তৃতীয় বর্ষে বৃত্ত
‘হ্যাপি ট্রাভেলিং, বি ট্রাভেলার’
পৃথিবী গোল, তাই সবার সঙ্গে দেখা হবেই—এমন বিশ্বাস নিয়ে ২০১৬ সালের ১২ আগস্ট শুরু হয় ভ্রমণবিষয়ক সংগঠন ‘বৃত্ত’। ডা. জিয়ন, শাওন, আসলাম ও জুবায়রা—এই চারজন মিলে শুরু হয় ‘বৃত্তে’র কার্যক্রম। সঙ্গে আছেন জয়, ইতি, সাইমুন, ইমরান, সাব্বির ও সৌরভের মতো সুদক্ষ সহযোগী।
রূপের রানি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে হাজারো সৌন্দর্য, যার কিছুটা আবিষ্কৃত, কিন্তু বেশির ভাগটাই লুকায়িত। প্রতিনিয়ত তাই এই সৌন্দর্যের পেছনে ছুটে চলেছি আমরা ট্রাভেলার এবং ট্যুরিস্টরা । কখনো মেঘ ছুঁতে বান্দরবানের সুউচ্চ কোনো পাহাড়ে অথবা রাঙামাটির মেঘের রাজ্য ‘সাজেক’-এ, কখনো বা গা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে থাকতে পাহাড়ের গহিন কোনো ঝিরি পথে। কখনো বৈঠা বাইতে সোয়াম্প ফরেস্ট ‘রাতারগুল’, কখনো পেয়ারাবাজার ঘুরে দেখতে ‘স্বরূপকাঠি’। ‘বাঘ’ মামার সঙ্গে দেখা করতে ‘সুন্দরবন’ও যাই, আবার শীতের অতিথি পাখি দেখতে আর পূর্ণিমা উপভোগ করতে যাই ‘হাওর’-এ। কখনো দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি দেখতে যাই ‘সেন্টমার্টিন’, আবার কখনো শুধু গোসল করব বলে যাই কোনো ঝর্ণায়। মশালের আলোয় তাঁবু পেতে কোনো ঝর্ণার পাশে শুয়ে থেকে কাটিয়ে দিই পুরো একটি রাত, আবার সারা রাত জেগে থেকে অপেক্ষা করি পাহাড়ের ভোর হওয়ার দেখার প্রতীক্ষায়।

‘বৃত্ত’ নামটি পছন্দ করার পেছনে আমাদের বেশ কিছু লজিক কাজ করেছে। কোথাও না কোথাও ঘুরতে গিয়ে নিজেদের পরিচিত অনেকের সঙ্গেই আমাদের দেখা হয়ে গিয়েছে, এমনটা হরহামেশাই ঘটেছে আমাদের প্রায় সবার ভ্রমণ জীবনে। তার মানে আমরা ‘ট্রাভেলিং ও ট্যুরিজম’কে কেন্দ্র করে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি, যা এমনিতেই একটি বলয় তৈরি করছে আমাদের জীবনে। দেখা গেল হয়তো কোনো পাহাড়ি ট্রেইলে হাঁটছেন, হঠাৎ করে আপনার নাম ধরে কেউ একজন ডেকে উঠল; কাছে এসে জড়িয়ে ধরল বুকে। নৌকার সামনে গলুইয়ের ওপরে বসে রাতারগুল/ স্বরূপকাঠি কিংবা কোনো লঞ্চের ছাদে করে চাঁদপুর/ সুন্দরবন ঘুরছেন; দেখলেন যে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্য কোনো নৌকা/ লঞ্চের থেকে আপনার পরিচিত কোনো মুখ আপনার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে, হাত নাড়ছে। এগুলো সবকিছুই ভ্রমণের আনন্দ, ভ্রমণপিপাসু মানুষগুলোর সুন্দর মনের পরিচায়ক।
বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক ঘোরাঘুরি করছেন, দেশে-বিদেশে সর্বত্র। কিন্তু অনেকেই প্রোপার প্ল্যানিংয়ের অভাবে আসল মজাটা নিতে পারছেন না। তাই আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, প্রকৃতিকে একটু ভিন্নভাবে উপভোগ করার সুযোগ সবাইকে করে দেওয়ার। গত দুই বছরে আমরা প্রায় ৭০টির মতো ট্যুর পরিচালনা করেছি দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে। তেঁতুলিয়া থেকে সেন্টমার্টিন, সিলেট থেকে বান্দরবান—চেষ্টা করেছি দেশের লুকায়িত ও দৃশ্যমান সৌন্দর্যগুলো সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে। শুধু দেশেই নয়, বিদেশের মাটিতে, যেমন : ভুটান, মেঘালয়, নেপাল, দার্জিলিংয়ের মতো জনপ্রিয় স্পটে ট্যুর পরিচালনা করেছে বৃত্ত।

বৃত্ত ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ছাড়াও আমাদের রয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট, যা মোহাম্মদপুর আদাবর থানার পাশে বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটিতে অবস্থিত; নাম ‘ক্যাফে বৃত্ত’। আর রয়েছে মেঘের রাজ্য সাজেকে নিজস্ব রিসোর্ট ‘মেঘপুঞ্জি’। ইচ্ছা আছে ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতে দেশের আরো বেশ কিছু জায়গায় ইকো রিসোর্ট করার।
আমরা ঘুরব সবাইকে সঙ্গে নিয়ে, কিন্তু অবশ্যই প্রকৃতিকে নষ্ট করে নয়। ‘Leave No Trace Behind’—এই তত্ত্বে বিশ্বাস করি আমরা। এই প্রকৃতিকে বাঁচতে দিলে, পরিবেশটাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও দেখাতে পারব।
প্রোপার ম্যানেজমেন্টের স্বার্থে, আমাদের প্রতিটি ট্যুরকে সফল করতে আমরা committed & dedicated, যার ফলাফল বর্তমানে আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মেম্বার প্রায় ৩৫ হাজার এবং পেজ ফলোয়ার প্রায় ৬০ হাজারের কাছাকাছি। বর্তমানে ডা. জিয়ন, শাওন, জয়, ইতি, সাইমুন, রানা ও রবিন—এই সাতজনের সমন্বয়ে আমরা বিভিন্ন জায়গায় আমাদের ট্যুরগুলো পরিচালনা করছি। এ ছাড়া অতনু, মাসুদ, বিপু, সাব্বির, ইমরান, রিদওয়ান, মাহমুদ, হারুন, রাসেল, সোহেল ভাই, মৌ, এমি, নাদিয়া, শাম্মি আপুদের মতন অগণিত গুণগ্রাহী, যাঁদের কারণে আমরা আরো অনুপ্রেরণা পাই ভালো ট্যুর করার।

শুধু ট্যুরের মাঝেই বৃত্ত নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, মানবিক কার্যক্রম, যেমন : বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ ও ওষুধ বিতরণ, পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহয্য করা; এসব কাজে বৃত্ত নিজেদের সংযুক্ত করেছে শুরু থেকেই।
আমরা কোনো অলাভজনক গ্রুপ বা সংগঠন নই। আমাদের লাভ হলো সকলের সন্তুষ্টি এবং মুখের হাসি। আমরা-আপনারা নিয়েই কিন্তু ‘বৃত্ত’... ঘুরব আমরা বৃত্তে থেকেই; কিন্তু সীমানা থাকবে বৃত্তেরও বাইরে।
হ্যাপি ট্রাভেলিং... বি ট্রাভেলার।
লেখক : বৃত্ত ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

ডা. মাজহারুল জিয়ন