আন্তর্জাতিক
কিউবায় ‘রাজনৈতিক পরিবর্তনের’ স্বপ্নের পতাকা!
আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে তল্পিতল্পা গোটাতে হবে, ফিদেল কাস্ত্রোর এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালের ৪ জানুয়ারি হাভানার মার্কিন দূতাবাস থেকে পতাকা নামিয়ে ফেলতে হয়েছিল তিন মার্কিন সেনা ল্যারি মরিস, জেমস ট্রেসি আর মাইক ইস্টকে। তাঁদের তিনজনের বয়স এখন ৭৫ থেকে ৭৮-এর ঘরে। এই বয়সে আবারো হাভানায় পা ফেললেন তাঁরা, গেল ১৪ আগস্ট শুক্রবার নামিয়ে রাখা পুরোনো সেই পতাকাটিই ফের দূতাবাসে তুলতে। বলা হচ্ছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির উপস্থিতিতে এই পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার দূতাবাসের কার্যক্রম আবারো শুরু করল কিউবায়।
কিন্তু সত্যিই কি যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এতদিন বন্ধ ছিল হাভানায়? কূটনীতির পরিভাষা অবশ্য সে রকমই বলে। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস মোটেও পাততাড়ি গোটায়নি কিউবা থেকে। ৪ জানুয়ারি-১৯৬১ সালে পতাকা নামানোর পর ৭ জানুয়ারি ইউএস চার্জ দি অ্যাফেয়ার্স ড্যানিয়েল ব্রাডোক দূতাবাসের চাবি তুলে দেন সুইজারল্যান্ডের অ্যাম্বাসাডরের হাতে। আর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের আলিশান বাড়ি তার পর থেকে হয়ে ওঠে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের আবাসস্থল। যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে সুইজারল্যান্ড যেমন কিউবাতে, তেমনি কিউবার হয়ে চেকোস্লোভাকিয়া কাজ চালাতে থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ছদ্মাবরণ কিউবারও জানা ছিল। তাই ফিদেল কাস্ত্রো রাষ্ট্রপতি থাকার পর অন্তত দু-দুবার ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সম্পত্তি তিনি জাতীয়করণ করে ফেলবেন। ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টারের সময় মিয়ামিতে জড়ো হওয়া অভিবাসী কিউবানদের এবং তাদের পরিবার-পরিজনদের মধ্যকার স্বার্থসুবিধার দেখভাল করা নামাবলি চাপিয়ে সুইজারল্যান্ডের কাছ থেকে চাবি নিয়ে আবারো পুরোনো দূতাবাসে ‘ইন্টারেস্ট সেকশন’ খুলে বসে যুক্তরাষ্ট্র। তার পর ভবনটিতেও আনে ব্যাপক পরিবর্তন। ওই ‘ইন্টারেস্ট’ বাড়তে বাড়তে এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আবারো তার দূতাবাস চালু করেছে। ‘ইন্টারেস্ট সেকশন’ অবশ্য দূতাবাস হয়েছে ১৯ জুলাই থেকেই। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে কাজকর্ম শুরু হলো সেখানে।
এতদিন যুক্তরাষ্ট্র দূর থেকে কিউবায় ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে, আর এবার আনুষ্ঠানিকভাবে দূতাবাস চালু করা উপলক্ষে হাভানায় গিয়ে জন কেরি সেই একই কথা বলেছেন কিউবার নেতা ও জনগণের প্রতি।
‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মায়াকান্না অবশ্য আজকের নয়। একসময় ‘সত্যিকারের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের টুঁটি চেপে ধরত, জাতীয় সরকারকে উচ্ছেদ করে পুতুল সরকার অথবা সামরিক জান্তাকে ক্ষমতায় বসাত। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন ঘটার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য আরো বেপরোয়া। যুক্তরাষ্ট্রের এই কথিত ‘গণতন্ত্রপ্রীতি’ বনাম সহিংস রাজনৈতিক মৌলবাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চিড়েচ্যাপ্টা হতে হচ্ছে বিভিন্ন দেশের মানুষকে। ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’র জন্য যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছে সশস্ত্র শক্তি নিয়ে। কিউবার ক্ষেত্রে অবশ্য সে রকম করার সাহস হয়নি তার। তবে জন কেরি খোলাখুলিই বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া অব্যাহত রাখবেন তাঁরা। বোঝাই যাচ্ছে, দূর থেকে ৫৩ বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে পরিবর্তন আনতে পারেননি বলে এবার কাছে এসে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেবেন তাঁরা।
লেখার অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাষ্ট্রে আগামী বছরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিউবাও একটি অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠছে। মিয়ামিতে অভিবাসী কিউবানরা বিক্ষোভ করছেন। কিউবান-আমেরিকান সিনেটর রুবিয়ো কিউবার ভিন্নমতাবলম্বীদের অনুপস্থিতিতে দূতাবাস চালু করে মার্কিন পতাকা তোলায় ক্ষোভ জানিয়েছেন। আর রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মার্কো রুবিয়ো ও জেব বুশ দুজনেই তীব্র সমালোচনা করছেন কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ তুলে নেওয়ায়; হাভানায় পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস চালু করাতে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের হাতের তুরুপ ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারেস্ট সেকশন’ চালু করে অভিবাসী কিউবানদের স্বার্থরক্ষা করার বয়ান। দূতাবাস চালু করতে গিয়ে জন কেরির ‘গণতান্ত্রিক নীতি ও সংস্কারের’ কিংবা ‘রাজনৈতিক পরিবর্তনের’ উপদেশ কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে খাপ খায় না মোটেও। মনে হয়, তিনি তার দেশের ভোটারদের বোঝাচ্ছেন যে, দূতাবাস চালু করা ওই উদ্দেশ্যেরই ধারাবাহিকতা!
কিন্তু কিউবা কী ভাবছে? জন কেরি দূতাবাস আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার আগের দিন ফিদেল কাস্ত্রো ১৩ আগস্টে জাতির উদ্দেশে এক খোলা চিঠি লিখেছেন। হয়তো কূটনৈতিক কারণে রাউল কাস্ত্রোর মুখ দিয়ে যে কথাগুলো এখন আর বের হবে না, সেসব কথাই লিখেছেন তিনি। সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কিউবা-নীতির। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, কিউবায় মার্কিন দূতাবাস চালু হওয়ার ব্যাপারে একটি কথাও নেই ফিদেল কাস্ত্রোর সেই চিঠিতে! বরং তিনি অর্থনৈতিক অবরোধ করে রাখা বাবদ ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে।
মনে হয়, দূতাবাস চালু করার মধ্য দিয়ে কিউবা আর যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দূরত্বকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববাসীকে।
লেখক : সাংবাদিক

ইমতিয়ার শামীম