সংবিধান
সংবিধান পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ দিক
বর্তমানে বাংলাদেশে একটি সাংবিধানিক সংকট চলছে। সংবিধান মেনে শাসনব্যবস্থা চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এ সংকটের কারণে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই গণতান্ত্রিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি, পারছেও না। ৫ জানুয়ারি ২০১৪-র নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ সংকটের রূপটি আরো প্রকট হয়েছে। কার্যত এটা সামনে এসেছে যে, বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে দেশে সবার অংশগ্রহণে এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আয়োজন প্রায় অসম্ভব। এ কারণে অনেকেই ভাবছেন, দেশের সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে প্রত্যাবর্তন জরুরি। বাংলাদেশের ওই প্রথম সংবিধানটি বিভিন্ন সময়ে সামরিক আইন ও শাসন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। বদল ঘটেছিল সেটির নীতি ও কৌশলে।
কয়েক বছর আগে দেশের সর্বোচ্চ আদালত [সুপ্রিম কোর্ট] তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে ১৯৭২ সালের সংবিধানের কয়েকটি সংশোধনীকে [পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম সংশোধনী] অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেছেন। সামরিক আইনের অধীনে সম্পাদিত ওই সংশোধনীগুলো সামরিক আইনকে বৈধতা দিয়েছিল। বলে রাখা প্রয়োজন যে, সুপ্রিম কোর্ট কোনো অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী নন। বরং সংবিধানে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিকে সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর এ ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধানতম শর্ত হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সমর্থন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের আনুগত্য করা।
একসময় দেখা গেছে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ‘রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী সামরিক বাহিনীর’ প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে সামরিক আইনকে বৈধ ও সংবিধানসম্মত বলে রায় দিয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের ‘বিবেচনারও’ বদল হয়েছে বা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা এবং সেটির নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি। এর সঙ্গে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ইত্যাদির কোনো সম্পর্ক নেই; যদিও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
রাষ্ট্রে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রয়োজন হয় জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য। বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস জনগণ। তাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চিত করার মধ্যদিয়ে জনগণের এই সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকর হয়। তাই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো জনগণের ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতে পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি; সেগুলোর বিলি-বণ্টন এবং উৎপাদনের উপকরণের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব সঠিকভাবে স্থাপন। এ ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয় সংবিধানের মাধ্যমে। কারণ সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের সংকলিত রূপ।
একটি রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণের রাষ্ট্রগঠনকালীন রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ পদ্ধতির জন্ম দেওয়া। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো সংবিধান প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যাতে সব নাগরিক স্বাধীনভাবে মতামত প্রদান ও তর্ক-বিতর্ক করতে পারে এবং এমন বিধি প্রণয়ন করা যাতে নাগরিকের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা কীভাবে রাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করতে পারে। এ ছাড়া আরেকটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন, যাতে সংবিধান তার নিজ স্বাধীন সার্বভৌম ক্ষমতা বিনষ্ট না করে। এসবের ভিত্তিতে প্রণীত হওয়া উচিত সংবিধান।
সংবিধান প্রণয়নকারী নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের স্বাধীন ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতে পারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। তবে প্রতিনিধি নির্বাচনও হতে হবে স্বাধীন ও ব্যক্তিনিরপেক্ষ। আর এই নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যক্তিকে তার প্রতিনিধিত্ব না করে, তার ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করবে। কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যক্তিকে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন এই শর্তে যে, নাগরিকের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর স্বাধীন ও সার্বভৌম ক্ষমতার বিকাশ সাধন করা ও বিকাশের পথে সব বাধা অপসারণ করার বিধিবিধান সংবলিত সংবিধান প্রণয়ন করা। অর্থাৎ জনগণের নির্বাচিত একটি প্রতিনিধি সভাই পারে রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন করতে। এটাকে রাজনৈতিকভাবে সংবিধান সভা বা গণপরিষদ বলা হয়ে থাকে।
আমরা জানি যে, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদ বা সংবিধান সভার নির্বাচন ছাড়াই পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান পরিষদ গঠিত হয়েছিল স্বাধীন জনগণের ম্যান্ডেট ব্যতিরেকে। ফলে ১৯৭২ সালের সংবিধান স্বাধীনতাযুদ্ধের অর্জন হলেও তা জনগণের সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়নি, জনগণের মৌলিক অধিকার বিকাশের সহায়তা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন বাংলাদেশের জনগণ তার গণতান্ত্রিক অধিকারহীনতায় ভুগছে। জনগণের জাতীয় সম্পদ ও জাতীয় অর্থনীতি বিকাশের ওপর জনগণের কোনো কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নেই এবং এই কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ তার সাংবিধানিকভাবেই নেই। জনগণের সম্পদ ও জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সংবিধান।
