ইউপি নির্বাচন
দীর্ঘ মৃত্যুর মিছিলের দায় কার?
‘আমার বাবা তো কোনো রাজনীতি করত না। রিকশা চালিয়ে সংসার চালাত। ওরা আমার বাবাকে কুপিয়ে খুন করল কেন? এখন আমার মা সংসার চালাবে কেমন করে?’ চট্টগ্রামের পটিয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত রিকশাচালক মোহাম্মদ হোসেনের (৬০) বড় মেয়ে লাকী আক্তারের আহাজারি। (প্রথম আলো, ২৯ মে প্রথম পাতায় প্রকাশিত প্রতিবেদন : ‘এখন আমার মা সংসার চালাবে কেমন করে?’)।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হোসেনের নিথর দেহের সামনে বিলাপ করতে থাকেন স্ত্রী সাজু বেগম ও অপর মেয়ে মিনু আক্তার। কিন্তু স্বজনের মৃত্যুর এ নৃশংসতার কোনো সান্ত্বনা তাঁরা পাননি।
২৮ মে, শনিবার দুপুরে ১২টার দিকে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ফকিরনিরহাট এলাকায় আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী দিদারুল আলম ও বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মান্নান খানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ভোট দিতে আসা মোহাম্মদ হোসেন দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়েন। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি দৌড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলে দুর্বৃত্তরা তাঁর পেটে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
এভাবে নির্বাচনী সহিংসতায় মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, এদের অধিকাংশই সরাসরি কোনো রাজনীতি অথবা প্রার্থীর সমর্থকের পর্যায়ে পড়ে না। কোনো লাভালাভের প্রশ্নও জড়িত নেই এদের সঙ্গে। তারা শুধু শুধুই বলি হচ্ছে একের পর এক। তাদের খবর কেউ রাখে না। দায় নিতে চায় না কেউ। আর এতে কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়তে হয় একেকটি পরিবারকে। কারণ একেকজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতি তাঁর জন্য যে চরম আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি বয়ে আনে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারো উপলব্ধিতে অত বড় করে বাজবে না।
আমাদের দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এ ধরনের সংঘাতের ঘটনা নতুন নয়। বলা যায়, এটা আধিপত্য বিস্তারের একটা রেওয়াজ হয়ে আসছে। কিন্তু সেই প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যাদের স্বাভাবিক অস্তিত্বের জন্য দিন-রাত অমানবিক শ্রম ঝরিয়ে যেতে হয়। আর সেসব নির্দোষ মানুষকেই এভাবে অন্যের অন্যায়ের বলি হতে হয়। কোনো প্রতিকার মিলছে না এর।
জানা গেছে, ২৮ মে শনিবার অনুষ্ঠিত পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং একজন মেম্বার প্রার্থীসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় একজন, চট্টগ্রামের পটিয়ায় তিনজন, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে চারজন, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে দুজন, পঞ্চগড়ে একজন এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে একজন। এ নিয়ে পাঁচ ধাপে ১১৫ জনের প্রাণহানি হয়েছে। যা ইউপি নির্বাচনে নিহতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৯ মে, প্রথম পাতা, ‘ ইউপি নির্বাচন : পঞ্চম ধাপ সংঘর্ষ গুলি : দুই প্রার্থীসহ প্রাণ গেল ১২ জনের’)
গত শনিবার নির্বাচনী সহিংসতায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার রাজগঞ্জ ইউনিয়নের রাজগঞ্জ মাদ্রাসা কেন্দ্রের বাইরে মারা যান একজন সাধারণ মানুষ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধাওয়া করলে দৌড়ে পালানোর সৈয়দ আহমেদ (৬৫) দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে মাথায় আঘাত পান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় কিশোর মো. শাকিল (১৬)।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর জয়ী ও পরাজিত দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলাকালে পদপৃষ্ট হয়ে মারা যান সিদ্দিকুর রহমান (৬৫)। (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক, ২৯ মে)
পঞ্চগড় সদর উপজেলার গরিনাবাড়ী ইউনিয়নের জোতদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে বিজয়ী ইউপি সদস্য তরিকুল ইসলাম ও তাঁর পরাজিত প্রতিপক্ষ আনোয়ার হোসেনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নাসির উদ্দীন (৫০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। (সূত্র : প্রথম আলো, ২৯ মে, প্রথম পাতা, সহিংসতায় নিহত আরো ১০)।
শনিবার পঞ্চম ধাপে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭১৭টি ইউনিয়নে ছয় হাজার ৮৮৪টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়েছে। তবে বেশির ভাগ এলাকায় কমবেশি কেন্দ্র দখল, গোলাগুলি ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহারে সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন আর প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনায় এটা এখন প্রকাশ্য দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। এখানে কোনো কিছু আর ঢেকে রাখার অবকাশ নেই। এসব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতামতে।
‘আগের চার ধাপের তুলনায় শনিবার পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের মাঠ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা এই মতো দিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে কমিশন ১২০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বাতিল করেছে। যাতে সিংহভাগ ভূমিকা রেখেছেন কমিশন সচিবালয়ের নিজস্ব মাঠ কর্মকর্তা।’ (প্রথম আলো, ২৯ মে, প্রথম পাতা : ‘খেই হারিয়ে ফেলেছে ইসি’)
কিন্তু এসব অঘটন নিয়ন্ত্রণ এবং মৃত্যুর ঘটনা রোধে যাঁর অভিভাবকত্ব জরুরি মনে হয়েছে সবার কাছে সেই নির্বাচন কমিশনারের দায়সারা বক্তব্য হতাশ করে প্রচণ্ডভাবে।
শনিবার ভোট শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সাংবাদিকদের বলেন, ‘বেশ কিছু জায়গায় হানাহানির ঘটনা ঘটেছে। সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে সহিংসতায় কয়েকজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে একটি কেন্দ্র ছাড়া আর কোথাও আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটেনি।’
সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে কাজী রকিবউদ্দীন বলেন, ‘সারা দেশেই সহিংসতার আবহ বিদ্যমান। জমিজমা নিয়েও সহিংসতা করছে মানুষ। নির্বাচন নিয়েও হচ্ছে। প্রার্থীদের অনেকেই অন্যের মাথায় লাঠি মেরে জিততে চান। এই মানসিকতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। (প্রথম আলো, ২৯ মে, ‘খেই হারিয়ে ফেলেছে ইসি’)
তৃণমূল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে এভাবে সহিংসতা এবং সাধারণের মানুষের প্রাণহানি আমাদের বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে। গুটিকতক মানুষের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অকারণে প্রাণহানি ঘটছে নানাভাবে। কিন্তু তার দায়ভার নিতে চায় না কেউ। কোনো ক্ষতিপূরণের ভাগ পায় না এরা। নির্বাচনে জয়ী বা পরাজিতরাও নিতে চান না এদের দায়ভার। এদের জীবনের মূল্য নেই কারো কাছে। আমরা যেমন চাই সব ধরনের নির্বাচনী সহিংসতা বন্ধ হোক, তেমনি চাই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা। আর সেই সঙ্গে প্রত্যাশা থাকবে, মানবিকতার দায়ে কেউ যেন এসব স্বজনহারার পাশে দাঁড়ান, তাদের জীবনের অবলম্বন হয়ে।
লেখক : সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বকোণ।

নিজাম সিদ্দিকী