দৃষ্টান্ত
সিহাব ও টিটোনের লাল মাফলার
কবি গোলাম মোস্তফার একটি কবিতার লাইন দিয়ে শুরু করছি। তিনি লিখেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। আজ যে শিশু আগামী দিনে সে পিতা, দেশের নাগরিক ও নেতৃত্ব প্রদানকারী একজন পরিপূর্ণ মানুষ। নশ্বর এই পৃথিবীতে একজন চলে যায় আরেকজনের আগমনের মাধ্যমে সে স্থান পূর্ণ করে। এ ক্ষেত্রে একজন যোগ্য শিশুই পারে সমাজকে বিকশিত করতে, আলোকিত করতে।
শিশুরা স্বপ্ন দেখে নিজেদেরকে নিয়ে। কোমল হৃদয়ের শিশুদের রয়েছে সম্ভাবনা স্বপ্নময় ভুবন তৈরির। স্বপ্ন ভুবন তৈরি করে জীবনের নানা রঙের সুখ দুঃখের তুলির আঁচড়ে। আজকের শিশুরাই আগামীর স্বপ্ন কারিগর। সেই সব স্বপ্ন পূরণ তৈরি হবে তখনই যখন সেই কোমলমতি শিশুটি পারবে নিজের শৈশব, কৈশোরের লালিত স্বপ্নভূমির ভিত্তি মজবুত করতে।
শুধু কবি বা সাহিত্যিকদের লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কথাটার যথার্থতা মিলেছে রাজশাহীতে। দুই শিশু উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে রক্ষা করেছে দেশের কোটি টাকার সম্পদ। খেলার ছলে হোক আর বাস্তবিক কোনো চিন্তাধারা থেকেই হোক না কেন, তাদের এই কাজটি আজ পুরো দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
শিশু দুটির একজনের সবে মাত্র বয়স ছয়, অপরজনের সাত বছর। একজনের নাম সিহাবুর রহমান, আরেকজনের নাম টিটোন আলী। এই বয়সেই বুদ্ধিমত্তা আর বীরত্বে তারা অবাক করেছে সবাইকে। তাদের তাৎক্ষণিক সাহসী পদক্ষেপে ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে একটি তেলবাহী ট্রেন। তারা প্রমাণ করেছে, আজকের শিশুরাই আগামী দিনে বাংলাদেশকে যোগ্য নেতৃত্ব দেবে। তারাই এ দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
ঘটনাটি গত সোমবারের। রাজশাহীর বাঘায় দুর্ঘটনা এড়াতে ঠান্ডা নিবারণের লাল মাফলার উড়িয়ে ট্রেন থামিয়েছিল উপজেলার ঝিনা গ্রামের সুমন হোসেনের ছেলে সিহাবুর রহমান (৬) ও একই গ্রামের মহিদুল ইসলামের ছেলে টিটোন আলী (৭)। পাশের এক ক্ষেত থেকে বাড়ি ফেরার সময় তারা এই রেললাইন ভাঙা দেখতে পায়। তাদের বিবেকে বাদ সাধে। তারা ভাবে এই রেললাইনের ওপর দিয়ে ট্রেন গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই দুই খুদে শিশু তাই ট্রেন আসতে দেখে তাদের একজনের কাছে থাকা লাল মাফলার দিয়ে ট্রেনটি থামিয়ে দেয়। এর ফলে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় কোটি টাকার তেলবাহী ট্রেন।
রাজশাহীর এই দুই শিশু ট্রেনকে শুধু দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেনি, তারা পুরো দেশের মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, একটু সচেতন হলেই আমরা দেশের অনেক উপকারে আসতে পারি। নশ্বর এই পৃথিবীতে আমরা যখন নিজেদের আখের গোছাতে সবাই মহা ব্যস্ত, তখন এই দুই শিশু আমাদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই শিশুদের জন্য সত্যিকারের একটা বাসযোগ্য বাংলাদেশ কি আমরা গড়তে পেরেছি? শিশুরা কতটা নিরাপদে আছে আমাদের দেশে! তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, পূর্ণমাত্রায় বিকাশের অধিকার, শাসন-শোষণ-নির্যাতন-কুপ্রভাব, পাচার, পতিতাবৃত্তি থেকে নিরাপদ থাকার অধিকার এবং পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে পুরোপুরি অংশগ্রহণের অধিকার ইত্যকার বিষয়ে আজও আমরা সামগ্রিক সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। সাধারণত উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান, স্বাস্থ্য পরিচর্যা এবং আইনগত নাগরিক ও সামাজিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে শিশুদের অধিকারগুলো সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। যা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় সুশাসন, প্রচলিত আইন ও নীতির যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন সম্ভব। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, শিশুর দরিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে শিশুদের নিবৃত্ত করা, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, শিশুর জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা বিধান করা, অতঃপর শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ও উন্নয়নে রাষ্ট্র কর্তৃক সার্বিক প্রচেষ্টা গ্রহণ মূলত এর আওতাভুক্ত।
ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, কোমলমতি শিশুটি পারবে নিজের শৈশব, কৈশোরের লালিত স্বপ্নভূমির ভিত্তি মজবুত করতে, তবেই সেটা সম্ভব হবে। সিহাব আর টিটোনের মতো বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু তাদের স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত করে গড়ে তুলবে একটি সুন্দর ও সুগঠিত সমাজ। যে সমাজে বেড়ে উঠবে শিশুর সোনালি ভবিষ্যৎ, শৈশব স্বপ্ন। শৈশব স্বপ্ন বিকশিত হবে জীবন পরিবর্তনের নবধারায় নবরূপে আর এরই সঙ্গে আমাদের প্রিয় দেশ, প্রিয় জন্মভূমি পৌঁছে যাবে সাফল্যের শীর্ষ চূড়ায়।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

মর্তুজা নুর