গণতান্ত্রিক সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে যে, জনগণের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তার বিকাশ উপযোগী সাধারণ রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ ও লিপিবদ্ধ করা, যার ওপর দাঁড়িয়ে যাবতীয় রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান, আইনকানুন, ব্যবস্থাপনা চালিত হবে এবং এটা হবে সাংবিধানিকভাবে বাধ্যবাধকতার মধ্যে। আমরা জানি, ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনায় মূল নীতিসমূহে কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিধান রাখা হয়নি। বরং তা এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখার বিধান করার মধ্য দিয়েই এই অগণতান্ত্রিক চেহারা পরিষ্কার করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি মেনে চলার কোনো সাংবিধানিক গ্যারান্টি নেই। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ, যা সংবিধানের প্রথম ভাগে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে — সাংবিধানিকভাবে আদালত দ্বারা বলবৎ করার অধিকার নাগরিককে প্রদান করা হয়নি। এই বিধান দ্বারা সমগ্র সংবিধানকে অকার্যকর করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। ফলে সংবিধান পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পতিত হয়েছে। এবং গত ৪০ বছরে শাসকশ্রেণীর যেসব দল ক্ষমতায় এসেছে তারা সবাই এই অকার্যকর সংবিধানের ফল ভোগ করেছে আর জনগণ পড়েছে অধিকারহীনতায়, সম্পদহীনতায়, জাতীয় দীনতার অতল গহ্বরে।
১৯৭২ সালের সংবিধানের দ্বিতীয় অগণতান্ত্রিক বিষয় হচ্ছে যে, যেসব আইন বা বিধি রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ বা সংকোচন করে অথবা অধিকার চর্চায় বাধা প্রদান করে, সেসব ঠেকানোর কোনো উপায় সংবিধানে রাখা হয়নি।
ফলে আমরা দেখি যে, জাতীয় সংসদ জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করে, এমন আইন বা বিধিবিধান করেছে, যা কালো আইন বলে প্রচারিত। এসব কালো আইন হলো মোটা দাগে জরুরি ক্ষমতা আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, র্যাব গঠনের আইন, পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন, অতিসম্প্রতি প্রণীত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে আদালতের আশ্রয়লাভের অধিকার খর্ব করে এমন আইন ইত্যাদি ইত্যাদি।
আর তৃতীয় অগণতান্ত্রিক বিধান হচ্ছে, সংবিধানের সংশোধনীর জন্য জাতীয় সংসদকে দেওয়া সীমাহীন ক্ষমতা, যার দ্বারা শাসকশ্রেণী ইচ্ছেমতো ব্যক্তিস্বার্থে, দলীয় স্বার্থে, গোষ্ঠীস্বার্থে সংবিধানের সংশোধন করতে পারে। এর নজির রয়েছে এ দেশে। যেমন : বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁকে পুনরায় প্রধান বিচারপতির পদে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে প্রণীত সংবিধান সংশোধনী আইন। ১৯৭৪ সালের সংবিধান সংশোধন আইন, যার দ্বারা একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তৃতীয় সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতিকে জরুরি ক্ষমতা আইন জারির ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছিল। এই জরুরি আইন চলাকালীন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, আদালতে যাওয়ার মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছিল।
চতুর্থত, অগণতান্ত্রিক বিধান হিসেবে উল্লেখ করা যায় সংবিধানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার সীমাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সমস্ত ক্ষমতা প্রদানের বিধান। ফলে রাষ্ট্রের আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ রাষ্ট্রে নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীর একক অধীনে পরিচালনার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রে সাংবিধানিক শাসনের পরিবর্তে দলের, ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর ও তাঁর পরিবারের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের পরিবর্তে দলতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। সুশাসন ও আইনের শাসনের পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারী ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা চালু রয়েছে।
পঞ্চমত, রাষ্ট্রের সেনাশাসনের সুযোগ বন্ধ করতে সংবিধানে কোনো বিধিবিধান না থাকা। ব্রিটিশ উপনিবেশিক সেনা আইন ও কাঠামো পরবর্তীকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাঠামো আইনের পরিবর্তন করে জনগণের সেনাবাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ না থাকার কারণে দেশে সামরিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছে। যদিও এ দেশের জনগণ পাকিস্তান আমল থেকেই এই সেনাশাসন ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন সংবিধান ধারণ করতে পারেনি।
অবশেষে বাংলাদেশের সংবিধানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আইনসমূহ ও বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমস্ত বিধিবিধান যা পাকিস্তান আমলে বহাল ছিল তা বহাল রাখার, বলবৎ রাখার বিধান সন্নিবেশ করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জনগণের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রকেই বরং পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
সাংবিধানিক বা শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের জন্য উপরোক্ত বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে, সংবিধানের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিষয়টিকে সামনে আনতে হবে এবং তার ভিত্তিতেই করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম : সংবিধান বিশেষজ্ঞ। গণতান্ত্রিক সংবিধান সংগ্রাম কমিটির সভাপতি।

অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম