প্রতিবাদ
সুবোধের পর এবার দেয়ালে নাবিলা
খাঁচায় বন্দি সূর্যকে হাতে নিয়ে সুবোধের পলায়ন প্রবৃত্তি এবার ঢেকে দিল নাবিলার কাছে রক্তের খোঁজ। কোনো এক আবছায়া মানুষ মুমূর্ষু রোবটের জন্য রক্ত চান। মানুষ এখন আর মানুষ নেই। যান্ত্রিক প্রাণ বয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ। রোবট হয়ে গেছে। কৃত্রিম দম দেওয়া রোবটেরও আজ মরণদশা। তার জন্যই রক্ত খোঁজ করছেন এক পোস্টার। একজন ‘নাবিলা’ তার নিমিত্ত। সকল কথা হারিয়ে ফেলার আগে সর্বশেষ কথাটা শোনানোর জন্য যাকে উদ্দিষ্ট করা যায়। রাজধানীর দেয়ালে দেয়ালে শোরগোল তোলা লালসাদা পোস্টারে এন পজিটিভ রক্তের দায় মেটাতে পারবেন কি আমাদের পরম মমতা ও ভরসার আশ্রয়স্থল সেই ‘নাবিলা’?
সংবাদপত্রের স্যাটায়ারে গ্রাফিতিমানবদের জন্য ৫৭ ধারা বা গ্রেপ্তার লেখা থাক। আমাদের ভাবনাবৃত্তির অসংকোচ প্রকাশের শেষ ঠিকানা ঢাকার ওই দেয়াল। প্রতিবাদ জমে জমে সেই দেয়াল এখন অসাড় বোধহীন। তবু আমাদের সাহসের যা কিছু অবশিষ্ট, তার পুরোটাই লেখা থাকে দেয়ালের কানে। সেই কানের টেলিগ্রাম ওপরে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক বিদ্রোহীর তাতে কিছু যায়-আসে না।
লেজুড়বৃত্তি আর দলদাস প্রবণতার অসুখে ভুগে আমাদের মেরুদণ্ড ভয়ানক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। মস্তিষ্কের নিউরনে পচনের ঘুণপোকা। ভালোবাসা, মায়ামমতা আর ঔদার্যকে হারিয়ে দিয়ে তার দখল নিয়েছে স্বার্থপরতা, হিংসা আর ঘৃণা। বিমর্ষ হৃদয়হীন মানুষের ভিড় সবখানে। অন্যায্যতা, অন্যায় বা অসংগতি দেখেও চেপে থাকবার কিংবা চেপে রাখবার ভয়ঙ্কর ঘোড়ারোগ আমাদের পেয়ে বসেছে। আমরা তো এখন আর প্রতিবাদ করি না। কথাও বলি না। ওপরওয়ালারা যা খাওয়াচ্ছেন খেয়ে যাই, পুতুলের মতো যেভাবে নাচাচ্ছেন নেচে যাই। কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের ব্যক্তিসত্তা অথবা মানবীয় স্বাতন্ত্র্য? বাজারচলতি রাজনীতির কী অসুন্দর ঘুঁটি আমরা?
শেরপুরের কণিকা কিংবা মুন্সীগঞ্জের সানজিদারা যে বেলা না খেতে পেয়ে আত্মহত্যাকে আলিঙ্গন করে, সেই বেলা আমাদের ওপরতলার মুখে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার খই ফোটে। এখনো হাওর-বাঁওড় হাজার গ্রামের জল পারাপারে বাঁশের সাঁকোই প্রান্তিক মানুষের মূল ভরসা। তখন গড়ে ওঠে মিলিয়ন ডলারের পদ্মা সেতু। যেখানে ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে আট মাসের আয়েশা ধর্ষণের নিদান খোঁজে সেখানকার সর্বময় ক্ষমতায় আসীন ওই আয়েশার মতো দেখতে নারীরাই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঊর্ধ্বমুখী দামে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হোক, নাভিশ্বাস উঠুক; নেতার সুইস ব্যাংকে জমানো অর্থস্ফীতির তাতে কোনো হেরফের হয় না। পথ হারিয়ে ফেলা স্বদেশের চলনটা যে উল্টোরথেই।
আমাদের সত্যি জানা নেই, আর কত মিথ্যা ভাষণ শুনলে গোয়েবলস লজ্জা পাবে আর কত অলীক স্বপ্নের দোলাচলে দুললে তবে তাকে দম ফুরানো রঙিন ফানুস বলা হবে?
