদিও সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করছেন, তবুও সংবিধানের মৌলিক অনেক পরিবর্তন যার এর মাধ্যমে ঘটেছিল, তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনীর ইতিহাসে দুটি সংশোধনী মোটামুটি সব দলের মতৈক্যেই পাস করা হয়। একটি দ্বাদশ সংশোধনী, যার মাধ্যমে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফেরে বাংলাদেশ। আরেকটি ত্রয়োদশ সংশোধনী, যার মাধ্যমে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান করা হয়। এর মধ্যে দ্বাদশ সংশোধনীর জন্য রেফারেন্ডাম বা গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।
সামরিক শাসকরা জনগনের কথা শুনবেন না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস এই স্বাক্ষ্যই দিচ্ছে যে, বেশ কয়েকটি বিতর্কিত সংশোধনী গণতান্ত্রিক আমলেই হয়েছে। সবশেষ তিনটিই সংশোধনী নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। এই তিনটিই সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা তাদের ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করেছেন। আর এগুলো করার আগে বিভিন্নভাবে যেসব জনমত এসেছে তার কোনোটাই গ্রহণ করা হয়নি।
২০০৪ সালে বিএনপি জোট সরকার সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী পাস করে। যেহেতু তারা সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ্য ছিল, সেহেতু তাদের আর চারদিকে তাকাতে হয়নি। আর জনগন কী চাইল না চাইল তাতে কি বা আসে যায়? এই সংশোধনীর অন্যতম একটি বিষয় ছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের সময় ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ করা। তবে এর পেছনের কারণ ছিল তাদের পছন্দের প্রধান বিচারপতি যাতে তখনকার পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন। এই সংশোধনীর ফলাফল মারত্মকই ছিল বটে। প্রধান বিরোধী দলের আপত্তি ও আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থারই পতন হয়েছিল। দেশ চলে গিয়েছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে।
২০১১ সালে পাস করা হলো পঞ্চদশ সংশোধনী। এর অনেক পরিবর্তনের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা। যে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করে এই ব্যবস্থা চালু করেছিল তারাই জনগণ, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের মতামত, এমনকি আদালতের রায়কে সম্পূর্ণভাবে বিবেচন না করে বাতিল করেছিল এই ব্যবস্থা। কারণ তারাও ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। এবং বলা যায় এই সংশোধনীও বাংলাদেশের রাজনীতিকে জটিল করেছে মাত্র।
সবশেষ, ষোড়শ সংশোধনী যেটি নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয় তুলে আনা হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট এ নিয়ে প্রকাশ্যেই তাদের ক্ষোভ জানিয়েছে। তবে এটাকে স্বাগত জানিয়েছে বিএনপি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রায়ে আমার মতো আমজনতার কতটুকু লাভ ক্ষতি আছে? বিচারপতিদের চাকরি থেকে অভিসংশনের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলেই বা কী, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে থাকলেই বা কী? কোনোখানেই কি জনগণের, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে যাদের রাষ্ট্রের মালিক বলা হয়েছে, কোনো ধরনের কর্তৃত্ব আছে?
বাংলাদেশের সংসদে যেকোনো বিল পাস বা সংশোধনী যে একটি জনবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, তা বোঝার জন্য আমি নিজের একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমি আওয়ামী লীগের জোট প্রার্থী রাশেদ খান মেননকে ভোট দিয়েছিলাম। তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সংসদে যখন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হলো, তখন তার অনেক বিষয় নিয়ে আমার আপত্তি ছিল। আমি জানি, অনেক ধারা নিয়ে খোদ রাশেদ খান মেননেরও আপত্তি ছিল। কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ তাকে শেষ পর্যন্ত দলের ( কারণ তিনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত ছিলেন) সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে দেয়নি। কিন্তু আমি তো তাকে এজন্য ভোট দেইনি। তার মানে কি দাঁড়ালো? ভোট দেওয়া মানেই, একজন সাংসদের সব কিছুতে সমর্থন করা নয়। যেকোনো আইন বা সংশোধনীর ক্ষেত্রে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরও ভিন্নমত থাকতে পারে। কিন্তু সেটা কি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে? হয়েছে কোনো কালে?
অতএব বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোয়, সাংবিধানিক আইনে জনগণের ক্ষমতা বলতে ভোট দেওয়া পর্যন্তই। ওটা দেওয়া হয়ে গেলে, পাঁচ বছর দর্শক হয়ে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো ক্ষমতা নেই। সভা-সমিতি বা গণমাধ্যমে একটু আধটু যেসব জনমত উঠে আসে তা কোনো কালেই শোনা হয় না। তাই এ ধরনের যেকোনো বিতর্ক দেখলেই আমার মনে হয় ওপরতলার লোকদের রাষ্ট্রীয় কুট-ক্যাঁচালে আমারা জনগণ দর্শক মাত্র!
কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকরাই (জনগণ) যদি নিস্ক্রিয় হয়, তবে রাষ্ট্রের কী হবে? অন্তত এ দাবি তো তোলা যায় যে, সংবিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিবর্তন বা পরিমার্জনে অবশ্যই জনগণের মতামত শোনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, সেটা ভোটের মাধ্যমেই হোক বা অন্যভাবে। নইলে বারবার ক্ষমতাসীনরা তাদের নিজেদের জন্য সংবিধান সংশোধন করবে, অযথা বিতর্ক করবে আর ভুলে যাবে জনগণের ভোটেই তারা এই ক্ষমতা লাভ করেছে! আর একটা কথা ভুললে চলবে না, এ রকম পরিস্থিতিতে কিছু শক্তি বা গোষ্ঠী মাছের তেলে মাছটা ভেজে নিতে চায়। তাতেও আদতে ক্ষতিটা জনগণেরই হয়।
লেখক : জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

তপন মাহমুদ