দ্রব্যমূল্য
লাগাম টানবে কে?
বেড়েই চলেছে গৃহস্থালি পণ্যের দাম। কি সাবান, কি টুথপেস্ট, পাউডার, কি ডিটারজেন্ট—সবকিছুরই দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দেখার যেন কেউ নেই। বাজার চলছে ইচ্ছেমতো। গৃহস্থালি বিভিন্ন পণ্য ও টয়লেট্রিজ পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো একই পণ্যের দাম মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে বছরে দুবার বাড়িয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে কারো কোনো তদারকি নেই। নিয়ন্ত্রণের নেই কোনো উদ্যোগ। কোনোভাবেই এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। এর লাগাম টেনে ধরার চেষ্টাও করছে না। সে সুযোগে অন্যায় দাম বৃদ্ধি চালিয়ে যাচ্ছে মুনাফাখোর কোম্পানিগুলো। ক্রমাগত এই বর্ধিত দামের চাপে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। একদিকে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যেমন—চাল, ডাল, তেল, নুনের দাম; অন্যদিকে দাম বাড়ছে এসব গৃহস্থালি পণ্যের। নানামুখী বর্ধিত মূল্যের এ চাপে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ জনতা। অথচ দেখার কেউ নেই।
চাল-ডাল-তেল-নুনের দাম গত কয়েক বছরে বেড়েছে কয়েক দফায়। সাধারণ পেঁয়াজের দামই এখন কেজিপ্রতি ১২০ টাকা, ভাবা যায়? বছরজুড়েই এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে রিপোর্ট দেখা যায় পত্র-পত্রিকায়। টেলিভিশনে দেখা যায় বিশেষ প্রতিবেদন। টকশোতে আলোচিত হয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়ে ওঠে। আলোচনা-সমালোচনার মুখে বিভিন্নমুখী চাপে পড়ে সরকারও এসব পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যোগী হয়। বাজার মনিটরিং সেল গঠনসহ দাম নাগালের মধ্যে রাখার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু অবস্থা ব্যতিক্রম এসব গৃহস্থালি পণ্যের ক্ষেত্রে। এসবের দাম বাড়লেও দেখার কেউ নেই। কার্যত সরকারেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এসব পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। এ সুযোগে গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে দাম।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক হিসাবমতে বাসাবাড়িতে নিত্যব্যবহারের টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম গত এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। কল্পনা করা যায়? অথচ চালের দাম একটু বাড়লেই চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে এখন বাজারে। চাল-ডালের দাম নিয়ে যখন ব্যস্ত সাধারণ মানুষ, ঠিক সে সময়ে সবার অলক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলছে এসব পণ্যের দাম। অথচ এসব পণ্য কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য নয়। চাল-ডালের মতোই অতীব জরুরি এসব পণ্যের বর্ধিত এ দামে নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের। নিম্নবিত্তের কথা বলা বাহুল্য। বাজার চলছে একেবারেই বল্গাহীন, নিয়ন্ত্রণহীন। স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যাচ্ছেতাইভাবে বাড়তি দামের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
টুথপেস্ট, পাউডার, সাবান, ডিটারজেন্ট, টয়লেট পেপারসহ গৃহস্থালির অন্যান্য পণ্যের দাম বছরে একাধিকবার বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একটি বহুজাতিক কোম্পানির কাপড় কাচা সাবান বিক্রি হয়েছে ১৬ টাকায়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এসে তার দাম বেড়ে হয় ১৭ টাকা। ছয় মাস পর পুনরায় ওই সাবানের দাম বাড়িয়ে করা হয় ১৮ টাকা। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে দুই টাকা বেড়েছে জনপ্রিয় এ সাবানের দাম। একইভাবে গত এক বছরে একটি বহুজাতিক কোম্পানির ৫০ গ্রামের টুথপাউডারের কৌটার দাম ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়েছে। দেশীয় একটি কোম্পানির টয়লেট পেপারের দাম এক বছরের ব্যবধানে ১৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ টাকা। ২৩ টাকার বাসন পরিষ্কার করার সাবান হয়েছে ৩০ টাকা। ৪৫ টাকার আধাকেজি ডিটারজেন্ট এখন দাম বেড়ে হয়েছে ৫৫ টাকা।
