‘এশিয়ার ব্রাডম্যান’ জহির আব্বাস
রান করা ছিল তাঁর সহজাত। ২২ গজে তাঁর ব্যাট থেকে রানের ফোয়ারা ছুটেছে অনবরত। যে কারণে জহির আব্বাসকে বলা হতো ‘রান মেশিন’। কেবল পাকিস্তানেই নয়, এশিয়ার সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের একজন বিবেচনা করা হয় তাঁকে। ভক্তরা আদর করে ডাকেন ‘এশিয়ার ব্রাডম্যান’ নামে। ১৯৪৭ সালে শিয়ালকোটে জন্ম নেওয়া এ কিংবদন্তির আজ জন্মদিন।
পাকিস্তানের এ সুদর্শন ক্রিকেটার তাঁর সাদা চশমা জোড়াকে ট্রেডমার্ক বানিয়ে ফেলেছিলেন। মাঠে খুব কম সময়ই তাঁকে দেখা যেত চশমা ছাড়া। ১৯৬৯ সালে করাচিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের পর জাতীয় দলের হয়ে ৭৮ বার মাঠে নেমেছেন। ৪৪.৭৯ গড়ে করেছেন ৫,০৬২ রান। ১২টি সেঞ্চুরির পাশাপাশি আছে ২০টি অর্ধশতক। সর্বোচ্চ ২৭৪, যা পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মধ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ ইনিংস। তাঁর চেয়ে বড় ইনিংসে খেলেছেন কেবল দুজন পাকিস্তানি, জাভেদ মিয়াদাদ (২৮০*) ও ইউনিস খান (২৬৭ এবং ৩১৩)।
এ ছাড়া ৬২টি ওয়ানডে খেলা জহিরের রান ৪৭.৬২ গড়ে ২৫৭২ রান। আছে ৭টি সেঞ্চুরি এবং ১৩টি হাফ সেঞ্চুরি। পাকিস্তানের হয়ে তিনটি বিশ্বকাপ খেলা এ ব্যাটসম্যান ১৪টি টেস্ট এবং ১৩টি ওয়ানডেতে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জহির আব্বাস এশিয়ার একমাত্র ব্যাটসম্যান, যিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরির শতক করেছেন। ৪৫৯ ম্যাচে জহিরের শতকসংখ্যা ১০৮। যেখানে ভারতের সাবেক দুই কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার ও সুনিল গাভাস্কারের শতকের সংখ্যা ৮১টি করে। ১৯৯টি শতক হাঁকিয়ে এ তালিকায় শীর্ষে আছেন ইংলিশ ব্যাটসম্যান জ্যাক হবস।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁর সামর্থ্যকে সেভাবে বিবেচনায় আনেননি ক্রিকেটবোদ্ধারা। পেস বলের বিপরীতে তাঁর খেলার ধরন নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। সমালোচকদের জবাব দিয়েছে জহিরের ব্যাট। ১৯৭১ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এজবাস্টনে ক্যারিয়ারসেরা ২৭৪ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন জহির। এরপর ১৯৭৪-এ ২৪০ রানের ইনিংস খেলেন পাকিস্তানে এ ব্যাটিং স্তম্ভ, ওভালের সে ম্যাচের প্রতিপক্ষও ছিল ইংল্যান্ড।
চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে জহিরের ব্যাট ছিল সবচেয়ে শাণিত। টেস্টে তাঁর ১২ সেঞ্চুরির ছয়টিই ভারতের বিপক্ষে, সর্বোচ্চ ২৩৫*, গড় ৮৭। ৪টি দ্বিশতকের ২টি এবং ওয়ানডের ৭ সেঞ্চুরির ৩টিই ভারতের বিপক্ষে। বলা হয়ে থাকে, ১৯৮২-৮৩ সালে পাকিস্তান সফরে গিয়ে অনেক ভারতীয় স্পিনারের ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়েছিল কেবল জহিরের নির্দয় ব্যাটিংয়ের কারণে। সেবার ২১৫, ১৮৬, ১৬৮ রানের অনবদ্য তিনটি ইনিংস খেলেন জহির। ভারতের সাবেক অধিনায়ক সুনীল গাভাস্কার ধারাভাষ্যে একবার বলেছিলেন, ‘তখন জহিরের কথা উল্লেখ করে দলের ক্রিকেটাররা বলত, ‘জহির আব বাস কার’ অর্থাৎ ‘জহির এবার থাম।’
সবাইকেই একদিন থামতে হয়। জহিরও থেমেছেন। বয়সের ভার বাড়তে থাকে, ভারী হতে থাকে ব্যাট। পেস বলের বিপরীতে শরীরটা আর যেন সায় দিচ্ছিল না। ১৯৮৫ সালে ব্যাট-গ্লাভস শোকেসবন্দি করেন জহির। ২২ বছরের ক্যারিয়ারে তাঁর নামের পাশে আছে ৩৪,৮৪৩ রান।

সায়েদুল মাহমুদ