অভিমত
পদদলিত মানুষ
সচেতনভাবে যদি কোনো কাজ করি, সেটা যদি ভালো হয়, সবার জন্য ভালো, নিজের জন্য এবং সমাজের জন্য; তাতে যদি কোন প্রশ্ন না থাকে, তাহলে কেন তেমনটা করি না? আরেকটু সচেতন হতে কী সমস্যা? লিফটের গোড়ায় কি গা ঠেসাঠেসি করে দাঁড়ানোর কোন দরকার আছে? একটু দূরত্বে দাঁড়ালে কী হয়?
একবার কমলাপুর রেল স্টেশনে গিয়ে এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। রেলের টিকেট কাটতে গিয়েছি একেবারেই অফ সিজনে। কোনো ভিড় বা ঠেলাঠেলি নেই। জাস্ট বিকেল বেলা হওয়ায় অফিসফেরত কিছু মানুষের চাপ আছে, যারা ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে যাবেন। স্টেশনের সব কাউন্টারের সামনেই ১৫-২০ জন করে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেক লাইনের শেষজনের পরে বেশ খালি জায়গা পড়ে আছে। এরপরও সবাই একজন আরেকজনের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি নিজে শেষ থেকে যখন লাইন শুরু করি, একটু ফাঁকা জায়গা রেখে দাঁড়াই। সামনের জনের সঙ্গে যেন গা না লাগে। এটা আমার এমনিতেই পছন্দ না। কিন্তু আমি তো আর শেষ পর্যন্ত ‘শেষ জন’ থাকতে পারি না। পেছনে আরো অনেকে চলে আসেন। প্রথম একজন একটু দূরত্ব নিয়েই দাঁড়ান। কিন্তু ক্রমেই ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস পড়তে শুরু করে ।কিছুক্ষণের মধ্যে এমন অবস্থা হয়, লাইনের কারো শরীর থেকে কাউকে আলাদা করা যাবে না; সবাই যেন আঠা যোগে আটকে রয়েছে একে অপরের সঙ্গে। বিরক্ত হয়ে পেছনে বললাম, ভাই, পেছনে তো অনেক জায়গা, সামনে কেন চাপাচ্ছেন? একটু সরে দাঁড়ান। পেছন থেকে উত্তর এল, ‘আপনার প্রয়োজন হলে পেছনে গিয়ে দাঁড়ান।’ আমি তাজ্জব বনে গেলাম। এ জাতিকে কে কী শেখাবে বলুন?
চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানিতে সোমবার পদদলিত হয়ে ১০ জন নিহত হওয়ার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার এ দুটি বাস্তবতা মনে পড়ে গেল- আমরা লাইন ধরতে পছন্দ করি না, আমরা ধৈর্য ধরতে পারি না। এটা বলার মাধ্যমে আমি আবার এটা বলছি না যে, এই ঘটনার পেছনে কেবল মৃত বা আহত ব্যক্তিরাই দায়ী। এর পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটা বড় রকমের দায় আছে। তবে, নির্মম এ ঘটনার শিকার মানুষও কিন্তু কোনো অংশে কম দায়ী নন। হয়তো তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সুনির্দিষ্টভাবে দায়ী, যারা অহেতুক ধাক্কা দেয়ার মতো কাজ করেছেন। খবরে দেখলাম, আহত একজন স্পষ্টই বললেন- পেছন থেকে ধাক্কা খেয়েই তিনি পড়ে গেছেন।
তবে পেছনের ধাক্কায় তাল সামলাতে না পারার পেছনেও একটা কারণ আছে। সেটা হলো, কমিউনিটি সেন্টারটির প্রবেশ পথটা একটু ঢালু। যার ফলে কেউই আর তাল সামলাতে পারেননি। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছেন। যারা তলানিতে পড়ে যান তাদের জন্য উপরে দলনে ব্যস্ত মানুষদের দয়া করারও কোনো উপায় থাকে না। ফলে ঘটে যায় মর্মান্তিক ট্র্যাজিডি। মানুষ দলে যায় মানুষ। উফ, এ যে কী যন্ত্রণার, কী দুঃসহ বেদনার, যাদের ওপর দিয়ে গেছে কেবল তারা বুঝেছেন। পৃথিবীর আর কারো শক্তি নেই সেই মুহূর্তকে অনুধাবন করার।
এই জায়গায় আমি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই আয়োজকদের। এমন একটা জায়গায় আপনি মেজবানের আয়োজন করেছেন, যেখানে খুব সাবলীলভাবে মানুষের প্রবেশ কঠিন হতে পারে, সেখানে কেন বাড়তি কোনো ব্যবস্থা রাখা হলো না? আমন্ত্রিত অতিথিদের বা দাওয়াতি মানুষদের গ্রহণ করার বা স্বাগত জানানোর কোনো ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। এটা কী ধরনের দাওয়াত? আজ যদি সেখানে এই ব্যবস্থা থাকত যে, প্রত্যেক অতিথিকেই, সে গরিব হোক আর ধনি হোক, আলাদাভাবে গ্রহণ করবে এবং তাকে কেউ নিয়ে গিয়ে বসার জায়গা করে দেবে, তাহলে এই ভিড় দেখে কর্তৃপক্ষই একটা ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কীভাবে সবার প্রবেশ সহজ করা যায় তার একটা উপায় বের করতে পারত। স্টেডিয়ামে ঢোকানোর মতো লাইনের ব্যবস্থা করতে পারত। বাড়তি স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিতে পারত। কিংবা খাওয়ার পর্ব সমন্বয় করতে পারত। এক জায়গায় সংকুলান হচ্ছে না মনে হলে অন্য জায়গায় বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারত। এসব কাজে সার্বিক ব্যয় যে খুব বেড়ে যেত তাও নয়। কিন্তু কোনো কিছুই করা হয়নি।
