অভিমত
ঈদে বাড়ি ফেরা হোক নিরাপদে
নগরবাসীর মনে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ছুটির আমেজ। আর মাত্র একদিন বাদেই শুরু হচ্ছে টানা আট দিনব্যাপী কোরবানির ঈদের দীর্ঘ ছুটি। ঈদের এই ছুটিকে ঘিরে রাজধানী ঢাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ আজ থেকে ছুটে যাবে প্রাণের টানে, নাড়ির টানে প্রিয়জনদের সঙ্গে মিলিত হতে। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, স্বজনদের সঙ্গে মিলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ছুটবে সবাই। দুর্মূল্যের টিকেট, রাস্তার জ্যাম-জট সব উড়িয়ে দিয়ে মানুষ ছুটবে মায়ের টানে, বাবার টানে, ভিটেমাটির টানে বরাবরের মতো। নাগরিক ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে চিরচেনা শৈশবের সাথিদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হাসি-আড্ডায় মেতে উঠতে এরই মধ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছেন অনেকেই। ঈদে ঘরমুখো মানুষের এই স্বজনযাত্রা হোক নিরাপদ।
ঈদ উৎসব এখানে নিছকই একটি ধর্মীয় আচার নয়। ঈদ এখানে আসে প্রাণে প্রাণে মিলিত হওয়ার তাগিদ নিয়ে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের একটি বিপুল অংশ রাজধানী ঢাকা শহরে বসবাস করে অস্থায়ীভাবে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে এই শহর তাঁদের আবাস হলেও, মন পড়ে থাকে ওই বাঁকা নদীর তীরে, বাঁশবাগান ঘেরা দূরের কোনো গাঁয়ে। যেখানে রয়েছে তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটা, মায়ের হাতের পরশ, চেনা মানুষ, চেনা ঘ্রাণ, চেনা চেনা সব গাছপালার অবারিত সবুজ, যেখানে জোনাক জ্বলে সাঁঝের বেলা সেখানে একটু ফুরসত মিললেই এই নগরের অধিকাংশ মানুষই ছুটে যেতে চায়। শহর জীবন-জীবিকা দেয় বটে, প্রাচুর্য দেয় বটে, শান্তিটুকু যেন তোলা থাকে ওই গাঁয়ের কলতলার ঠান্ডা জলের স্নানে।
বছরের পর বছর ঢাকা শহরে বাস করা লোকজনও নিজেদের বাড়ি বলতে এখনো গ্রামের বাড়িকেই বোঝে। উৎসবে আমেজে, জন্মদিনে, বিয়েতে এমনকি আম-কাঁঠালের ছুটিতে ফিরে যেতে চায় বারবার। যারা পারে না যেতে, তারা নগরজীবনকে মেনে নেয় বটে, তবে কোথায় যেনে বাজে বিস্বাদের সুর। একটু বয়স্ক শ্রেণির নগরজীবীদের সঙ্গে কথা বললেই তাঁরা আজও গালভরা হাসি হেসে গ্রামীণ জীবনের কথাই বলেন। বাংলাদেশের মানুষের মতো এমন গাঁয়ের প্রতি টান পৃথিবীর আর কোনো দেশে খুঁজে পাওয়ায যায় বলে মনে হয় না।
মানুষ আনন্দ করার জন্য, নাগরিক জীবন থেকে ছুটি পেয়ে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে ঈদ পূজাসহ এমন বড় বড় ছুটিতে ছুটে যায় দেশের বাড়িতে। কিন্তু প্রায়ই এই যাত্রা বিস্বাদে ভরে ওঠে। পথিমধ্যে দুর্ঘটনায় নিপতিত হয়ে আনন্দ ছেঁয়ে যায় বেদনায়। ঢাকা থেকে সারা বছরের রোজগার, পরিবার-পরিজন, প্রিয়জনদের জন্য কেনা উপহার সব গাট্টিবোচকা বেঁধে রওনা হন, তবে পৌঁছাতে পারেন না নিরাপদে। যাত্রাপথে নানা রকম দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ঝরে যায় অনেক প্রাণ। সারা বছর সড়ক নৌ দুর্ঘটনা তো ঘটেই, ঈদের এই লম্বা ছুটিতে যেন এই প্রবণতা বেড়ে যায় বহুগুণে। স্বজনের সঙ্গে মিলিত হতে শুরু হয় যে যাত্রা, তা ভরে ওঠে স্বজন হারানোর ব্যথায়।
