অভিমত
আইএসকে নির্মূলে সামরিক কৌশল কেমন হবে?
এ কথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে ইসলামিক স্টেট বা আইএস একটি গ্লোবাল বা ভূমণ্ডলীয় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ইরাক কিংবা সিরিয়ায় এই হুমকি সীমাবদ্ধ থাকলেই হয়তো চলত, কিন্তু এই জুলাই ২০১৬ সালে পরপর তিনটি সংঘাত এবং সংঘাতের পরপরই আইএসের রেফারেন্স দেওয়া আমাদের মতো একটি ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল দেশকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এটা অনেকটা গায়ে পড়ে ঝগড়া করার মতো। আইএস কিন্তু আমাদের সৃষ্টি নয়, আইএস পশ্চিমাদের সৃষ্ট একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। পশ্চিমারা প্রত্যক্ষভাবে এই সন্ত্রাসী সংগঠনের উদ্যোক্তা না হলেও পরোক্ষভাবে তারা এটা সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয় গালফ ওয়ারের সময় ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর, সাদ্দাম হোসেন মার্কিন বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। সেই থেকে সাদ্দাম বাহিনীর সৈন্যরা গেরিলা রণকৌশল অবলম্বন করেন। তাঁরাই আসলে মার্কিন বাহিনীর অগোচরে সংগঠিত হয়ে ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে আল-কায়েদা ইন ইরাক নামে যাত্রা শুরু করেন। তারপর ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে আইএস নাম ধারণ করে। তারপর ২০১৪ সালে এসে দুনিয়াব্যাপী সুন্নি খলিফার রাজত্ব ঘোষণা করে। আইএস খোদ ২০১৪ সালে তিন দফা ইউরোপিয়ান ও মার্কিন নাগরিক ও সাংবাদিককে হত্যা করে পশ্চিমা বিশ্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। শুধু তাই নয়, আইএস প্রধান আবু বকর আল–বাগদাদি দুনিয়ার মুসলিমদের এই জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। সেই থেকে পশ্চিমা বিশ্ব এমনকি অত্র অঞ্চল থেকেও অনেকে পালিয়ে গিয়ে তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মার্চ ২০১৫ সালে দায়ের করা একটি প্রতিবেদন মতে, ১০০ দেশ থেকে প্রায় ২২ হাজার বিদেশি যোদ্ধা সিরিয়া ও ইরাকে ভ্রমণ করেছেন, যাঁরা অধিকাংশই আইএসআইর সমর্থক। আইএসের বর্তমান সৈন্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখের মতো, যার মধ্যে বিদেশি সৈন্য সংখ্যা প্রায় ত্রিশ হাজার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশ থেকে প্রায় চার হাজার লোক আইএস- এ যোগ দিয়েছে। সুতরাং এটা এখন আর আঞ্চলিক কোনো সমস্যা নয়, এটা একটা গ্লোবাল সমস্যা।
ইসলামিক স্টেট (আইএস) নামধারী জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য সহযোগী দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আইএসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিরিয়ার রাকা ও ইরাকের মসুলে জঙ্গিগোষ্ঠীটিকে কোণঠাসা করে ফেলা হবে। আইএসকে প্রতিহত করার পর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো পুনর্গঠন নিয়েও কথা হয় দেশগুলোর সঙ্গে। গত কয়েক মাসের আক্রমণে জঙ্গি গোষ্ঠীটি তাদের অধিকারে থাকা বিশাল অঞ্চল হারিয়েছে। কিন্তু এখনো সিরিয়া ও ইরাকে তাদের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। এদিকে ফালুজা দখলে নেওয়ার পর ইরাকি বাহিনী বর্তমানে আইএসকে মসুল থেকে হটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মসুল ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং আইএস শক্ত ঘাঁটি।
প্রশ্ন আসে আইএস কী করে এত ধনী সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হলো? মূলত আইএসের ফান্ড আসে চাঁদাবাজি, ব্যাংক লুট, ডাকাতি, চোরাচালানি কিংবা ডোনারদের কাছ থেকে সাহায্য। তাদের টপ এবং মিডিয়াম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সংখ্যা প্রায় এক হাজারের মতো। তারা মাসিক ৩০০ মার্কিন ডলার থেকে দুই হাজার মার্কিন ডলার বেতন পেয়ে থাকে। কথিত আছে তাদের ফান্ড আসে মধ্যপ্রাচ্যের ধনীদের কাছ থেকে, আর আসে জিম্মিদের কাছ থেকে মুক্তিপণের টাকা। যুদ্ধের লুটের মাল হলো আরেকটি উৎস। সবচেয়ে লোভনীয় উৎস হলো দখলকৃত তেলক্ষেত্র, যা থেকে দৈনিক দুই মিলিয়ন মার্কিন দলের আয় হয়। খোদ ২০০৪ সালে এই এস মসুল সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ টাকা এবং স্বর্ণ লুট করেছে।
এবার আসা যাক ক্ষয়ক্ষতির কথায়। আইএসের আক্রমণে এ পর্যন্ত প্রায় ৫,৫৭০ জন বেসামরিক লোক মৃত্যুবরণ করেছে, আহত হয়েছে বারো হাজারের মতো। প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের দেশ তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। ২০১৪ সালে উত্তর ইরাকে বসবাসরত ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ৫০০ লোককে হত্যা করেছে। আইএস তাদের মেয়েদের ক্রীতদাস বানিয়ে যৌনদাসি হিসেবে বিক্রি করেছে।
