২০১৭
ভালো ছিলো কি বাংলাদেশ?
শেষ হয়ে গেল আরও একটি বছর। নানা চড়াই উৎরাই পাড়ি দিয়ে ২০১৮ সালে পা রাখছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন কারণেই ২০১৭ ছিল অন্যান্য বছরের চেয়ে একটু আলাদা। বিদায়ী এ বছরে বাংলাদেশের নানা ঘটনা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান লাভে করেছে। কখনো ইতিবাচক, আবার কখনো নেতিবাচক নানা বিষয়ের আগমন ও প্রস্থানের মধ্য দিয়েই শেষ হলো ২০১৭ সাল। আর নতুন বছরে ভালো কিছু প্রত্যাশা নিয়ে পুরনো বছরের ভালো-মন্দের হিসাবটা সবার মাথাতেই আসবে- এটাই স্বাভাবিক।
কথায় আছে, যায় দিন খারাপ, আসে দিন ভালো। আর এমন প্রত্যাশাটা আমারও। ২০১৭ সালের শুরুটা যেমন ছিল ঠিক তেমনি ২০১৮ সালের শুরুটা না হওয়াই ভালো। আবার ২০১৭ সালে যেসব নেতিবাচক ঘটনা আমাদেরকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেগুলো থেকেও আমরা মুক্ত থাকতে চাই। অনেক ভালো কিছুর প্রত্যাশায় ২০১৭ সালকে ফিরে দেখে ২০১৮ সালকে স্বাগত জানাতে চাই। এক কথায় বলা যায়, ভালো-মন্দের মধ্য থেকেই কেটে গেল ২০১৭ সাল।
বছরের প্রথম দিনেই পাঠ্যপুস্তকে ভুল দিয়ে যাত্রা হয়েছিল আর শেষটা হয়েছে প্রথম শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো কলঙ্ক মাথায় নিয়ে। বেশ কিছু ইতিবাচক অর্জন বাংলাদেশের অর্জিত হলেও মূলত নেতিবাচক ঘটনার প্রভাবে সেগুলো অনেকটা ম্লান হয়েছে। বছরের প্রথম দিনেই নতুন বইয়ের যে উৎসব শুরু হয়েছিল সেটি মূলত বইয়ের ভেতরে ছাপার মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ভুলে ভরা বই দিয়ে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’র বর্ণ পরিচয় অংশে ‘ওড়না’ বিতর্ক, পঞ্চম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’ এবং ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’- বইয়ে বানান ভুল, প্রথম শ্রেনির ‘আমার বাংলায়’ ১১নং পৃষ্ঠায় ‘ছাগল আম খায়’-এর মতো ‘হাস্যকর’ তথ্য ছিল। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’এ পদ্য ‘বিকৃত’ করাসহ ছিল নানা ধরনের ভুলভ্রান্তি। অষ্টম শ্রেণির আনন্দপাঠ বইটির সূচিপত্রে দেয়া সাতটি গল্পের সবগুলোই বিদেশি লেখকদের গল্প, উপন্যাস অবলম্বনে লেখা বা ভাষাগত রূপান্তর করা হয় বলে এটাকে বিদেশি সাহিত্যের হিমাগার বলেন কেউ কেউ।
এরই কয়েকদিন পরেই ১০ জানুয়ারি রাজধানীর ছোট দিয়াবাড়ি এলাকার একটি বাসা থেকে মা ও তাঁর দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়। দুই শিশুর মরদেহ বিছানার ওপর এবং মায়ের মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। আবার ২৮ মার্চ বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী।ঘটনার প্রায় দেড়মাস পর বনানী থানায় মামলা নেয়া হয়। এ নিয়ে চলে নানা সমালোচনা। ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে শিশু মেয়েসহ চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন এক বাবা। শিশু মেয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও বিচার না পাওয়ায় নির্যাতনের শিকার হওয়ায় বাবা-মেয়ে আত্মহত্যা করেন। ২০ জুলাই সকালে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে নীতিমালা প্রণয়নসহ সাত দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করলে পুলিশ ওই মানববন্ধনে বাধা দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ারসেল ছুড়লে ওই টিয়ারসেলের আঘাতে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান দুই চোখ হারায়। আবার চাঁদপুর ও জামালপুরে স্কুলের কোমলমতি শিশু কিশোর শিক্ষার্থীদের মানবসেতু বানিয়ে হেঁটে চলার ঘটনায় দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। প্রথমে চাঁদপুরের হাইমচরে পদ্মাসেতুর অনুরূপ মানব সেতুর মাধ্যমে ছাত্রদের পিঠের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান নুর হোসেন পাটওয়ারী হেঁটে যান। ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে ছোঁয়া পরিবহনের শ্রমিকরা আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্রী রূপা খাতুনকে ধর্ষণ করে। পরে রুপার ঘাড় মটকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে রেখে যায়।
১৭ অক্টোবর মঙ্গলবার ভোরে স্বামী পরিত্যক্তা অন্তঃসত্ত্বা পারভীন বেগমের প্রসব বেদনা শুরু হলে সোহেল নামের এক তরুণ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দুইটি হাসপাতাল থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ আজিমপুরের মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়েও চিকিৎসা মেলেনি ওই নারীর। ২৯ নভেম্বর এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় নকল ধরার কারণে পিরোজপুরে এক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে ওই বিদ্যালয়েরই ছাত্র এবং ছাত্রলীগের সভাপতি ও তার সহযোগীরা মারধর করে। ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের খবর পাওয়া যায়।
