এইচএসসি ফল বিপর্যয়ের বিবিধ কারণ
এবারের পরীক্ষার ফলই বলে দিচ্ছে, আশাভঙ্গ শিক্ষার্থীর সংখ্যাই এবার বেশি। তবে এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ফল অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকেই দায়ী করেছেন। ঠিক যে সময়টায় পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছিল, তখন তাদের পরীক্ষার হলে যাওয়ার পথে পরীক্ষার ভয়ের পাশাপাশি পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে মরার ভয়টাও একেবারে কম ছিল না, যা তাদের মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করেছে। তা ছাড়া পরীক্ষার আগে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তারা ঠিকমতো ক্লাসও করতে পারেনি। তখন সংবাদেও আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছিলাম জামায়াত-শিবিরের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড।
পরীক্ষার সময়ও বারবার শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ার আগ্রহকে করেছে ব্যাহত। সবকিছু মিলে তখন ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষা-পরবর্তী অভিব্যক্তি এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি অন্তত জোর দিয়েই বলতে পারি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পরীক্ষার ফল খারাপ করার মাত্রাকে অনেকাংশেই বৃদ্ধি করেছে।
তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাদেও প্রশ্নপত্র প্রণয়ন এবং নতুন কিছু নিয়ম প্রবর্তনও ফল খারাপের অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
গতকালের প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে দেখা যায়, এবার প্রশ্নপত্র প্রণয়নে ছিল ভিন্নতা। প্রতিবারের মতো এবার যে বোর্ডের প্রশ্নপত্র, সে বোর্ড তো করেইনি; বরং এ বছর নিজ বোর্ড বাদ দিয়ে বাকি সাত বোর্ডের ২৮ সেট প্রশ্নপত্র থেকে যেকোনো চার সেট পছন্দ করা হয়েছে। তাই তথাকথিত সাজেশন করে প্রতিবছর মোটামুটি ভালো ফল করে পার পেয়ে যাওয়ার যে সুযোগটা ছিল, এ সুযোগ না পেয়ে খারাপ ফলপ্রাপ্ত হয়েছে অনেক শিক্ষার্থী। তবে এ ব্যবস্থা নেওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া রোধ করা। এ ছাড়া আমি মনে করি, এ ব্যবস্থা নিয়ে শুধু গণ্ডায় গণ্ডায় এ প্লাস পাওয়ার জন্য পরীক্ষার আগেই ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে মা-বাবা পর্যন্ত প্রশ্নপত্র কেনার জন্য যে ছোটাছুটি করতেন, সে বাণিজ্য থেকে এবার মুক্তি মিলবে; এটা আমার বিশ্বাস। তবে এ ধারায় যাঁরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বা পুরোনো প্রশ্নপত্র দেখে যাচাই-বাছাই করে নিজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের তালিকা তৈরি করে সবকিছু না জেনে বরং শুধু এ প্লাস অর্জনের যে সস্তা শিক্ষা বা সস্তা সার্টিফিকেট, সেটা থেকেও পরবর্তী প্রজন্ম নিস্তার পাবে।
তবে সবকিছুর পাশাপাশি কিছু ব্যাপার আমাদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। প্রতিবছরই নতুন কোনো চিন্তা বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পরীক্ষার বিষয়বস্তু বা গিনিপিগ হয়ে না যায় শিক্ষার্থীরা। আমরা জাতি হিসেবে খুব তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাচ্ছি। তবে সব ব্যাপার তো তাড়াহুড়ো করে সম্ভব নয়। কোনো কোনো ব্যাপারে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি দরকার। শিক্ষার অনেক ক্ষেত্রেই সে প্রস্তুতি আমাদের নেই। ফল প্রকাশের পর শুনতে পাচ্ছিলাম, আইসিটি কোর্সটিতে নাকি অনেক ছেলেমেয়েই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর দায়টা কি শুধু তাদের ওপর বর্তায়? একেবারেই নয়। আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি, সেখানে অর্ধেকের অনেক বেশি জনগোষ্ঠীই জানে না কীভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয়। মনে রাখা দরকার, বাচ্চাকে অক্ষর শেখানোর আগে তাকে পেনসিল দেওয়া বাঞ্ছনীয়। তাদের হাতে যখন রিসোর্সই নেই, সেই রিসোর্স ব্যবহারের পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হবে না এটা স্বাভাবিক।