এবার দেখা যাক আইএস কতটা শক্তিশালী। আইএসের অস্ত্রভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ। তাদের এসব অস্ত্র ইরাকি ও সিরিয়া সেনাবাহিনী থেকে লুট করা। তাদের রয়েছে মিগ ২১, ২৩ যুদ্ধবিমান, রয়েছে টি৬২ ও টি৫৫ ট্যাংক, এপিসি, আর্টিলারি গান, বিমান ও ট্যাংকবিধ্বংসী মিসাইল, মেশিন গান, স্নাইপার রাইফেল এবং এম১৬ রাইফেল। প্রায় সব দেশের অস্ত্রই তাদের কাছে আছে। ইরান-ইরাক ও গালফ যুদ্ধে ব্যবহৃত জার্মান, মার্কিন ও যুগোস্লাভিয়ার অস্ত্র।
আইএস বর্তমানে সিরিয়া ও ইরাক এই উভয় রাষ্ট্রের উত্তরাংশে অবস্থান করছে। সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমের শহর আলেপ্পো থেকে ইরাকের পূর্বের শহর খালিস পর্যন্ত তারা বিস্তৃত। তবে আইএস মূলত শক্ত অবস্থানে রয়েছে সিরিয়ার উত্তরের শহর রাকায়, যা আইএসের রাজধানী হিসেবে খ্যাত। আর রয়েছে ইরাকের উত্তরের মসুলে। আইএসকে নির্মূল করতে হলে এই দুই শহরেই প্রথমে আক্রমণ পরিচালনা করতে হবে।
বর্তমানে আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য সর্বমোট চারটি কোয়ালিশন হয়েছে। এগুলো হলো (১) যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে কোয়ালিশন যেখানে রয়েছে ৮টি দেশ (২) ফ্রান্সের নেতৃত্বে কোয়ালিশন যেখানে রয়েছে ১৭টি দেশ, (৩) রাশিয়ার নেতৃত্বে কোয়ালিশন যেখানে রয়েছে ৪টি দেশ এবং (৪) ইসলামিক স্টেট কোয়ালিশন, যেখানে রয়েছে ৩৪টি দেশ, যার প্রথমেই আছে বাংলাদেশের নাম।
২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকেই আইএসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশ তাদের তৎপরতা শুরু করেছিল। তম্মধ্যে একেবারে পুরোভাগে রয়েছে ইরান, যেটি ২০১৫ সালের শুরুতেই আইএস এলাকায় ড্রোনসহ যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছিল। ইরানের পর এ তৎপরতায় আসে হেজবুল্লাহ। তারা ইরাকে আইএসবিরোধী প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা পাঠিয়েছিল। তারপর আসে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ১৪ জাতি সম্বলিত কোয়ালিশন, যারা আইএসের বিরোধে আকাশযুদ্ধ শুরু করে। ২০১৫ সালের দিকে আসে রাশিয়ার নেতৃত্বে গঠিত কোয়ালিশন, তারপর ফ্রান্স ও ইসলামিক রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত কোয়ালিশন। তারা এখন একযোগে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আইএস নির্মূলে দুটি উপায় অবলম্বন জরুরি। এর একটি হতে পারে গ্রাউন্ড অফেন্সিভ বা স্থল আক্রমণ আর অন্যটি হতে পারে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। স্থল আক্রমণে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কর্তৃক প্রণীত ‘হাতুড়ি ও নেহাই রণকৌশল’ বা ‘হামার অ্যান্ড এনভিল মেথড’ অবলম্বন করা যেতে পারে। ‘হাতুড়ি ও নেহাই’ একটি ক্লাসিক সামরিক যুদ্ধকৌশল যা সংগঠিত যুদ্ধবিগ্রহের শুরু থেকে ব্যবহার করা হয়েছে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং রোমান জেনারেল থেকে ভিয়েতনাম যুদ্ধেও এ যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করা হয়েছেI এ পদ্ধতিতে পদাতিক সৈন্য দ্বারা ফ্রন্টাল এসল্ট বা সম্মুখ আক্রমণ করা হয় এবং পাশাপাশি ট্যাংক বাহিনী দিয়ে শত্রুর চারপাশে আক্রমণ করা হয়। এটাকে অভিহিত করা হয় হ্যামার বা হাতুড়ি হিসেবে। অন্যদিকে শত্রুর পেছনে থাকে নিজস্ব পদাতিক বাহিনীর শক্ত লাইন, যা এনভিল বা নেহাই হিসাবে কাজ করে। এখন প্রথম কাজ হবে হেমার পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে সিরিয়ার আর-রাকা এবং ইরাকের মসুল আক্রমণ করে সিরিয়ার উত্তরের দেশ তুরস্ক এবং ইরাকের উত্তরে দেশ কুর্দিস্তান এবং তুরস্কের সীমান্ত লাইনে এনভিল স্থাপন করে শত্রুদের আর-রাকা ও মসুল থেকে হটিয়ে দেওয়া। তার আগে যথেষ্ট পরিমাণে আকাশযুদ্ধের মাধ্যমে আইএসের বিমানবন্দরসহ সব ভালনারেবল এলাকা ধ্বংস করে দেওয়া। ইরাক ও সিরিয়ার ফিল্ড অব ফায়ার অনেক স্পষ্ট এবং ট্যাংকসহ অন্যান্য ভারী যুদ্ধাস্ত্র সহজেই চলাচল করতে পারে। ভূমিযুদ্ধের পর শুরু হবে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ যা দুনিয়াব্যাপী চালু করতে হবে। আশা করা যায় এই ইভিল শক্তির বিরুদ্ধে মানবতা অবশ্যই একদিন জয়ী হবে।
লেখক : মেজর, পিএসসিজি (অব.), বর্তমানে আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সিলেটে কর্মরত।

তারিকুল ইসলাম মজুমদার