ক্লাইভ রাইস, একটি আফসোসের নাম
ক্লাইভ রাইস। গত শতাব্দীর আশির দশকের বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারদের মধ্যে অন্যতম। আবার ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ভাগাদের একজনও তিনি। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটের এক ভৌতিক থাবা কেড়ে নেয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। সামর্থ্যের প্রায় কিছুই দিতে পারেননি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতার পর ১৯৬১ সালে প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে গণতন্ত্র ঠিক এলো না। শ্বেতাঙ্গ শাসকশ্রেণির বর্ণবাদ কেবল রাজনীতি আর প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ থাকল না। ক্রিকেটের পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এই বর্ণবাদে বারবার ফিকে হয়েছে সে দেশের ক্রিকেট। এতে কেবল কালোরাই নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শ্বেতাঙ্গ প্রতিভাবানরাও।
১৯৭০ সালে শ্বেতাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে কেবল ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার ঘোষণা দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার। যার প্রতিক্রিয়ায় আইসিসির নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয় তাদের। ক্রিকেট থেকে এ আকস্মিক নির্বাসন বাসিল ডি অলিভেইরা, ব্যারি রিচার্ড, গ্রায়েম পোলক, এডি বারলোদের মতো অসংখ্য প্রতিভার সঙ্গে ক্লাইভ রাইসের ক্যারিয়ারেও বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে। রিচার্ড, পোলকরা তাও বেশ কিছু টেস্টে মাঠে নেমে তাঁদের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছিলেন; কিন্তু রাইস? সাদা পোশাকে মাঠ মাতানোর স্বপ্ন তাঁর অধরাই থেকে গেল। ১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের দেশ পুনর্গঠনের পরে আইসিসির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়। পুনর্বাসন থেকে ফিরে আসা দক্ষিণ আফ্রিকা দলের অধিনায়ক হিসেবে ভারত সফরে আসেন রাসই। তবে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে নিজেকে একেবারেই মেলে ধরতে পারেননি এ অলরাউন্ডার। ১৩.০ গড়ে করেন মাত্র ২৬ রান। বল হাতে নেন মাত্র ২টি উইকেট। সে বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের দলে তাঁর জায়গা না পাওয়া নিয়েও বিতর্কটা কম হয়নি। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার জন্য বাধা হিসেবে তাঁর বয়সটা সামনে চলে আসে। এই ক্রিকেটারের বয়স তখন ৪২! এ কারণে পরের বছর বিশ্বকাপের দলেও জায়গা হলো না রাইসের। ১০ নভেম্বর ভারতের ইডেন গার্ডেনে শুরু, ১৪ নভেম্বর দিল্লিতে শেষ। মাত্র ছয় দিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবে প্রথম শ্রেণিতে তাঁর অসামান্য অলরাউন্ড নৈপুণ্য দিয়ে গেছে একরাশ আফসোস আর হতাশা। ৪৮২ ম্যাচে ৪০.৯৫ গড়ে এ ডানহাতির রান ২৬,৩৩১। অন্যদিকে বল হাতে ২২.৪৯ গড়ে তুলে নিয়েছেন ৯৩০টি উইকেট। এ ছাড়া লিস্ট এ'র ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ৫,০০০ রান ও ৫০০ উইকেটের মালিক হন এ ডানহাতি পেসার। অথচ প্রথম শ্রেণিতে সমসাময়িক কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ইমরান খান, স্যার ইয়ান বোথাম, কপিল দেব কিংবা স্যার রিচার্ড হ্যাডলির ব্যাটিং ও বোলিং গড় ছিল তাঁর আশপাশেই। বর্ণবাদের অতলগহ্বরে ক্যারিয়ারের যৌবনটা হারিয়ে না গেলে কে জানে, হয়তো এসব কিংবদন্তির সঙ্গেই উচ্চারিত হতো ক্লাইভ রাইসের নামটাও।
অবসরের পর নটিংহ্যামশায়ারের কোচের দায়িত্ব পালন করা রাইসই নাকি স্বদেশি কেভিন পিটারসেনকে দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
১৯৪৯ সালে জোহানেসবার্গে জন্ম নেওয়া রাইসের ব্রেইন টিউমার ধরা পড়ে ১৯৯৮ সালে। দীর্ঘসময় এ ঘাতকের সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে ইহজাগতিক ইনিংসের সমাপ্তি টানেন ক্লাইভ রাইস। সোমবার ছিল এই ক্রিকেটারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ওপারে ভালো থেকো রাইস!

সায়েদুল মাহমুদ