যদিও দুর্ঘটনার ওপর কারো হাত নেই। কিন্তু যেই দুর্ঘটনা ক্রমাগত ঘটতে থাকে, তাকে স্রেফ দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যৌক্তিক কোনো কথা হতে পারে না। বিশেষ কোনো উপলক্ষে ঘরে ফিরতে গিয়ে এত সড়ক ও নৌ দুর্ঘটনা বিশ্বের আর কোনো দেশে ঘটার নজির নেই। বিপুল পরিমাণ এই যে মানুষ ঢাকা ছাড়বে ঈদে, তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি কি রয়েছে আমাদের? পর্যাপ্ত গাড়ির ব্যবস্থা রয়েছে? অতিরিক্ত যাত্রী বহন করলে তার কি ব্যবস্থা? নামকাওয়াস্তে যে ব্যবস্থার কথা বলা হয়, যে মনিটরিং টিমের কথা বলা হয়, তাদের কাজ ঠিক কতটুকু, তা প্রতিবছর ঈদে হারানো প্রাণের গণনা করলেই বোঝা যায়।
মানুষের ভালোবাসা আর আবেগের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির পরিবহন ব্যবসায়ীর কাছে বন্দি হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। ট্রেনের টিকেট পাওয়া যায় না। বাসের টিকেট ডাবল-তিন ডাবল দামে চড়ে। লঞ্চে ধারণক্ষমতার তিন গুণ যাত্রী বোঝাই করে বাড়তি মুনাফার আশায়। অথচ বছরের অন্যান্য সময় যে ভাড়ায় বাস, ট্রেন, লঞ্চ চলে, তাতে পরিবহন মালিকদের পথ খরচাসহ মুনাফা সংযুক্ত থাকে। তারপরও কেন ঈদের ছুটিতে বাস ভাড়া ডাবল নেওয়া হয়? ট্রেনের টিকেট কেন পাওয়া যায় না? লঞ্চে অতিরিক্তি যাত্রী বোঝাই করা হয় কেন? এসব দেখার কি কেউ নেই? যদি থেকেই থাকেন, তাদের দায়িত্ব কি? শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা? বাড়তি ভাড়া আদায় ঠেকানোর জন্য কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবার? আমি নিজে ঢাকা থেকে নাটোরগামী বাসে ৩৭০ টাকার টিকেট ৬০০ টাকায় কেটেছি। তাও যেদিন টিকেট ছেড়েছে, তার ঘণ্টা দুই-তিনের মধ্যেই সব টিকেট শেষ। কারা কিনল এত টিকেট? বলাবাহুল্য যে একশ্রেণির অসাধু পরিবহন কর্মর্কতাই অধিকাংশ টিকেট বুকিং দিয়ে রেখে দেন। যত দিন গড়াতে থাকে, টিকেটের দাম তত বাড়তে থাকে। মানুষ নির্বিবাদে একটু পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবে, তারও উপায় নেই!
অন্যদিকে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে পরিবহন ব্যবসায়ীরা ফিটনেসবিহীন গাড়ি অদক্ষ চালক দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেন। মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে ওই সব গাড়িতে চেপে বসে। পথে পথে ঘটে দুর্ঘটনা। ঝরে যায় একের পর এক প্রাণ। বাসের ছাদে, টেনের ভেতরে, বাইরে ছাদে, লঞ্চের ফাঁকফোকর সবখানে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে রওনা দেয়। অথচ একটু তদারক করলে, একটু দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে খুব আরামেরই মানুষ বাড়ি পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে এই কোরবানির ঈদে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ট্রাকে ট্রাকে গরু বোঝাই করে শহরমুখী হন গরু ব্যবসায়ীরা। অনেকেই সারা বছর ভরা লালন-পালন করা শখের গরু নিয়ে চড়ে বসে ট্রাকের ছাদের ওপর অতিরিক্ত বাঁশ বেঁধে তৈরি করা মাচায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুটো পয়সা রোজগারের আশায় তাঁদের এই শহর যাত্রা যেন বিস্বাদে পরিণত না হয়, সেই ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে। হাটে হাটে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। চলতি পথে নিরাপত্তা দিতে হবে।
ঈদ উৎসব সামনে রেখে সরকারি যথাযথ কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করুক। দায়িত্ব নিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক ঘরমুখো মানুষের। ঈদ হোক আনন্দের। ঈদযাত্রা পথ হোক নিরাপদ।
লেখক : শিক্ষক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

রবিউল করিম মৃদুল