সংবাদ বিশ্লেষণ
বেআইনিভাবে বাড়ানো হয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম
সরকার একদম বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। একটি তামাদি হয়ে যাওয়া গণশুনানির ওপর ভিত্তি করে এই দাম বাড়ানোয় এ-সংক্রান্ত আইনেরও বরখেলাপ হয়েছে। আইনের বেশ কয়েকটি বিষয়কে অবজ্ঞা করে এবং অযৌক্তিকভাবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সরকারের চাপে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে।
বিইআরসি সংক্রান্ত আইন ও বিধিমতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির (তেল, গ্যাস) দাম বাড়াতে হলে গণশুনানি করতে হয়। গণশুনানি শেষে ৯০ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে আদেশ দেবে কমিশন। সেই ৯০ দিন বহু আগেই পার হয়ে গেছে। কমিশন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নিয়ে গণশুনানি শেষ করেছে ছয় মাস আগে।
৯০ দিন পার হওয়ায় এ গণশুনানির আর কোনো বৈধতা নেই। এটি তামাদি হয়ে গেছে। যদি আইন মেনে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হয়, তাহলে কমিশনকে নতুন করে গণশুনানি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠাতে হবে।
আবার বিইআরসির আইন ও বিধিমতে, যদি কোনো কম্পানি বা প্রতিষ্ঠান লাভে থাকে বা মুনাফা করে তাহলে ওই প্রতিষ্ঠান দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারবে না। এ বিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে বিইআরসি। কারণ বাংলাদেশের সব গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠান এই মুহূর্তে লাভে রয়েছে। তারা বছরে তাদের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের একাধিক প্রফিট বোনাসও দিয়ে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব কমিশনে খারিজ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। শুনানিকালেই এ প্রস্তাবকে অবৈধ আখ্যা বা অগ্রহণযোগ্য প্রস্তাব আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দিতে পারত, কমিশন তা দেয়নি। তবে শুনানিকালে এ প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। তখন কমিশন দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা দেখেনি বলেও মন্তব্য করেছে। কিন্তু ছয় মাস পরে এসে ঠিকই কমিশন গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। এটি প্রতারণা।
গণশুনানিকালে সংশ্লিষ্ট বিটের প্রতিবেদক হিসেবে আমি উপস্থিত ছিলাম। বেশির ভাগ প্রস্তাবের ব্যাপারে কমিশন তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে তখন বলেছিল, দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ভুতুড়ে পরিকল্পনা ধরে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পিডিবির
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সব সময় আগাম পরিকল্পনার কথা বলে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করে এবং কমিশন এই ভুতুড়ে কল্পিত পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে সায় দিয়ে থাকে। এবারও যখন পিডিবি তাদের এ রকম ভুতুড়ে পরিকল্পনা হাজির করে, তখন গণশুনানিতে উপস্থিত ভোক্তাদের পক্ষে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম এর খুঁটিনাটি দুর্বলতা ধরে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করার পর পিডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এর একটি হলো ‘প্লান্ট ফ্যাক্টর’।
পিডিবির দাবি, তারা ৮০ শতাংশের ওপরে প্লান্ট ফ্যাক্টরে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাবে। এ জন্য জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেশি হবে। আর ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের মূল্য যদি বৃদ্ধি পায়, তাহলে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বেশি পড়বে, এতে লোকসানও বেড়ে যাবে। লোকসান ঠেকাতে দাম বাড়াতে হবে।
লক্ষ করুন পাঠক, সব কিন্তু ‘যদি’-এর ওপর নির্ভরশীল। কারণ এর আগেও যখন পিডিবি বলেছিল তারা আশি ভাগের ওপর প্লান্ট ফ্যাক্টরে কেন্দ্র চালাবে, এ কারণে খরচ বেড়ে যাবে। কিন্তু পিডিবি কখনোই ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে কেন্দ্র চালাতে সক্ষম হয়নি। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ৮০ শতাংশ সময় উৎপাদনে (অপারেশনে) রাখতে পারেনি। এবারও প্লান্ট ফ্যাক্টর বা উৎপাদন সময় ৮০ শতাংশ পূরণ হবে না। কিন্তু বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় বলা হলো, বেশি সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে টাকা বেশি লাগবে, সে কারণে গ্রাহকেরও টাকা বেশি দিতে হবে। এ যেন হীরক রাজার দেশ!
দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গড়ে ৪০ শতাংশ জ্বালানি তেলনির্ভর। সঙ্গত কারণে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বেশি। যদি বেশি সময় জ্বালানি তেলভিত্তিক (প্লান্ট ফ্যাক্টর) চালু থাকে, তাহলে খরচ বেশি পড়ে যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। কিন্তু গত এক বছরে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলার থেকে নেমে এখন ৪০ ডলারের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। যদি জ্বালানি তেলের দাম ৬০ ভাগ কমে যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও ৬০ ভাগ কম হয়েছে, হিসাব সোজা। সরকারের উচিত ছিল বিদ্যুতের দাম কমানো। তা না করে সরকার উল্টো বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।
সরকার সব সময় বলে, বিদ্যুৎ খাতে তারা ভুর্তকি দিয়ে থাকে। এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। ভর্তুকি হলো, যা দেওয়া হয় বিনা শর্তে। ফেরত পাবে না। কিন্তু পিডিবি যে অর্থ সরকারের কাছে কথিত ভর্তুকি হিসেবে নেয়, প্রকৃত অর্থে তা নেয় ঋণ আকারে। আর এই ঋণ ৩ শতাংশ সুদে পিডিবিকে শোধও করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার জনগণের সঙ্গে আসলে বড় রকম প্রতারণা করে ভর্তুকির মতো একটি বিষয়কে সামনে রেখে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর নেপথ্যে
গত বুধবার জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহীর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয় একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে দাম বাড়ানোর ব্যাপারে প্রস্তাব করা হয়। সেই প্রস্তাবটি কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আর কমিশন সেটি গ্রহণ করেছে। আর মাঝ খান থেকে গণশুনানি, জনগণের কথা শোনা এগুলো নাটক।
জনগণের টাকায় আবার একটি তহবিল!
এর আগে যখন গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, তখন সরকার একটি গ্যাস উন্নয়ন তহবিল করেছিল। এই তহবিল নিয়ে দুর্নীতি ও লুটপাটের শেষ নেই। কোনো গ্যাস উন্নয়ন ও জনগণের পক্ষে সেই তহবিল কাজ করেনি। এবারও গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে যে মুনাফা করা হবে তা দিয়ে একটি তহবিল করবে সরকার। আর লাভটা কত হবে জানেন?
কমিশনের হিসাবমতে, বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বছরে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হবে চার হাজার ১২১ কোটি টাকা। গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্ধিত লাভের টাকায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণাঙ্গ আদেশে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা দেবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার সংস্থান হবে এখান থেকে। এতে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হিসাবে গ্যাস খাতে বছরে বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে তিন হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। আর বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭১৬ কোটি টাকা।
এর মধ্যে জনগণ নেই। এ হলো জনগণের নামে পকেট কেটে তহবিল গড়ে সেই তহবিলের দুর্নীতির টাকায় আমলা ও স্বার্থবাদীদের রাজপ্রাসাদ গড়া।
লেখক : সাংবাদিক

আরিফুজ্জামান তুহিন