একটার পর একটা নেতিবাচক ঘটনায় দেশের অনেক উন্নয়ন এবং অর্জন ম্লান হয়েছে অনেকটা। তবুও দেখার মতো অর্জন পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ইস্যুতে সরকার তথা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জল হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনায় উঠে এসেছে। আবার বছরের প্রায় শেষ দিকে পোপ ফ্রান্সিসের বাংলাদেশ সফরও আলোচনায় ছিল বিশ্ববাসীর কাছে। ইউনেস্কোর একটি উপদেষ্টা কমিটি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে দেয়া বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামান্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ধরনের দলিলগুলো যে ‘মেমোরি অব দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয় সে তালিকায় এ ভাষণটিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হংকং এর একটি কোম্পানি ‘হ্যান্সন রোবোটিক্স’ ‘সোফিয়া’ নামের যে রোবটটি তৈরি করেছে সেই নারী রোবট ‘সোফিয়া’ এবার বাংলাদেশে এসেছে। এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রধান আকর্ষণ ছিল সিঙ্গাপুরে তৈরি ও সৌদি আরবের নাগরিকত্ব পাওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট সোফিয়া। ঢাকায় আসে সোফিয়া-র নির্মাতা ডেভিড হ্যানসনও। ১৭-২০ জানুয়ারি বিশ্বের সবচেয়ে শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ২০১৭ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ৪৭তম বার্ষিক সম্মেলন যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডব্লিউইএফের ৪৭ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের কোনো সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানের অংশগ্রহণ এটাই প্রথম।
বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাংলাদেশ ২০১৭ সালে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও এই অঞ্চলে বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমনের মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
২০১৭ সালেবাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয় বেড়ে ১৬১০ ডলার হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) উর্দ্ধগতি ২০১৭ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে হয়েছে। সরকারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর দেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৮ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এই প্রথম এতো উচ্চমাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে যা ছিলো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। দীর্ঘ দিনের স্বপ্নকে সত্যি করে পরমাণু যুগে ২০১৭ সালে পা রেখেছে বাংলাদেশ। পাবনার রূপপুর পরমাণু প্রকল্পের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সম্ভ্রান্ত নিউক্লিয়ার ক্লাবের সদস্য হওয়ার আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ৩১টি দেশ এই ক্লাবের সদস্য। এসব দেশে চালু সাড়ে চারশ’ পারমাণবিক চুল্লি থেকে বিশে^র মোট বিদ্যুতের ১১ শতাংশ উৎপাদন করা হচ্ছে।
স্যাটেলাইিট প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ ২০১৭ সালে একধাপ এগিয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সকল প্রস্তুতি এ বছর সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য হলো ২০১৭ সালে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্ত রাখা। দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে তৎপর ছিল বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যার ফলে দেশের কোথাও বড় ধরনের কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেনি। জঙ্গিবাদকে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলেও তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও ভিত্তি পুরোপুরি গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মহলে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, স্যাটেলাইট ও পরমাণু ক্লাবে যোগদান, ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের মতো মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সাফল্য ২০১৭ সালে বিশ্বের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কাছে রীতিমতো রহস্য। এ বছরই পুরো বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়তই মিলেছে তার স্বীকৃতি। খোদ জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক এখন বিভিন্ন সদস্য দেশকে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে বলছে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সরল স্বীকারোক্তি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বখ্যাত জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট তার সাম্প্রতিক সংখ্যায় বলেছে, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য রহস্যের মতো। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় কম বরাদ্দ, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ব্যাপক দারিদ্র সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অর্জন ব্যতিক্রমী এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘বিশ্ব লিঙ্গবৈষম্য’ প্রতিবেদন অনুসারে, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে অষ্টম। এ ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ শুধু সবার ওপরে নয়, অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে।
২০১৭ সালে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা একদিকে যেমন আমাদেরকে আলোকিত করেছে, আবার অন্যদিকে অন্ধকারে নামিয়েছে। আলো-অন্ধকারের মাঝখান থেকে ২০১৭ সাল কেটে ২০১৮ সালের যাত্রা শুরু। আর এই যাত্রাটি যেন ২০১৭ সালের মতো না হয়ে ভালো কিছুর মধ্য দিয়ে হয় সেই প্রত্যাশাটি আমাদের সবার। ফেলে আসা নেতিবাচক দিকগুলো আগামীতে মোকাবিলা করার প্রত্যয়ই হোক নতুন বছরের সম্ভাবনা। আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা