আওয়ামী লীগের সম্মেলন
খুলে যাক রাজনীতির বন্ধ দ্বার
উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার,
এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার।
এই স্লোগানে আজ সকালে শুরু হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলন। আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন পেশ, অতিথিদের ভাষণ ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় বর্ণিল উপস্থাপনা থাকলেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতো নেতা নির্বাচনের মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে সম্মেলনের শেষ দিন পর্যন্ত।
ইতিহাসের নানা বাঁকবদলের সাক্ষী আওয়ামী লীগ নামের এই দলটি। স্বাজাত্যবোধসম্পন্ন রাজনীতির গতিধারার বদল ঘটেছে এই দলের হাত ধরে। ১৯৪৯ সালে পুরান ঢাকার কে এম দাশ লেনের রোজ গার্ডেনের সম্মেলন দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামের যে দলটির যাত্রা শুরু; হালের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২০তম সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন দিনে পা রাখছে। ভাসানী-মুজিবের আমলে যে দলটি নিজেদের ওপর থেকে সাম্প্রদায়িক তকমা সরাতে মুসলিম শব্দটি সর্বসম্মতভাবে বাদ দিতে পেরেছিল, যেই দলটি দেশ-মাতৃকার স্বাধিকার আন্দোলনের পথ সুগম করতে ৬ দফার মতো দাবি তুলতে পেরেছিল এবং বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য যেই দলটির অবদান প্রায় একার; সেই আওয়ামী লীগ আজকের এই আড়ম্বরপূর্ণ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশের জন্য ‘বিশেষ’ বা ‘তাৎপর্যময়’ কোনো দিশা নিয়ে আবির্ভূত হতে পারবে তো? সম্মেলনের আলোকচ্ছটায় সব দলের অংশগ্রহণে গঠনমূলক রাজনীতির বাতাবরণটা উন্মুক্ত হবে কি?
দেশে একপক্ষীয় রাজনীতির চাপে একধরনের গুমোট অবস্থা রয়েছে– এ কথা অবশ্য অনস্বীকার্য। সাবেক একনায়ক নিয়ন্ত্রিত জাতীয় পার্টি সংসদে রয়েছে নামে মাত্র একটি বিরোধী দল। কিন্তু সরকারের কোনো সিদ্ধান্তেই ভেটো দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। অন্যদিকে যাদের ছিল বলে সাধারণ মানুষ মনে করে; সেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপিও ভোটের রাজনীতির দোলাচলে পড়ে পুরোদস্তুর কথা ‘বলা, না বলার’ বাইরে। এতদিন ধরেই বাংলার মানুষ ভেবে এসেছিল, এ দেশে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি এই দুই ধারার বাইরে রাজনীতি বলতে তেমন কিছু নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন বিএনপি ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং তারা প্রচলিত ধারার সমানুপাতিক কিংবা সমাধিকারের ভিত্তিতে রাজনীতি করবার সুযোগ না পাওয়ায় অনেকটাই যেন দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া কেউ হয়ে উঠেছে। বর্তমান সংসদের নির্বাচন পূর্ববর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিলে এমন অবস্থা হয়ত এড়ানো যেত।
রাজনীতির ভারসাম্যহীনতা কাউকে এতটা ভাবাত না। তবে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মাধ্যমে রাজনীতির এই দমবন্ধ অবস্থা দূরীভূত হওয়ার সুযোগ এসেছে আরেকবার। যদি দাওয়াত পাওয়া বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্মেলনে যোগ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে তাঁর আলাপচারিতার আলোকরশ্মির ছিটেফোঁটাও আমরা অবলোকন করি, তবে রাজনীতির মোড় ঘুরবে না কে বলতে পারে? আমরা সাধারণরা তো বরাবর এমনটাই চেয়ে এসেছি সব মত ও পথের মানুষের যূথবদ্ধতায় বাংলাদেশ পা রাখুক কাঙ্ক্ষিত শীর্ষবিন্দুতে; যেখানে শুধু অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে রবে পুরো বিশ্ব।
দলের পদপদবি নিয়ে এরই মধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে আলোচনার টেবিল আর ঝড় উঠেছে গণমানুষের চায়ের পানপাত্রেও। বলা হচ্ছে, দলের মহাসচিব পদে নতুন মুখ আসতে পারে। ‘আকাশে চাঁদ উঠলে সবাই দেখবে’ বলে সংবাদকর্মীদের জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তাঁর অনুসারী ও অনুরাগী অনেক নেতাকর্মী ওবায়দুল কাদেরকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আগাম শুভেচ্ছায়ও ভাসাচ্ছেন। তবে কে নেতা হলেন, তাঁর চেয়ে বড় বিষয় হলো, আমরা চাই যোগ্য মানুষের দক্ষ ও ভিন্নতর দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশের ৬৭ বছরের পুরোনো এই দলটি যথার্থ গণতন্ত্র চর্চায় রাজনীতিতে সবার জন্য সুশোভন পরিবেশ সৃষ্টি করুক যার মাধ্যমে দেশের স্বার্থটাই সবার আগে বেগবান হয়।
অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজ সম্মেলনে কাউন্সিলর হয়েছেন এবং তাঁকে দলের বর্তমান মহাসচিব সৈয়দ আশরাফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলতেও দেখা গেছে বলে খবর দিয়েছে মিডিয়া। এটা রাজনীতির জন্য শুভ লক্ষণ বলে মানছেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনপুত্র সোহেল তাজ। কয়েক মাসেই বাবার আদর্শবাদিতা ও সততার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখছিলেন সোহেল তাজ। কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় অজানা কারণে তিনি পদত্যাগ করেন।
এই সম্মেলনের মাধ্যমে যদি সোহেল তাজ রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং সাধারণ সম্পাদকের ডেপুটির মতো কোনো পদ অলংকৃত করেন তবে সত্যিকার অর্থেই তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুভবার্তা দেবে। রাজনীতি দিন দিন যেখানে নষ্ট মানুষদের অধিকারে চলে যাচ্ছে, সেখানে একজন সোহেল তাজের মতো ত্যাগী নিবেদিতপ্রাণ যুবাপুরুষ যদি টিকে যান তবে রাজনীতিতে স্বার্থপর, কাপুরুষ ও সুবিধাবাদী ডিগবাজ হাইব্রিডারদের দৌরাত্ম্য কমতেও পারে। আর তা হবে কলুষিত রাজনীতিতে অমৃত আলোকবর্তিকা।
অবসর পেলে যিনি খুশি হবেন বলে জানিয়েছিলেন, ৩৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প ভাবনা এখন পর্যন্ত নেই বলেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। দেশ পরিচালনা, বিশ্বসভায় বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দলকে সংঘবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকার কথা আওয়ামী লীগ তাদের ঘোষণাপত্রেও স্বীকার করে নিয়েছে। কাজেই খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা বলতে পারি, নেতা বাছাইয়ে সিলেকশন বা ইলেকশন যেটাই হোক না কেন, শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে অবমূল্যায়ন করার উপলক্ষ তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় যদি এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে দলীয় কোনো পদে নিজেকে অভিষিক্ত করে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুতির পথে পা রাখেন, তবে তিনিও নিশ্চয় তাঁর মায়ের সিদ্ধান্তের অনুবর্তীই হবেন।
বিশাল সাজসজ্জা, বিশাল খরচ ও জাঁকজমক আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জানান দিয়ে আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক বিদেশি ডেলিগেটও এতে অংশ নিচ্ছেন। রাজধানীবাসীও এই উৎসবের আঁচ ভালো করেই অনুভব করছেন। চোখধাঁধানো আলোকসজ্জাও পৌঁছে যাচ্ছে সবার দৃষ্টিসীমানায়। যাই হোক, দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে, রাজনীতিটাকে সর্বব্যাপী করতে, গণমানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থে ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে, মানুষের অন্তরের অব্যক্ত কথাগুলো বলার সুযোগ দিতে, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করতে এবং সর্বোপরি সততা ও সুন্দরে পূজায় দেশ ও দশের মঙ্গল ও কল্যাণে যেন এই সম্মেলনের প্রাপ্তিটা উৎসর্গিত হয়। আমরা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করি।
লেখক : সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

ফারদিন ফেরদৌস