অভিমত
রাজনীতির আকাশে কালো না সাদা মেঘ?
৮ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আসলে কী হচ্ছে! কী হবে? খালেদা জিয়া কি বেকসুর খালাস পাবেন? নাকি সাজা! মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের শাস্তি হলে দলটি কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে? তারা কি হরতাল-অবরোধের চিরায়ত পথে চলবে? নাকি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করবে?
অবশ্য রায়ে খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কায় অস্থিরতা ছড়িয়েছে বিএনপিতে। সাজা হলে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা, এমন সংবাদ গত কদিন ধরেই শিরোনাম হচ্ছে গণমাধ্যমে। রাজপথে তাৎক্ষণিক বড় মাত্রায় প্রতিক্রিয়া দেখানোর পাশাপাশি স্বেচ্ছায় কারাবরণ, হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে দলটির মধ্যে আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সাংগঠনিক, নির্বাচনী প্রস্তুতিসহ যাবতীয় কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রেখে এখন আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে দলটির ভেতরে।
অন্যদিকে, কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন সরকারের মন্ত্রী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা। মামলার রায়কে ঘিরে তৎপরতাও বলে দিচ্ছে হার্ডলাইনে আছে সরকার। ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে সরকার পতনের আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু তাতে সাফল্য আসেনি। সরকার ও আওয়ামী লীগ মনে করছে, এখনো সবকিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে।
জিয়া অরফনেজ ট্রাস্ট মামলাটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এ ট্রাস্ট গঠিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। তখন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে ট্রাস্ট গঠন করতেই পারেন। কিন্তু ২০০৮ সালের ৪ জুলাই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক এ বিষয়ে যে মামলা দায়ের করে, তাতে মূল অভিযোগ করা হয়, 'প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ।' অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে যে অর্থ এসেছে, সেটা হস্তান্তর হয়েছে ট্রাস্টে। কুয়েতের আমির দুই কোটি ১০ লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ দিয়েছিলেন অরফানেজ ট্রাস্টের জন্য, অর্থাৎ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গঠিত ট্রাস্টে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪৮ বছরে আমরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি সব সূচকেই অনেক এগিয়েছি নিঃসন্দেহে। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য অভূতপূর্ব। আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানরা সেসবের স্বীকৃতও পেয়েছেন। তবে, কতটা উন্নত বা এগিয়েছে দেশের রাজনীতি? এখনো সুষ্ঠু নির্বাচন কিংবা গণতন্ত্রের জন্য নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। সবাই জণগণের কথা বলেন, যে জনগণই তাদের মূল শক্তি। কিন্তু বাস্তবে সেই জনগণের জন্য মাথাব্যথা খুব কমই দেখা যায়। নিজেদের ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ক্ষমতায় যাওয়াই বড় কথা। তাই যখনই যে দল ক্ষমতায় যায় তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গকে ব্যবহার করেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোকে চারটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে গণতন্ত্রের একটি র্যাংকিং প্রকাশ করে আসছে। ক্যাটাগরি চারটি হলো—পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, হাইব্রিড শাসন ও কর্তৃত্বপূর্ণ শাসন। ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের র্যাংকিং অনুযায়ী ২০১৫ সালের গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ হাইব্রিড ক্যাটাগরিতে ৮৬তম অবস্থানে ছিল। আর ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪-তে। গণতন্ত্রের নামে, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ করে নিরীহ মানুষ হত্যা, সম্পদ ধ্বংস আর অর্থনীতি বিকল করা নিয়ে গণতন্ত্রের নানা মন্দ দিক থাকলেও বিশ্বে এখন গণতন্ত্রেরই জয়গান।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্বাহী কমিটির সভা করার অনুমতি পাচ্ছে না বিএনপি। অবশ্য বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন : নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচার বন্ধ করা অথবা বিএনপিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি করার সুযোগ দেওয়া।
তবে একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে, তড়িঘড়ি কেন খালেদা জিয়ার মামলায় মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা? একটা কারণ হতে পারে নির্বাচনের বেশ আগেই বিএনপিকে বেকায়দায় রাখতে চায় সরকার। সাজা হলে বিএনপি হরতাল ডাকবে, ভাঙচুর এবং জ্বালাও-পোড়াও করবে। আর সেই মামলায় সিনিয়র নেতাদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হবে। বিএনপি মামলার চক্রে ঘুরপাক খাবে। আর জোরদার আন্দোলনের শক্তি বা মনোবল হারাবে। আর নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যাবে আওয়ামী লীগ। তবে, এবার বিএনপিকে বেশ কৌশলি মনে হচ্ছে। আগে যেসব ভুল করেছে এবার সেসব এড়িয়ে চলার চেষ্টায়। বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে, জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচী থেকে বিরত থাকার কৌশল নেবে বিএনপি। অর্থাৎ সরকারের কোটে বল তুলে দিতে চাননা তারা। তবে, মঙ্গলবার পুলিশ এবং বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং রাতে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়েক গ্রেপ্তার আবারো সিনিয়র নেতাদের গ্রেপ্তারের আশংকাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রকাশ্য আদালতে। মোট সাক্ষী ৩২ জন। ২৩৬ কার্যদিবসে শুনানি হয়েছে। বাদীপক্ষ আদালতে অনেক দলিল উপস্থিত করেছে। আসামিরা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন ২৮ দিন। যুক্তি উপস্থাপন করা হয় ১৬ দিন। অবশ্য বিএনপি নেতা এবং খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণদিত। সঠিক রায় হলে বেকসুর খালাস পাবেন বেগম জিয়া। তবে দুদকের আইনজীবীরা এই মামলায় তিন থেকে সাত বছরের সাজা আশা করছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটিও সমাপ্তির পথে রয়েছে। ২০১০ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করে দুদক। চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ আনা হয় ওই মামলায়।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি দেশে সামরিক আইনে দণ্ডিত অনেক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তবে, নবম সংসদের সদস্য থাকা এবং যিনি বর্তমান সংসদেরও সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মামলার রায় ও এর ঘটনাপ্রবাহও আমাদের সামনে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের আদালত অবমাননার রায়ও দৃষ্টান্ত, এই দুই মন্ত্রী দণ্ডিত হয়ে জরিমানা দিয়েছেন, বাস্তবতা হলো তারা সংসদ সদস্য আছেন, মন্ত্রী হিসেবেও বহাল রয়েছেন। কক্সবাজার-৪ আসনের এমপি (আওয়ামী লীগের) আবদুর রহমান বদির তিন বছর সাজা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আপিল চলমান, বাস্তবতা হচ্ছে তিনিও এমপি পদে বহাল আছেন। কাজেই নিম্ন আদালতে সাজা হলেই কোনো ব্যক্তি নির্বাচন করতে পারবেন না—বিষয়টি চূড়ান্ত নয় বলেই ধরে নেওয়া যায়।
মামলার রায় কী হবে, সেটা কারও জানা নেই। যে কোনো মামলায় সম্ভাব্য রায় দুটি হতে পারে- বেকসুর খালাস কিংবা অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি। আলোচিত এ মামলায় শাস্তি হলে তার বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আসামিপক্ষের রয়েছে। এটা তাদের আইনজীবী তাৎক্ষণিক করতে পারেন। তবে হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগের রায়ের সাজা হলে তখনই কেবল নির্বাচনে অযোগ্য হবেন বেগম জিয়া।
আগামী দিনগুলোতে রাজনীতির মাঠে নানা সমীকরণ বা মেরুকরণ হতে পারে। মামলার রায়ের তারিখ আাবার পেছাতে পারে। সেক্ষেত্রে জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা দুটির রায় একই দিন অথবা কাছাকাছি দিন ধার্য হতে পারে। একটিতে খালাস পেলেও অন্যটিতে সাজা হতে পারে বেগম জিয়ার। মামলাটি ধরে নেয়া যাক খালেদা জিয়ার সাজা হয়ে গেল। এরপর কী হবে? তাকে জেলে পাঠানো হতে পারে অথবা উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগও দিতে পারে সরকার। আদালতে আপিল করা হলে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যেতে পারে। বিএনপি রায়ে সন্তুষ্ট না হলে এ পথ গ্রহণ করবে, তাতে সন্দেহ নেই।
রাজনৈতিক এই দড়ি টানাটানিতে আগামীতে কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে, সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, এটিএন নিউজ।

মনিরুল ইসলাম মিন্টু