ব্রাডম্যানদের লজ্জার একদিন
ওভালের উইকেট বরাবরই ব্যাটিং সহায়ক। তাই টস ভাগ্যই হতে পারে ম্যাচ ভাগ্য। তবে ১৯৩৮ সালের অ্যাশেজের শেষ টেস্টেও টস দেবতার সুদৃষ্টি মিলল না ডন ব্রাডম্যানের। টানা চতুর্থ ম্যাচে টস জিতে নিলেন ওয়ালি হ্যামন্ড। প্রত্যাশিতভাবেই নিলেন আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত। মাত্র ২৯ রানের মাথায় ওপেনার বিল এডরিচকে ফেরান বিল ও'রেইলি। ব্যাস, ওই শেষ! পুরো ম্যাচে অজিদের উদযাপনের আর কোনো সুযোগই দিল না ব্যাটসম্যানরা। দাঁড়িয়ে গেলেন ওপেনার স্যার লিওনার্ড হাটন এবং মাওরিচ লেল্যান্ড। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে গড়েন ৩৮২ রানের পার্টনারশিপ। যা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আজও ইংলিশদের সর্বোচ্চ রানের জুটি।
২৯১২ সালে স্যার জ্যাক হবস এবং উইলফ্রেড রোডিশের ৩২৩ রানের রেকর্ড ভাঙেন তারা। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের যেকোনো উইকেট জুটিতে সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপ গড়েন। অবশ্য ১৯৫৭ সালে তৎকালীন অধিনায়ক পিটার মে এবং কলিন কোডরে এজবাস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪১১ রানের জুটি গড়ে ভেঙ্গে দেন ১৯ বছর আগের সে রেকর্ডটি।
ক্যারিয়ার সেরা ১৮৭ রান করে রান আউট হয়ে ফেরেন লেল্যান্ড। তবে এক পাশ আগলে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন হাটন। দ্বিতীয় দিনে ও'রেইলির বলে লিন্ডসে হ্যাসেটের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন হাটন। স্বাগতিকদের স্কোর তখন ৬ উইকেটে ৭৭০। হাটনের ৩৬৪ রানের ইনিংসটি টেস্টের ইতিহাসে তখনকার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস, বর্তমানে ষষ্ট। স্বদেশি ওয়ালি হ্যামন্ডের ১৯৩৩ সালে গড়া ৩৩৬ রানের রেকর্ডটি ভাঙেন তিনি। ২০ বছর পর ১৯৫৮ সালে যেটি পেরিয়ে যান ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি স্যার গ্যারি সোবার্স (৩৬৫*)। ২০০৪ সালে ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৪০০ রানের ইনিংসই বর্তমানে সর্বোচ্চ।
১৯০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইংলিশ ব্যাটসম্যান হিসেবে টিপ ফস্টারের ২৮৭ রানের রেকর্ড ভাঙেন হাটন যা আজো ছুঁতে পারেননি তাঁর কোনো স্বদেশি। শুধু তাই নয়, অ্যাশেজের ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। এর আগে যেটি ছিল স্যার ডন ব্রাডম্যানের দখলে। ১৯৩০ সালে হেডিংলিতে ক্যারিয়ারসেরা ৩৩৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন এ অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তী। হাটনের ৭৯৭ মিনিটের (২৯২ ওভার) ইনিংসটি ছিলো তখনকার দীর্ঘতম। ১৯৩০ সালে স্বদেশি অ্যান্ডি স্যান্ডামের ৬০০ মিনিটের (২২১ ওভার) রেকর্ড ভাঙেন। তবে ১৯৫৮ সালে হাটনকে ছাড়িয়ে যান অবিভক্ত পাকিস্তানের রক্ষণ দেয়াল হানিফ মোহাম্মাদ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯৭০ মিনিটের (৩০৯ ওভার) এক ঐতিহাসিক ম্যারাথন ইনিংস খেলেন হানিফ।
