শাবিপ্রবিতে শিক্ষক লাঞ্ছনা
অপরাধীরা কি অপ্রতিরোধ্যই থেকে যাবে?
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ এই ঘটনার পর উল্টো শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে। শাহজালাল বিশ্ববিদালয়ের অধ্যাপক জনপ্রিয়, কথা সাহিত্যিক জাফর ইকবাল এই ঘটনার প্রতিবাদে বৃষ্টিতে ভিজেছেন। তিনি জীবনেও এ রকম ঘটনা দেখননি বলে উল্লেখ করেছেন। উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুল হক ভুইয়ার অপসারণের দাবিতে শিক্ষকদের একটি অংশ কয়েক মাস ধরে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের কর্মসূচি পণ্ড করার কাজে ছাত্রলীগ কেন? আর ছাত্রলীগ যখন এসে উপাচার্যের পক্ষ নিয়ে শিক্ষকদের লাথি মারেন তখন বুঝতে বাকি থাকে না এ কাজে উপাচার্যের মদদ কতখানি। জাফর ইকবাল স্যার প্রতিবাদে-লজ্জায়-অপমানে ‘মরে যাওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে এই ঘটনা কোনো বৃক্ষ নয়। এই ঘটনা হচ্ছে ফল। দর্শনশাস্ত্রে কার্যকারণ সূত্র বলে একটি সূত্র আছে। এর বাখ্যা হচ্ছে জগতে এমন কোনো ঘটনাই ঘটে না, যার নেপথ্যে উপযুক্ত কারণ থাকে না। তাহলে ফল যদি বিষাক্ত হয় তাহলে সেই ফল উৎপাদনে প্রতিষেধক অপিরহার্য। এই ফলের বৃক্ষ কারা রোপণ করেছে, কারা জল সিঞ্চনে বড় করে তুলেছে সেই সন্ধান করা খুবই জরুরি। তা না হলে যেসব কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটছে তা ঘটতেই থাকবে।
শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার ঘটনা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথমবারের ঘটেছে, তা নয়। এই ঘটনা এখন নিত্য দিনের ব্যাপার। রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়, কুষ্টিয়া ইমলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই এ রকম অতীত আছে। এই ঘটনাকে ছাত্রলীগের না বলে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ছাত্র সংগঠনের বললে সব সময়ের বাস্তবতাই বোঝা যায়। অতীতে ছাত্রদল, ছাত্র শিবির- সবাই এ পথেই হেঁটেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনগুলো কখন তার নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দেয়, তার একটি দারুণ বর্ণনা আছে জাফর ইকবাল স্যারের ‘মোহব্বত আলীর একদিন’ নামক রম্য উপন্যাসে। সেই উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র সংগঠনকে একজন উপাচার্য কীভাবে ব্যবহার করেন, তল্পিবাহক শিক্ষকরা নীতির পরিবর্তে অসৎ ব্যক্তি উপাচার্যের আনুগত্যে চলেন। কীভাবে একটি নিয়োগে উপাচার্য সব আদর্শের পরিবর্তে, ক্ষমতায় থাকার জন্য যাকে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন তাকেই নিয়োগ দেন। এই বিষয়গুলো সেই উপন্যাসে প্রতিফলিত।
রাজনীতির মধ্যে যদি ব্যাধি থাকে তাহলে সেটা সমাজের সর্বত্রই সংক্রমিত হবে। ছাত্রদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের নেপথ্যে দেখা যাবে সরকারের কিছু ভুল কৌশলই দায়ী। অতিমাত্রায় দলীয় তোষণনীতির মধ্যে থাকা অধ্যাপকদের সরকার উপাচার্যের দায়িত্ব দেন। তিনি যখন দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে উপাচার্য হন তখন তিনি দলের কাজ করতে ব্যস্ত থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো দায়িত্ব বণ্টনে তখন তিনি যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দলীয় আনুগত্যকে পারিমাপ করেন যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যিনি উপাচার্যের অন্ধ আনুগত্য করতে পারেন তারাই হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাধর। যেহেতু বেশির ভাগ উপাচার্য যোগত্যার মানদণ্ডে আসীন হন না এবং ন্যায় কাজ করেন না সেহেতু তাঁর প্রয়োজন হয় কিছু অনুসারী শিক্ষার্থী। যাদের মাধ্যমে উপাচার্য পেশিশক্তি খাটিয়ে স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন।
শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তারা ঔদ্ধত্যকে বাসা থেকে বহন করে নিয়ে আসেন না। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের প্রতি আনুগত্যবোধ নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখেন। কিন্তু দিনের পর দিন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ অনেকেই শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন- তখনই পরিণতিতে শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়।
কয়েকদিন আগে সিলেটের এক সাংসদ জাফর ইকবাল স্যার সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন। এর কোনো প্রতিকার হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে স্থানীয় সাংসদ-নেতা তাঁর কার্যালয়ে এসে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কোথাও কোনো বিচার হয়নি। ছাত্ররা যাদের অনুসারী তাদের পথেই হাঁটবেন, এটাই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সেসব সাংসদের বিরুদ্ধে কোনো কথা না বলে, নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে এসব অপরাধীচক্র ডালপালা ছড়াতে থাকবে। এসবের বিরুদ্ধে খুব কম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আর যদি উপাচার্য নিজেই ছাত্রদের নিজের কাজে ব্যবহার করেন তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল যে কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে তার বিচারও হয়তো হবে না। বরং উল্টো যেসব শিক্ষক প্রতিবাদ করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধেই হয়তো খড়গ উঠবে। আর যদি বিচার হয় সেটা নিঃসন্দেহে অনেক ভালো দৃষ্টান্ত হবে। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংগঠনগুলোর সুষ্ঠু বিকাশের পথ রচনা করতে হয় তাহলে প্রথমেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের হাত থেকে নিয়োগক্ষমতা তুলে দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে এক রকম বিষাক্ত মধু আছে। এই মধুর প্রতি অনেকেরই আসক্তি রয়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হয় সেই নির্দেশনা সরকারের পক্ষ থেকে থাকা উচিত। একজন ছাত্রলীগকর্মী শিক্ষক লাঞ্ছিত করলে সারা দেশের ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, একজন উপাচার্য ছাত্রলীগকে দিয়ে শিক্ষককে লাথি দেওয়ালে সারা দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সম্মানহানি হয়। এই গর্হিত কাজের প্রতিকার করতে না পারলে তা সরকারের জন্য ব্যর্থতার বিষয়। সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটুকু ওই ক্যাম্পাসে আর আবদ্ধ নেই। তা হয়ে উঠেছে সারা দেশের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাজের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমরা চাই সরকার এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- যাতে জাফর ইকবাল স্যারের বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করবে, মরে যেতে নয়। কারণ তার বেঁচে থাকতে চাওয়ার মধ্যে জাতির কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

ড. তুহিন ওয়াদুদ