অভিমত
রোহিঙ্গা সংকটের এক মাস : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকট শুরুর এক মাস কেটে গেল। গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গিদের হামলার অভিযোগ তুলে সেনা অভিযান শুরু হয়। গত এক মাসে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনা ও বৌদ্ধরা কত রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে, তা সঠিক করে বলা কঠিন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যায়, এ সংখ্যা তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার কিংবা এর বেশি। তবে একটি পরিসংখ্যান থেকে ধারণাটি আরো স্পষ্ট হতে পারে। রোহিঙ্গা শিবিরে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্তত এক হাজার ৩০০ শিশু রয়েছে, যাদের বাবা বা মা কেউই নেই। মানে তাদের বাবা-মা উভয়কেই হত্যা করা হয়েছে। রাখাইনে ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ২১৪টি পুড়িয়ে দিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে চার লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। এদের মধ্যে আড়াই লাখের বেশি শিশু আছে। পালিয়ে আসার সময় নাফ নদে ২৩টি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১০ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এদের মধ্যে ৫৭ শিশু, ৩০ নারী ও ২৩ পুরুষ।
এ ছাড়া অনেক লাশ ভেসে গেছে। এই তথ্য থেকে কিছুটা ধারণা করা যেতে পারে ভয়াবহতা সম্পর্কে। আগে থেকেই বাংলাদেশে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এখন সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসেছে। গত এক মাসে বাংলাদেশে ঢুকেছে চার লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা। জাতিসংঘ এরই মধ্যে জানিয়েছে, সম্প্রতি শুরু হওয়া সহিংসতায় রোহিঙ্গারা যেভাবে বাংলাদেশে আসছে, তাতে এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অবশ্য বাংলাদেশ সরকারের এক হিসাবমতে, দেশে ১৯৭৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলে ১০ লাখ ৪৭ হাজার ৪৫৫ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
মূলত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতিত। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকে অসংখ্যবার রোহিঙ্গা মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের ওপর চলেছে নির্মম নির্যাতন। নির্যাতিত এ গোষ্ঠী নিজ দেশের নাগরিকত্ব হারিয়ে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বেসামরিক সশস্ত্রগোষ্ঠী ও বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের ধারাবাহিক নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময়ে বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৭০ সাল থেকে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছাড়তে শুরু করে। গত সাড়ে চার দশকে ১৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়েছে। এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে।
এভাবে বর্বরতা চালিয়ে সারা বিশ্বের শুধু ঘৃণাই কুড়িয়েছে অর্ধশতাব্দীকাল সেনাশাসনে থাকা মিয়ানমার। বিপরীতে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য নিজেদের সীমান্ত এবং হৃদয় খুলে দিয়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে হয়েছে প্রশংসিত। বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে। মিয়ানমারে গত এক মাসে চলমান এই বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ব গর্জে উঠেছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সব আন্তর্জাতিক সংগঠনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে নিন্দা জানিয়েছে। তবে চীন, রাশিয়া ও ভারত রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে তাদের বর্বরতাকে এক ধরনের মদদ জুগিয়েছে। মিয়ানমারে কথিত গণতন্ত্রের নামে সেখানে বিনিয়োগের পথ খুলেছে। গত ৫০ বছরে সামরিক শাসনকালে গোটা বিশ্ব মিয়ানমারের ওপর অবরোধ দেওয়ার সময় চীন তাদের পাশে ছিল। ফলে মিয়ানমারের সঙ্গে চীন নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে। মিয়ানমারে চীনের অসংখ্য প্রকল্প আছে। নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজও তারা পাবে। এ কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন মিয়ানমারকে কিছুই বলে না। রাশিয়া কৌশলগত কারণে মিয়ানমারের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছে। রাশিয়া মনে করে, রোহিঙ্গা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। এসব দিক দিয়ে বলা যায়, দেশগুলোর নিজস্ব স্বার্থের কাছে রোহিঙ্গাদের মানবিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে আছে।
রোহিঙ্গা সংকটে এবার সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক ভূমিকা রখেছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রশংসার দাবিদার হয়েছে। মিয়ানমার উত্তেজনা বাড়াতে বাংলাদেশকে বারবার উসকানি দিলেও তা ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পেশিশক্তি প্রদর্শনের চেয়ে কূটনৈতিক দিকের প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করেছে। জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন। জাতিসংঘের এই অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা জাতিগত নিপীড়নের শিকার দীর্ঘদিন থেকে। তবে এবারের অধ্যায়টি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সামনে জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনে শেখ হাসিনা বিদ্যমান পরিস্থিতি বর্ণনার পাশাপাশি দেশের ভূমিকা ও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, বাংলাদেশে সরকার অভ্যন্তরীণভাবেও এই সংকটকে যেভাবে মোকাবিলা করেছে এবং করে যাচ্ছে, তাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে সরকার প্রশংসা পেয়েছে। গত এক মাসে রোহিঙ্গা শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। বিশেষ করে লাখ লাখ মানুষের থাকা-খাওয়ার চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ যে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে, তা যেকোনো বড় ধরনের বিশ্ব চ্যালেঞ্জকে হার মানিয়ে দেয়।
রোহিঙ্গাদের পেছনে অর্থ ব্যয় নিয়ে এরই মধ্যে একটি গবেষণা করেছে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। তাদের গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার। কিন্তু শরণার্থী রোহিঙ্গাদের আয়ের কোনো উৎস নেই। মিয়ানমার থেকে আসা প্রত্যেক রোহিঙ্গার পেছনে বছরে ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার। বছরে অন্তত ৫০ কোটি ডলার প্রয়োজন। দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। আর জাতিসংঘের (২২ সেপ্টেম্বর) হিসাবে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ছয় মাসে অন্তত ২০ কোটি ডলার (প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা) ব্যয় হবে। এর ওপর আগে আসা রোহিঙ্গারা তো রয়েছেই। এ অবস্থা বিবেচনায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এরই মধ্যে তাদের সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
এরই মধ্যে রোহিঙ্গা সংকটে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক গণ-আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে মিয়ানমার। দেশটির বিরুদ্ধে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউশন বিভাগ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করতে পারে। আমার বিশ্বাস, এই রায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিশ্বে জনমত গঠনে সোচ্চার ভূমিকা তৈরি করতে পারবে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে কেনিয়া, ২০১১ সালে আইভরিকোস্ট ও ২০১৬ সালে জর্জিয়ার বিরুদ্ধে আইসিসি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করেছে, তা এখনো চলছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধেও এভাবে তদন্ত চলতে পারে।
কাজেই দীর্ঘদিন থেকে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের যে চরম অবস্থা গত এক মাসে সৃষ্টি হয়েছে, তা এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলমান সংকটকে উপেক্ষা কিংবা অজ্ঞার যে দুঃসাহস মিয়ানমার দেখিয়েছে, তা সত্যিই ভয়াবহ। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মিয়ানমারে যা হচ্ছে, তা জেনোসাইডের অন্তর্ভুক্ত। মিয়ানমার জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ মুহূর্তে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের শুধু নিন্দাজ্ঞাপন কর্মসূচি নয়, বরং মিয়ানমারে এক মাস থেকে চলমান গণহত্যা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা দৃষ্টান্তের সঙ্গে প্রশংসিত হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা