বইমেলা
মননশীলতা বিনির্মাণের হাতিয়ার
অন্য বছরের মতো আবারও শুরু হলো মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির আরেক নাম এখন যেন গ্রন্থসম্ভারের মাস। এই একটা মাস আমরা সবাই বই নিয়ে কথা বলব, বইয়ের কথা ভাবব আর বইয়ের সঙ্গেই থাকব। অবারিত চিন্তাশৈলীর বিনিময় আর জ্ঞানচর্চার আদান-প্রদানে কাটবে অন্তত এই এক মাস। লেখক, প্রকাশক আর পাঠকের এই অনন্য মিলনমেলা ঘিরে সরগরম থাকবে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশ। অঘ্রাত নতুন বইয়ের সান্নিধ্যে মুগ্ধ হবো সবাই। স্থূল বা ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ সব বই না কেনা হোক, না পাঠ করা হোক, তবু এই সত্য সমুন্নত থাকবে যে, নতুন বইয়ের পরতে পরতে খেলে যাবে স্বাধীনমত ও মুক্ত প্রাণের প্রতিধ্বনি। হোক কুঞ্চিত, তবু মানুষের মতপ্রকাশের ‘স্মারকচিহ্ন’ হয়ে উঠুক প্রাণের এই বইমেলা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বইমেলার বয়স প্রায় সমান। প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে মাত্র ৩২টি বই নিয়ে যে মেলার গোড়াপত্তন করেছিলেন, নানা বিবর্তন ও বিবর্ধনের মধ্য দিয়ে আজ তা এক মহীরুহে রূপ লাভ করেছে। প্রথম বইমেলার সব বই ছিল কলকাতা থেকে আনা। আর এখন বাংলাদেশের পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির হিসেব মতে, দেশে প্রায় চার হাজারের মতো প্রকাশক ব্যবসায়ী রয়েছেন। যদিও প্রকাশনা এখনো শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। কারণ, প্রকাশকদের প্রকাশিত সামগ্রিক পুস্তক তালিকার অধিকাংশ বিক্রি হয় ঘুরেফিরে ওই বইমেলায়। বাকি সময়টাতে প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জীবন-জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় মনোনিবেশ করতে হয়।
তার ওপর বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অনুভূতিতে আঘাতের বিচিত্র কার্যকরণ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে গেল কয়েক বছর বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের ওপর এক ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকাশিত গ্রন্থ মেলা আয়োজকদের মনঃপূত না হলে প্রকাশককে পর্যন্ত নিষিদ্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এমন বাস্তবতায় এবারও বাংলা একাডেমি ও ডিএমপির তরফে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে’ এমন বই মেলায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু একজন বিজ্ঞানমনস্ক সচেতন মানুষ ধর্মীয় গোঁড়ামি বা ধর্মান্ধতা নিয়ে কথা বলবেন, এটা খুব স্বাভাবিক। এবং সব সময় বিজ্ঞান, মানবিক দর্শন ও ধর্মদর্শন একই স্রোতে মিলবে, এমনটাও নয়। পৃথিবীতে লাখো বই আছে, তত্ত্ব আছে, সূত্র আছে, যা ধর্মের সঙ্গে দ্বান্দ্বিকতাপূর্ণ। সেসব বই ধর্মীয় মৌলবাদীরা কোনোদিনই মেনে নেবেন না। আবার ঐশী ধর্মে অবিশ্বাসীরাও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর থাকবেন। তাহলে উভয় পক্ষের স্বাধীনতাকে অবমূল্যায়িত করে শুধু ধর্মবিশ্বাসীদের পক্ষাবলম্বী একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত কেন? তাই যদি হয় তবে তো ধর্মের বাইরে এসে স্বাধীন চিন্তাশীলতায় পূর্ণ দার্শনিক, গবেষক ও বিজ্ঞানীদের লেখা পৃথিবীর তাবৎ বই বাতিলের তালিকাতে রাখতে হবে? সেটা কি আদৌ সম্ভব?
গেল ২৫ জানুয়ারি ডিএমপি সদর দপ্তরে বইমেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক সমন্বয় সভায় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, যদি কোনো লেখক ও প্রকাশকের বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়, তাহলে মেলায় স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করলে তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। যেকোনো নতুন বই মেলায় এলে বাংলা একাডেমি তা যাচাই-বাছাই করে দেখবে। যাতে কোনো বই ধর্মীয়, সামাজিক ও জাতীয় মূল্যবোধে আঘাত না করতে পারে।
কিন্তু জাতীয় মূল্যবোধে আমরা সবাই একমত পোষণ করলেও নিশ্চিতার্থেই ধর্ম ও সামাজিকতা একটি আপেক্ষিক বিষয় এবং মানুষে মানুষে সেখানে ভিন্নতা রয়েছে। তাহলে মূল্যবোধের ঔদার্যিক স্বরূপটা কি শুধু ওই বই দিয়ে নির্ণয় করা যাবে? ধর্মীয় সহাবস্থান ও উদারবাদিতা বহুদিনের রাষ্ট্রীয় কানুন, অভ্যাস ও চর্চার বিষয়। মূল্যবোধ রক্ষার নামে বইয়ের ওপর খড়্গ চালানো তাই চরম অপরিণামদর্শিতা।
ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাতে বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায় ও প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যার বিষয়টি মাথায় রেখেই পুলিশকে লেখক ও প্রকাশকের নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখা পুস্তক যদি বইমেলায় প্রবেশই না করতে দেওয়া হয়, তাহলে লেখক প্রকাশকের আর আলাদা নিরাপত্তার প্রশ্ন আসবে কেন? একজন লেখককে কেন বাংলা একাডেমির যাচাই-বাছাই কমিটির একপেশে নিক্তি দিয়ে পরিমাপিত হয়ে আসতে হবে? মানুষের চিন্তার দ্বার কেন রুদ্ধ করে দেওয়া হবে? সাংবিধানিক বাকস্বাধীনতার রূপটা কি তবে এমন?
তারপরও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বেষ্টনী রক্ষা করবার পর যেটুকু ছাড় আছে, তাই দিয়ে দীপ জ্বেলে যেতে হবে। চার শতাধিক প্রকাশক তাঁদের সাজানো-গোছানো স্টলে হাজারও বই নিয়ে বসে থাকবেন। যেখানে সময় করে লেখকরাও পাঠকের সকাশে হাজির হবেন। অন্তত একজন ভক্ত-পাঠকের কাছেও যদি জ্ঞানের আলো সম্প্রসারিত করতে পারেন কোনো লেখক, সেটাও তাঁর ভিন্নমাত্রার সার্থকতা বটে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গেল কয়েক মাস প্রচ্ছদ শিল্পী ভালোবেসে যত্ন করে বইয়ের মলাট এঁকেছেন। প্রুফ রিডার প্রুফ দেখেছেন। মুদ্রাক্ষরিক কথার জাদুকে একসূত্রে গেঁথেছেন। বইকর্মী প্রেসে ছাপা থেকে শুরু করে বই বাঁধাই করেছেন। এত মানুষের যুগল কর্মধারায় সার্থক হয়ে ওঠেছে আমাদের বইমেলা।
এমন প্রাণোচ্ছল উৎসব আয়োজনের মেলা থেকে আমরা কি একবার ঘুরে আসব না? পছন্দের একটা বই কিনব না? নিজের মনের ক্ষুদ্রতা ও অন্ধকারকে জিইয়ে রাখতে বই পড়া ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু অন্যের মন প্রসারিত করতে একটা বই দিয়ে উপহারের ডালি হিসেবে কি আমরা সাজাতে পারি না? তারপরও সংকীর্ণ মনের কঞ্জুসটা যদি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, তবে আমরা লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীকে স্মরণ করতে পারি : বই কিনে কেউ দেওলিয়া হয় না!
বাংলা চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক ও সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে যথাযথ বলেছেন, ‘সুশিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রই স্বশিক্ষিত। যথার্থ শিক্ষিত হতে হলে মনের প্রসারতা দরকার যা বই পাঠের অভ্যাসের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব। একজন স্বশিক্ষিত মানুষ সকল নীচুতা, স্পর্শকাতরতা, হিংসা-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে। সে নিজের জীবনের মধু নিজে আস্বাদন করতে পারে। তাই বেশি করে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ বই মানুষের সার্বক্ষণিক এবং শ্রেষ্ঠ সঙ্গী।’
ডিজিটাল যুগে ইলেকট্রনিক গেজেটের পাঠাভ্যাসকে ছাড়িয়ে এখনো কাগজের পুস্তকই মানুষের প্রধান অগ্রাধিকার। পাঠাভ্যাসের সেই অগ্রাধিকারকে সমুন্নত রাখতে সরকার সুলিখিত পাণ্ডুলিপির ওপর বিশেষ প্রণোদনা দিতে পারে। বেশি সংখ্যক চিন্তাশীল লেখক ও প্রকাশককে পুরস্কৃত করে উৎসাহ দিতে পারে। হকার, ভিক্ষুক, ধুলোবালিমুক্ত সবুজ পরিবেশে বইমেলার আয়োজন করতে পারে। তাহলে লেখক পাঠকের যূথবদ্ধতায় মহত্তম জ্ঞানরাশির পুস্তকসম্ভার টিকে গিয়ে মিথ্যা ও অপলাপ আপনি অপসৃয়মাণ হতে পারে। সহমত বা বিরুদ্ধ মত আমরা সকল স্বাধীন মতকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে মননশীল বহুবিচিত্র বইয়ের ওপর নিজেদের আস্থা ধরে রাখতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো এক সুলেখক তাঁর ‘সাবলাইম’ রচনাকর্মের মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানচক্ষু নিশ্চিতই উন্মীলন করে যাবেন। যার লেখনী সত্যিকার অর্থেই বাঙালির মননশীলতা বিনির্মাণের বাতিঘর হয়ে উঠবে। ইরানের জীবনবাদী কবি ওমর খৈয়াম বইকে প্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করে যথার্থ বলেছেন :
রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে
কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা
যদি তেমন বই হয়!
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন।

ফারদিন ফেরদৌস