গত এক বছরে বিভিন্ন টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়ে ৩৩ শতাংশে ঠেকেছে। অথচ এ নিয়ে তেমন কোনো হৈচৈ চোখে পড়েনি। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি। একেবারেই স্বেচ্ছাচারীভাবে এসব পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে একচেটিয়া দখল থাকার কারণে এভাবে বল্গাহীন দাম বাড়াতে পারছে তারা। বিশেষ কয়েকটি পণ্যের ক্ষেত্রে বাজার একেবারেই তাদের দখলে। কোনো একটি কোম্পানি নিজের পণ্যের দাম বাড়ালে তাকে অনুসরণ করে অন্যরাও সমজাতীয় ওই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। যে প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা পণ্যের গুণগত মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে, তা হচ্ছে দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে। দাম বাড়লেও পণ্যের মান বাড়ানো হয়েছে মর্মে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। একই মানের পণ্য ছয় মাসের ব্যবধানে বিক্রি করা হচ্ছে বর্ধিত দামে। ঠিক কী কারণে দাম বাড়ানো হলো, তার কোনো জবাব নেই। কেউ এর জবাব চায়ও না তাদের কাছে। এসব পণ্যের বাজারে সরকারের নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ। ক্রমাগত ঠকছে ভোক্তা। ঠকছে সাধারণ মানুষ। লাভবান হচ্ছে বহুজাতিক ও দেশীয় গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদক কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপেও দেখা গেছে, মানুষের ভোগ্যপণ্যের তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত পণ্য খাতে খরচ বেড়েছে গেল বছর। বিবিএস প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির তথ্যেও দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় গত অক্টোবরে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি বেশি।
ক্রমাগত দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো চটকদার বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নিচ্ছে। একই পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে নানা রঙে, নানা ঢঙে। টেলিভিশন পত্রিকা খুললেই বাহারি বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিজ্ঞাপন ও বাজারজাতকরণে। অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের উৎপাদন খরচকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞাপন ও বিপণনের খরচ। বর্ধিত এই বিজ্ঞাপন খরচ কিন্তু কোম্পানি বহন করছে না। তারা তা চাপিয়ে দিচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বারবার দাম বাড়িয়ে বিজ্ঞাপন বিপণনের বাড়তি খরচ তুলে নিচ্ছে। শ্রমিক, কুলি-কামার, মুটে-মজদুরসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর পড়ছে বাড়তি চাপ। অথচ এই চাপ অপসারণের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বাজার চলছে ইচ্ছেমতো। যে কোম্পানি যেভাবে খুশি নিজেদের এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। ঠিক কী কারণে ছয় মাসের ব্যবধানে তারা দাম বাড়াচ্ছে, তার কারণ জানা যায় না। মূলত কারণ জানার জন্য তাদের জবাবদিহির ভেতরে নিয়ে আসার জন্য কোনো উদ্যোগও নেই। সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় দেশীয় ও বহুজাতিক এসব কোম্পানির স্বেচ্ছাচারিতায় বাড়ছে দাম হু হু করে। বর্ধিত দামের চাপে পড়ে সাধারণের দৈনন্দিন খরচের তালিকা কেবল লম্বাই হচ্ছে।
এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ে সন্তুষ্টি নেই জনসাধারণের মনে। চালের দাম সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে বসে আছে। তেলের দাম বেড়েছে, ডালের দাম বেড়েছে, বেড়েছে নুনের দাম। এক কেজি গরুর মাংস কিনতে কৃষকের চলে যাচ্ছে প্রায় এক মণ ধান। এক কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করে কৃষক হিমশিম খাচ্ছে এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি। তার ওপর যদি এভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকে গৃহস্থালি পণ্যের দাম, তাহলে জনসাধারণ যাবে কোথায়? এই বর্ধিত দামের চাপ থেকে তাদের উদ্ধার করবে কে? কে টেনে ধরবে ক্রমাগত দাম বাড়িয়ে চলা এসব কোম্পানির লাগাম? এইভাবে স্বেচ্ছাচারীভাবে দাম বৃদ্ধি চলতে থাকলে সাধারণের জীবন আরো অতিষ্ঠ হয়ে পড়বে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির যে ধারা চলছে, তার সুফল কখনোই সাধারণ জনগণ ভোগ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের দৈনন্দিন খরচের তালিকা সন্তোষজনক অবস্থানে রাখা যায়। সাধারণ জনতার চাওয়া খুব বেশি নয়। তারা চায়, দুবেলা দুমুঠো ভাত জুটুক, অন্তত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলোর দাম নাগালের মধ্যে থাকুক। দৈনন্দিন খরচ সীমার বাইরে গেলে যেকোনো উন্নয়নে সাধারণ জনগণের সন্তুষ্টি আসে না।
কাজেই এসব গৃহস্থালি পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকারেই নিতে হবে সে উদ্যোগ। মুনাফাখোর কোম্পানিগুলোর লাগাম টেনে ধরতে হবে। জবাবদিহির ভেতরে নিয়ে আসতে হবে এদেরকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো এ ক্ষেত্রেও সরকার মনিটরিং সেল গঠন ও বাস্তবায়নসহ নানামুখী উদ্যোগ নিতে পারে। যেকোনো মূল্যে দৈনন্দিন খরচ জনতুষ্টির ভেতরে নিয়ে আসতে হবে। উন্নয়নের সুফল তবেই উঠবে সাধারণ জনতার ঘরে।
লেখক : শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

রবিউল করিম মৃদুল