সপ্তম উইকেটে নামা জোসেফ হার্ডসটাফ যখন দেড়শো রান টপকালেন তখন নতুন মাইলফলকে দাঁড়াল ইংল্যান্ড। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক ম্যাচে তিনটি দেড় শতাধিক রানের ইনিংস খেললেন ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা। ক্রিকেটে এমন নজির আছে আর মাত্র একবারই। ১৯৮৬ সালে কানপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেড় শতাধিক রানের ইনিংস খেলেছিলেন ভারতের তিন লিজেন্ড সুনিল গাভাস্কার (১৭৬), মোহাম্মাদ আজহারউদ্দিন (১৯৯) এবং কপিল দেব (১৬৩)।
অন্যদিকে সফরকারীদের পাশে যুক্ত হতে থাকল একের পর এক লজ্জার রেকর্ড। এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি বল করে ফেললেন অস্ট্রেলিয়ার চাক ফ্লিডউড-স্মিথ। প্রথম ইনিংসে ৫২২টি ডেলিভারি করেন বাঁহাতি এ চায়নাম্যান। আগের রেকর্ডটি ছিল ইংল্যান্ডের জর্জ গ্যারির। ১৯২৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক ইনিংসে তাঁর ডেলিভারি ছিল ৪৮৬টি। বর্তমান রেকর্ডটি অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের সনি রামদিনের দখলে। ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৮৮টি বল করেন এ ক্যারিবিয়ান। তবে ইনিংসে রান খরচার দিক থেকে এখনো সবার উপরেই আছেন ফ্লিডউড-স্মিথ। সেবার ২৯৮ রান ব্যয়ে নিয়েছিলেন মাত্র একটি উইকেট। দল হিসেবেও এক ইনিংসে সর্বাধিক বল করার বিশ্বরেকর্ড গড়ে অস্ট্রেলিয়া। ইংল্যান্ডের একমাত্র ইনিংসে অজি বোলাররা করেছিলেন দুই হাজার ১১টি ডেলিভারি।
১৬৯ রান করা হার্ডসটাফ তখনো পিচে। ইনিংসটা আরো কিছুদূর নিয়ে যেতেই পারত ইংল্যান্ড। এক হাজারের মাইলফলকও ছুতে পারত হয়তো। তবে সাত উইকেট হারানোর পর হ্যামন্ড ইনিংস ঘোষণা দিলেন ৯০৩ রানে। তখনকার সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। এ রেকর্ড গড়তে নিজেদেরই ছাড়িয়ে গেল ইংল্যান্ড। ১৯৩০ সালে কিংস্টনে ৮৪৯/৭-এ ইনিংস ঘোষণা দিয়েছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটি ইংলিশরা ধরে রেখেছিল ৫৯ বছর। ১৯৯৭ সালে এটি টপকে যায় শ্রীলঙ্কা। কলম্বোয় ভারতের বিপক্ষে ছয় উইকেটে ৯৫২ রানে ইনিংস ঘোষণা দেয় অর্জুনা রানাতুঙ্গার দল।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং করা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ উইকেট ততক্ষণে মেজাজ হারিয়েছে। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ হওয়ার আগেই বিল বউয়িজের প্রথম শিকারে পরিণত হন ওপেনার জ্যাক ব্যাডকক। শেষ পর্যন্ত ২০১ রানেই গুটিয়ে যায় সফরকারীদের প্রথম ইনিংস। ফলোঅনে পড়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে ব্যবধানটাই কমাতে পারল সামান্যই। কেন ফারনেস, হেডলি ভেরিটি এবং বইয়িজদের বোলিং তোপে মাত্র ১২৩ রানে অসহায় আত্মসমর্পণ করল ব্রাডম্যান বাহিনী।
সেই বছর আজকের দিনে (২৩ আগস্ট) ইনিংস এবং ৫৭৯ রানের লজ্জা নিয়ে মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা। শুধু অ্যাশেজই নয়, ক্রিকেটের ইতিহাসে আগে ফিল্ডিং করে বড় ব্যবধানে হারের রেকর্ড এটিই। এখানে নিজেদের লজ্জার রেকর্ডটিই নবায়ন করে অজিরা। ১৮৯২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই তারা হেরেছিল ইনিংস এবং ২৩০ রানে।

স্পোর্টস ডেস্ক