অভিমত
চলছে সামাজিক আন্দোলন ‘আমিও’
টুইটারে হ্যাশট্যাগসহ ইংরেজিতে 'মি টু' নামে নতুন একটি সামাজিক গণজাগরণী আন্দোলন শুরু হয়েছে, যেটার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘আমিও’। গত রোববার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই 'মি টু' লিখে সারা বিশ্বের নারীরা তাদের সাথে ঘটে যাওয়া নির্যাতন এবং অপমানের কথা অকপটে প্রকাশ করছেন। এই প্রচারণা বর্তমানে ভাইরাল হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী। কিন্তু কি এই 'মি টু'।
ছোট দুটি শব্দ ‘মি টু’, এই শব্দ দুটিই এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল। যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে জোরালো আওয়াজ তুলতে হ্যাশট্যাগ ‘মি টু’ লেখার সর্বপ্রথম আহ্বান জানিয়েছেন আমেরিকান অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো।
এরপর থেকেই টুইটার ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে এই হ্যাশ ট্যাগ আন্দোলন শুরু হয়েছে। আলিশা মিলানো নামের ওই অভিনেত্রী ফেসবুকে লিখেন, 'আপনি যদি যদি নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকেন তাহলে 'মি টু' লিখে টুইট করুন।' তাঁর এই পোস্টটিতে ১০ হাজার মানুষ সাড়া দিয়েছেন। অনেকেই 'মি টু' লিখে কমেন্ট ও করেছেন।
অভিনেত্রী আলিসা মিলানো টুইট করেন, ‘যারা যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাঁরা যেন ‘মি টু’ লিখে তাঁর টুইটের রিপ্লাই দেন।’ এরপর থেকে ফেসবুক ও টুইটারে দ্রুত ছড়িয়ে যেতে থাকে এই প্রচারণা। মিলানোর টুইটে শুধু নারীরা নয়, সাড়া দিচ্ছেন পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও। একাধিক তারকাকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত হলিউড প্রযোজক হার্ভে ওয়েইনস্টেনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগে ব্যাপক সাড়া জাগে।
মূলত নিউ ইয়র্ক টাইমসে ৫ অক্টোবর হলিউড প্রযোজক হার্ভে ওয়িন্সটিনের যৌন হয়রানি নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের বাজে অভিজ্ঞতা শেয়ার করার প্রচলন ঘটে। টুইটার কর্তৃপক্ষ এই আন্দোলনটি যেন আরো ছড়িয়ে যায় সেকারণে এটিকে বুস্ট আপ অপশনের আওতায় এনেছে। টুইটার প্রধান জ্যাক ডোরসি বলেছেন, এমন একটি বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পেরে আমরা গর্বিত।
কবি ও লেখক নাজোয়া যেবিয়ান হ্যাশট্যাগ 'মি টু' লিখে লিখেছেন, 'আমাকে এটার জন্য দায়ী করা হয়েছে, আমাকে বলা হয়েছে এসব খারাপ না, এই অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতেও মানা করা হয়েছে।'
যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিরা শুধু ‘মি টু’ লিখেই ক্ষান্ত হননি, তাদের অনেকেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, কোন বয়সে নিপীড়নের স্বীকার হয়েছিলেন এবং কাদের মাধ্যমে হয়েছিলেন সেসব বর্ণনাও লিখেছেন তাঁদের স্ট্যাটাসে। আমেরিকা থেকে এই প্রচারণা বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে ভারত ও পাকিস্তানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। ‘মি টু’ লিখে যৌন নিগ্রহের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন নারীরা।
যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মি টু’ বা ‘আমিও’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে পরস্পর অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন নারীরা। ফেসবুক-টুইটারজুড়ে রবিবার সারাদিন এই ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগের প্রচার চলেছে। পশ্চিমা অভিনেত্রী আলিসা মিলানো টুইট করেন, ‘যারা যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির শিকার হয়েছেন, তারা যেন মি টু লিখে তার টুইটের রিপ্লাই দেন।’ এরপর তা ছড়িয়ে যেতে থাকে বিশ্বব্যাপী।
