আবু হাসান শাহরিয়ারের কাছেই প্রশ্নটি রাখলাম...
গত ৬ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। ‘মানুষ কখন নিজেকে জ্ঞানী মনে করে? যখন উপলব্ধি করে সমাজকে দেওয়ার মতো তার আর যোগ্যতা নেই। কথাটা কি ঠিক?’
বেশির ভাগ বন্ধু এর পক্ষে লাইক দিয়েছেন। কোনো কিছু না ভেবে লিখেছিলাম কথাগুলো।
গত দু-তিনদিনে ফেসবুকে বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছে একটি স্ট্যাটাস। স্ট্যাটাসটি এ রকম— ‘বাপু হে, ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। প্রবাসে বসে বাঙালিকে হাইকোর্ট চিনিয়ো না। কথায় কথায় রেমিট্যান্সের গল্প কেন শোনাও? বিদেশিদের জুতোপালিশ করতে গেছ; সেই কাজটাই মন দিয়ে করো। আয়-উপার্জন আরো বেশি হবে। ওই উদ্দেশ্যেই তো স্বদেশের মায়া ত্যাগ করেছ। তবে আর দেশের জন্য মায়াকান্না কেন?’
স্ট্যাটাসটি দিয়েছেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। প্রতিভাবান একজন ছড়াকার, কবি ও সম্পাদক ছিলেন। আমার একান্ত মূল্যায়ন এটি। একজন লোকও যদি এই মূল্যায়নে একমত না হন, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।
মুক্তকণ্ঠ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা বের হয়েছিল ’৯৭ সালে। সেই পত্রিকার সাহিত্য পাতাটির নাম ছিল ‘খোলা জানালা’। দুর্দান্ত একটি সাহিত্য সাময়িকী। তার ঘোর নিন্দুকরা আর শত্রুরাও বলেছেন দূর থেকে- ভালো, পরিচ্ছন্ন একটি সাহিত্য পাতা। লেখা ছাপা হওয়ার জন্য অনেকেই উন্মুখ হয়ে থাকতেন সেই সময়।
তবে আমার মূল্যায়নে ‘ছিলেন’ শব্দটায় জোর দিয়েছি। কারণ নিশ্চয়ই রয়েছে। আবারও জোর দিয়েই বলছি, এটা আমার একান্ত মূল্যায়ন। কেউ অখুশি বা কারো বগল বাজানোর মতো খুশি হওয়ার কারণ নেই। তিনি অনেকদিন চুপচাপ ছিলেন। ছড়া, কবিতা লেখা বা সাহিত্য সম্পাদনা থেকে দূরেই ছিলেন। কে জানে এ সময় নীরবেই হয়তো লিখে গেছেন। কিন্তু পত্রপত্রিকায় তাঁর সরব উপস্থিতি টের পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর ভেতরে একধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয়।
একজন ছড়াকার ও কবি নিজেকে যখন অতিজ্ঞানী বা কাউকে পাত্তা না দেওয়ার বিষয়টি ভাবতে থাকেন, তখন মানুষের ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার আসন থেকে তিনি ক্রমশ নিম্নগামী হতে থাকেন। এ বিষয়টি বুঝতে না পারা বা বুঝেও না বোঝার ভান করাটাও তাঁকে নিম্নগামী হতে সহায়তা করে। কিংবা এমনও হতে পারে তিনি মনে করেন এটা স্টান্টবাজি। এভাবে কথা বললে বা কাউকে পাত্তা না দিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বললে মানুষের নজরে আসা যাবে সহজে। মানুষ আমাকে নিয়ে আলোচনা করবে, হোক সেটা ভালো বা মন্দ।
কিন্তু এভাবে স্থায়ী কিছু হয় না, এটা উনি আমার মতো মূর্খের চেয়েও নিশ্চয়ই ভালো বোঝেন।
উনি ফেসবুকে যে কথাটি লিখেছেন, সেই প্রসঙ্গে আসি। আমার কিছু শৈশবের বন্ধু বিদেশে থাকে দেড়-দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। তাদের কারো কারো ভেতরে যখন টাকার গরমে শুধু বাংলাদেশ নিয়ে উন্নাসিকতা দেখি, তখন খুব রাগ হয়। এই একটা জায়গায় হয়তো কিছুটা মিল পাওয়া যাবে কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের সঙ্গে। আবার এটা ঠিক মিলও না। কারণ বিষয়টা কারো কারো ক্ষেত্রে ঘটে, সবার ক্ষেত্রে নয়।
যাঁরা জীবনের তাগিদে বিদেশ গিয়েছেন, তাঁদের আমি সম্মান করি। তাঁদের কেউ গিয়েছেন বাবা-মা-ভাই-বোনকে একটু ভালো খেয়েপরে রাখতে। কেউ গিয়েছেন এ দেশে চাকরি-বাকরির কোনো সুযোগ না থাকায়। কেউ গিয়েছেন দেশে নিরাপত্তাহীনতার কারণে। বিদেশে গিয়ে তাঁরা কী কাজ করেন সেটা আমার কাছে কোনো বড় ব্যাপার না।
কোনো কাজকেই ছোট মনে করি না। দেশে ধাপ্পাবাজি করে পয়সা কামানোর চেয়ে বিদেশে গিয়ে পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করা অনেক সম্মানের। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও তাঁরা ভূমিকা রাখছেন। যদিও তা অনেক কষ্টের। অনেক ত্যাগের। প্রিয়জনদের দেশে ফেলে বিদেশে গিয়ে একাকীত্ব জীবনযাপন দুঃসহ যন্ত্রণারই বটে।
কী কারণে আবু হাসান শাহরিয়ার ক্ষেপলেন? বোধগম্য হচ্ছে না। বিদেশ গিয়ে সবাই কি জুতা পলিশ করেন? আর যদি বা করেই থাকেন, সেটাকে কেন তিনি খাটো করে দেখছেন? নাকি এটাও তাঁর একটা আলোচিত হওয়ার ক্ষুদ্র প্রয়াস? যে প্রয়াসই হোক না কেন, এটা শুভবুদ্ধির কাজ না, এটা তাঁর জ্ঞানের কাছে বুদ্ধির কাছে একেবারেই নস্যি ‘এই আমিও’ বুঝতে পারছি, তিনি কেন বুঝছেন না? নাকি বুঝেশুনেই কর্মটি তিনি করলেন?
আবার আসি সেই শুরুর প্রশ্নটিতে, ‘মানুষ কখন নিজেকে জ্ঞানী মনে করে? যখন উপলব্ধি করে সমাজকে দেওয়ার মতো তার আর যোগ্যতা নেই। কথাটা কি ঠিক?’
কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, প্রশ্নটি আপনার কাছেই থাকল।
লেখক : ছড়াকার ও সাংবাদিক।

সারওয়ার-উল-ইসলাম