এমন এক দুঃসময়ে ‘সুবোধে’র বিবেক যদি নির্বিকার শহুরে মানুষের ঘুম ভাঙায়; মুমূর্ষু মানবসত্তার জন্য চেতনার রক্ত চায় তবে তা চলুক না। তবু তো জবান বন্ধ করে রাখা মানুষেরা ভার্চুয়াল বইয়ের পাতায় লিখে রাখছে প্রতিবাদের দিনলিপি। একদিন হয়তো লিখে রাখা এমন অভিজ্ঞতার ‘অ্যানা ফ্র্যাঙ্ক ডায়েরি’ই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মোড় ফেরাবে। নিভু নিভু ইচ্ছেরা হয়ে উঠবে প্রেম ও দ্রোহের যুগল প্রতিচ্ছায়া। ভালোবাসতে ভুলে যাওয়া মানুষেরাই ভালোবাসায় ফিরে এসে প্রেমের মহাকাব্য রচনা করবে। হতাশা কাটিয়ে গ্রাফিতিকার তার গ্রাফিতি করবে, ‘অন্ধকারে আলো ফিরেছে, সুবোধ তুই পথ খুঁজে নে!’
এককালে কবি নির্মলেন্দু গুণ সতেজ বৃক্ষের মতো সাহস সঞ্চয় করে ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘মারমুখো অন্যায়ের রাহুগ্রাসে আমাকেও দিতে হবে প্রতিবাদে নৃশংস আগুন।’ হন্তার সাথে কখনো আপস না করার প্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমিও তোমাদের মতো প্রতিবাদে/ বলেছি তখন, প্রেমাংশুর বুকের রক্ত চাই।’
আমাদের একালের অদৃশ্য পোস্টারওয়ালাও জনৈক নাবিলার কাছে রক্তের দাবির কথা শোনাতে চান। তাঁর এই চাওয়াকে হয়তো কোনো এক ভীতু পাগলাটে প্রেমপ্রবরের মামুলি আকুতি বলে চালিয়ে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু দহনের এই কালে পোস্টারের ভেতরগত প্রতিবাদী ‘ফিলোসফি’ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের সামাজিক অবক্ষয় আর হারিয়ে ফেলা মূল্যবোধ ‘নাবিলা’ বা ‘সুবোধ’কে খুব সহজেই পাশ কাটাতে পারবে কি?
মানুষের হা মুখ বন্ধ হয়ে গেছে সেই কবেই। প্রতিবাদ জমে জমে এক সময়ের মুখরা এখন নৈঃশব্দের কংক্রিট দেয়াল। কথা হবে না। শুধু বোধকে খুঁজে ফেরার সময় এখন। সহজ লোকের বড় আকাল। সব চিন্তা-প্রার্থনার সকল সময় এখন শূন্য। সব দেবতারে ছেড়ে নিজের প্রাণের কাছে ফিরতে চায় হালের হুজুগে সমাজবিচ্ছিন্ন বেদনাহত কোনো এক মানুষ। যার করোটিতে বাস করে প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’-এর মগজ :
আলো-অন্ধকারে যাই-মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোনো এক বোধ কাজ করে!
স্বপ্ন নয়-শান্তি নয়-ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!
আমি তারে পারি না এড়াতে
সে আমার হাত রাখে হাতে”
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

ফারদিন ফেরদৌস