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়েও যখন হার্ড কপি ও সফট কপির পার্থক্য বোঝাতে হয় বা কম্পিউটার কোর্স পড়াতে গিয়ে শুনতে হয় কারোরই কম্পিউটার নেই অথবা মাত্র একজনের আছে, তখন আমার খুবই কষ্ট হয় এ প্রজন্মের জন্য। জীবনযুদ্ধে এদের অবস্থাটা এমনই, ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই নামতে হচ্ছে যুদ্ধে। এর ফলে আশানুরূপ রেজাল্ট আর করা হয় না।
একটু যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, রাঙামাটি বা খাগড়াছড়ি—এ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর শিক্ষার্থীর ফল খুব একটা ভালো হয়নি। আমার অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বন্ধুই তাদের বিভিন্ন ভাষা রপ্ত করার বা শিক্ষা গ্রহণের দুর্দশার কাহিনী শুনিয়েছে। এর পেছনে আমি মনে করি, আমরা শিক্ষকসমাজও কম দায়ী নই। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ—এ প্রত্যয়টা আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি। কিন্তু ঠিক এ সময়টাতে শিক্ষার মানোন্নয়নে দরকার জ্ঞান এবং জ্ঞানীর বিকেন্দ্রীকরণ, যার বড় বেশি অভাব আমাদের রাষ্ট্রীয় এ ব্যবস্থায়। সেই পাহাড়ি এলাকাগুলোতে দরকার সবচেয়ে ভালো শিক্ষককে, যিনি শেষ বেঞ্চের ছাত্রছাত্রীকে ক্লাসের প্রথম বানানোর যোগ্যতা রাখেন, যিনি শুধু নিজে জানেন তা নয় জানাতে পারেন, ছাত্রছাত্রীর মধ্যে জ্ঞানের আগ্রহ সৃষ্টি করে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে পারেন। আমার মতে, রাষ্ট্র থেকে বেশি মাসোয়ারা দিয়ে হলেও সরকারি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো শিক্ষককে পাঠাতে হবে দুর্গম এলাকায়।
তাহলেই সামগ্রিকভাবে জাতির মেরুদণ্ড শক্ত হবে বলে আশা করতে পারি। এ ছাড়া সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে আমার মনে হয়, ফলাফলের এ ধস কাটিয়ে ওটা সম্ভব।
তবে এবার অনেক খারাপের মধ্যেও কিছু ভালোর প্রস্ফুরণ দেখতে পাচ্ছি। এবার যারা এ প্লাস পেয়েছে, ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে নয় অথবা সাজেশন করে পড়া ছাত্রছাত্রীও নয়; বরং তারা আসলেই ভালো ছাত্রছাত্রী, তাই তাদের কঠোর পরিশ্রম অকৃতকার্য অনেকের জন্যই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এ ছাড়া পাসের হারে মেয়েদের এগিয়ে থাকার তত্ত্বটাও এটাই প্রমাণ করে যে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। ভালো ফলের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক, যা এ বছর দুর্ভাগ্যজনকভাবে ছাত্রছাত্রীরা পায়নি। এর পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যও তাদের নির্দিষ্ট একটা সময় দেওয়া উচিত। প্রতিবছরই নতুন নতুন নিয়ম প্রণয়নের আগে একবার ভেবে নেওয়া ভালো, সে নিয়মের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের তৈরি করেছি কি না। যারা এবার ভালো করেছে, তাদের পরবর্তী চলার পথ শুভ হোক, আবারো নতুন কোনো নিয়মের চক্করে পড়ে যাতে তাদের স্বপ্নগুলো মিছে না হয়ে যায়। এবার ফল বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির শর্তাবলিও যদি একটু শিথিল করা যায়, সেটা সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে বলে আশা করছি। এ ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারার সুযোগটিও বিবেচনা করা যেতে পারে। আর যারা কৃতকার্য হতে পারেনি তাদের জন্য শুভকামনা থাকল, নিজের দুর্বলতাকে জয় করে পরের বছর তারাও এগিয়ে যাক জীবনযুদ্ধে।
লেখক : প্রভাষক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

কুন্তলা চৌধুরী