সবচেয়ে বড় গাফিলতি ধরা পড়েছে পূর্ব পরিকল্পনার ক্ষেত্রে। মেজবানে কতজন মানুষ হলে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার তার বিশদ পরিকল্পনা হয়েছে কি? তদন্তের দাবি রাখে। ১৪টি স্থানে মেজবান হয়েছে। সংখ্যালঘুদের জন্য কেবল একটি জায়গাই কেন রাখা হলো? দুটি বা তিনটি রাখলে কী হতো? আমার জানামতে চট্টগ্রামে সংখ্যালঘু মানুষ তো কম নেই। তাদের বেশিরভাগ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে ভালোবাসতেন। এই মানুষগুলো ভালোবেসেই তাঁর কুলখানিতে গিয়েছেন, ক্ষুধার তাড়নায় নয়। গলিতে পড়ে থাকা দেহগুলোর বেশিরভাগেরই ভালো পোশাক-আশাক ছিল, ভালো দামের জুতা ছিল। তারা গরিব নয়, ভুখা-নাঙ্গা নয়।
ভালোবাসার এই মানুষগুলোর জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা, একটু গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থাপনার বিষয়টা দেখা- এমন কিছু হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। যদি হতো তাহলে এমন হতো না। যদি হতো তাহলে এক জায়গায় বেশি ভিড় হতো না। বিকল্প অপশন রাখা হতো। যে কমিউনিটি সেন্টার কেবল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত হলো, তা সম্ভাব্য আগত সব অতিথিকে সংকুলান করতে পারবে কি পারবে না- সেই চিন্তা করা হয়েছে কি? অন্তত আমার মনে হয় না। ১০ জন মানুষের দলিত হয়ে প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা আয়োজকদের ছিল না।
এটা অবশ্য আমাদের ওই ‘কিউ’ বা লাইন না ধরার মতোই জাতীয় সমস্যা। আমরা কেবল আয়োজন করতেই অভ্যস্ত, আয়োজনের ব্যবস্থাপনা শিখি নাই; তা শেখার প্রয়োজনও মনে করি না। এর আগেও বাঙালি ধনকুবেরেরা জাকাতের কাপড় দেওয়ার নামে গরিব মানুষদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ধনকুবের লঞ্চ মালিকেরা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বেশি যাত্রী উঠিয়েছে আর মানুষ বেকুবের মতো ডুবে মরেছে এ দেশের নদীতে নদীতে। পথ চলতে এখনো মানুষ মরে বড়লোকের নির্মাণাধীন বাড়ির নির্মাণ সামগ্রির আঘাতে। রাস্তার বাঁকে বাঁকে কোনো সাইনবোর্ড না থাকায় তারেক মাসুদের মতো গুণী মানুষদের চলে যেতে হয় না ফেরার দেশে। পাহাড়ের পাদদেশে ঘর উঠিয়ে অসাধুরা, লোভীরা টাকা গুনে আর নিরীহ বাস্তুহারা মানুষ মাটিতে চাপা পড়ে পড়ে মরে।
একেকটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটি ঘটনার সময়ের বেশ পার্থক্য থাকে। কিন্তু অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনো তাড়না আমাদের নেই। মাঝে যে সময় আমাদের হাতে থাকে, তখন আমরা পূর্বের ন্যায় একই ঘটনা না ঘটার বিষয়ে কোনো বিশেষ ব্যবস্থার কথা ভাবি না। একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নতুনকোনো ব্যবস্থা নিই না। কীভাবে কোন সেবা আরেকটু ভালোভাবে দেওয়া যায়, কোনো আয়োজন বা কর্মকাণ্ড আরেকটু ভালোভাবে সম্পাদন করা যায়, সে ধরনের চেষ্টার যেন কোনো দরকারই নেই।
আবার আমরা যারা লাইন না ধরা বা ধৈর্য না ধরার কারণে বারবার দুর্ঘটনায় পড়ি, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করি- তারাও একই রকম থাকি। কোনো কিছু থেকেই কোনো শিক্ষা আমাদের নেওয়া হয় না। ফি বছর আমাদের কাছের মানুষ মরে নদীতে ডুবে, এরপরও আমরা লঞ্চের ছাদে উঠি। অনিয়ম করাতেই যেন আমাদের মজা। চট্টগ্রামের আসকার দীঘিতেও আমরা অনেকে একই কাজই করেছি। না হয় এমন দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়। আমরা কে কার আগে যাব- এটা নিয়ে প্রতিযোগিতা করেছি। রেসে হেরে যাওয়ার কপট ভয় থেকে হয়তো কেউ কেউ শক্তির প্রয়োগও করেছি। বিনিময়ে, পেটে এক রাশ ক্ষুধা নিয়ে কেউ দলিত হয়েছি, আর কেউ দলেছি আমাদেরই লোকজনকে। আমরা কে কাকে দোষ দেব, কে কার জন্য কাঁদব? দোষ কার, দোষী কে? ভাবনাটা সবারই ভাবা দরকার- যারা মরছি, আর যারা মারছি বা মরার উপলক্ষ তৈরি করছি।
লেখক : সাংবাদিক, আরটিভি

জাফর সোহেল