যৌন নিপীড়নের শিকার নারীর প্রতিবাদ ‘মি টু’ বা ‘আমিও’। ‘হলিউডের প্রতাপশালী প্রযোজক হারভি ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়ায় যৌন হয়রানির মাত্রা বোঝাতে ‘মি টু’ ক্যাম্পেইন ঝড় তুলেছে। এটি বিশ্বের সব যৌন হয়রানির শিকার নারী কিংবা পুরুষের সরব হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের নারীরাও পরস্পর অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। বাংলাদেশেও ফেসবুক-টুইটারজুড়ে রোববার থেকে এই ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগের প্রচার চলেছে।
রোকেয়া চৌধুরী ও আঙ্গুর নাহার মন্টির ফেসবুক স্ট্যাটাসে রোকেয়া চৌধুরী লিখেছেন, ‘সচেতনতা বাড়াতে আমাদের নিজেদের সঙ্গে যৌন হয়রানি ঘটে থাকলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন লিখেছেন, “আসুন বাংলায় বলি ‘আমিও’ [Me too]। এই দেশে কোনও নারী যদি বলেন, ‘তিনি কখনো কোনো ধরনের যৌন নিপীড়নের শিকার হননি, সেটা হবে একটা ডাহা মিথ্যা কথা। ‘আমি কখনো মিথ্যা বলি না’ বলার মতোই মিথ্যা।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাসরিন খন্দকার লিখেছেন, ‘যদি কোনো নারী ও পুরুষ যৌন হয়রানির শিকার হন তাহলে মি টু হ্যাশট্যাগ দিন স্ট্যাটাসে। এর ভয়াবহতা জানান দেওয়া জরুরি।’ তিনি নিজের কিশোর বয়সের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেছেন স্ট্যাটাসে।
সিনিয়র সাংবাদিক আঙ্গুর নাহার মন্টি তাঁর ছেলেবেলার অভিজ্ঞতা এবং প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে লিখে বন্ধু স্বজন সবাইকে এ রকম হয়রানি নিপীড়নের সমস্যা নিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানিয়েছেন।
জেন্ডার এম্পাওয়ারমেন্ট নিয়ে কাজ করেন তাসাফি হোসেন। তিনি স্ট্যাটাসে ‘মি টু’ লিখে অন্যদেরও এই ক্যাম্পেইনের অংশীদার হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
শামীম আরা নীপা তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘এই দেশের নারীরা যৌন নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়নি- এমন ঘটনা বিরল... আমিও সেই তালিকার বাইরে নই... সেটা স্বীকার করে নিয়ে এহেন পরিস্থিতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান স্পষ্ট...
#Me_Too
#MeToo
এই ক্যাম্পেইনে পিছিয়ে নেই পুরুষরাও। স্থপতি অরূপ কুমার দাস লিখেছেন, ‘#MeToo, এর ম্যাগ্নিচিউডে আমি স্থম্ভিত ... হতভম্ব। যত দেখি তাতে প্রতিদিন ক্রমাগত লজ্জা পেতে হয় নিজের কাছে।’
আসলে যৌন হয়রানি কতটা ব্যাপক এই ক্যাম্পেইন আমাদের সামনে তা স্পষ্ট করছে। এখানে সংখ্যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের সমাজের প্রত্যেকটি নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের এই বিশ্বে যদি তিন বিলিয়ন মানুষ যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে একে মানবতার বিরুদ্ধে সর্বকালের সবচেয়ে বড় রোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আর সেই রোগের কারণ যখন যৌনবাদ, তখন তাকে যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারীর মতোই মোকাবিলা করা দরকার, সেটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে।’
তাই বলতে হয়- এই '#মি টু' আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সচেতন হয়ে ওঠুক নারীরা। তারা সামাজিকভাবে সোচ্চার হয়ে ওঠুক। যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে গড়ে তুলুক এক দৃঢ় ও অপ্রতিরোধ্য সামাজিক আন্দোলন।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন

মর্তুজা নুর