ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়া : সরকার ও বিসিবির সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক?
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে না বাংলাদেশের। ৪ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি— ২০ দিনের আলোচনায় বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা উদ্বেগকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি আইসিসি। গত শনিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে আইসিসি। বাংলাদেশের পরিবর্তে বিশ্বকাপে ডাকা হয়েছে স্কটল্যান্ডকে।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলায় ক্রিকেটপ্রেমীরা কিছুটা হতাশ হলেও ক্রিকেটারদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। যে কারণে শুরু থেকেই নিজেদের দাবিতে অনড় ছিল দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাটি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুতে সরকার থেকে দেওয়া হয়েছিল নির্দেশনা। এখন প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল? বিসিবির এই সিদ্ধান্তে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে ক্রিকেটপাড়া থেকে সাধারণ মহল। বেশিরভাগই অবশ্য বোর্ডের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সরকার কিংবা বিসিবির সাফ কথা, আগে নিরাপত্তা। এর বাইরে আরও কয়েকটি কারণ আছে, যেগুলো সরকার ও বিসিবিকে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
শুরুটা মুস্তাফিজকে দিয়ে
বিসিবির এই সিদ্ধান্তের পটভূমি তৈরি হয়েছে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর। সেসময় ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা হুমকি দেন মুস্তাফিজকে। বিমান বন্দর থেকে বের না হতে দেওয়া থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামে ভাঙচুরের হুমকি দেন তারা।
লাগাতার এই হুমকির কারণে তড়িঘড়ি করে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) ও আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিল কোনো বোর্ড সভা ছাড়াই উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে যেটি প্রকাশ্যে আনেন বোর্ডেরই এক সদস্য।
আইসিসির তিন ‘ভূতুড়ে’ শর্ত
ভারতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কা কমাতে তিনটি প্রস্তাবনা দেয় আইসিসির সিকিউরিটি টিম। এক অনুষ্ঠানে সেই চিঠির বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সেই প্রস্তাবনার চিঠিতে আইসিসির সিকিউরিটি টিম কিছু শর্ত দেয়।
১. বিশ্বকাপ দল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দিতে হবে।
২. বাংলাদেশের সমর্থকরা ভারতে গেলেও জাতীয় দলের জার্সি পরতে পারবে না এবং পতাকা নিয়ে মাঠে যেতে পারবে না।
৩. বাংলাদেশের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, নিরাপত্তা ঝুঁকি তত বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্বকাপ দল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দিতে হবে
মুস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু আইসিসির সিকিউরিটি টিমের প্রস্তাবনায় পরোক্ষভাবে মুস্তাফিজকে ছাড়াই বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ খেলতে যেতে বলা হয়। যেটি নিরপেক্ষ দল নির্বাচন ও কোনো একটি দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের শামিল। আইসিসি, ভারত কিংবা কোনো সংস্থা কেউই এ ধরনের প্রস্তাবনা দিতে পারে না। বাংলাদেশও এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বাংলাদেশের সমর্থকরা জাতীয় দলের জার্সি পরতে পারবে না
প্রতিটি দলের প্রাণ বলা হয় তাদের সমর্থকদের। যারা মাঠে দ্বাদশ খেলোয়াড়ের ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সমর্থকদের মাঠে থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা। একে তো আইসিসির সিকিউরিটি টিমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সমর্থকরা বাংলাদেশের জার্সি পড়তে পারবে না। তার ওপর ভারত সরকার অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া সীমিত করে রেখেছে। ফলে বাংলাদেশিদের মাঠে বসে খেলা দেখা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা।
বাংলাদেশের দর্শকরা পতাকা নিয়ে মাঠে যেতে পারবে না
দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন দেশে লাল-সবুজের পতাকা পেয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু আইসিসির সিকিউরিটি টিমের প্রস্তবনায় বলা হয়েছিল- জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠে যেতে পারবে না বাংলাদেশি সমর্থকরা। যেটি একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত। একই সঙ্গে এটি দেশের জাতীয় সম্মানের প্রশ্ন। এই প্রশ্নের সঙ্গে কোনো আপস করতে চায়নি বিসিবি কিংবা সরকার।
নিরাপত্তা শঙ্কার উদাহরণ শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত
ভারতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা শঙ্কা কতটা প্রকট সেটি প্রকাশ্যে এসেছে সদ্য সমাপ্ত ভারত-নিউজিল্যান্ড সিরিজে। ভারতে অনুষ্ঠিত এই সিরিজে আম্পায়ার হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত। সাধারণত দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে দুজন বিদেশি আম্পায়ার রাখা হয়। এর মধ্যে একজন এক ম্যাচে অনফিল্ড আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, আরেকজন টিভি আম্পায়ার হিসেবে। এভাবেই ঘুরেফিরে সিরিজ চলে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত আম্পায়ারকে তিন ম্যাচের সবগুলোতেই রাখা হয় টিভি আম্পায়ার হিসেবে।
সাংবাদিকদের হোটেল পাওয়ার অনিশ্চয়তা
সাম্প্রতিক এই নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হওয়ার আগেই ভারতে থাকার জায়গার সঙ্কটে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের। বাংলাদেশি বলে হোটেল ভাড়া দিতে চায়নি ভারতীয়রা। চলমান এই পরিস্থিতিতে সেই সঙ্কট যে আরও প্রবল আকার ধারণ করবে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিসিবিও শুরু থেকেই এই বিষয়টি মাথায় রেখেছে এবং বারবার সেটি প্রকাশ্যেই বলেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদন
পুরোটা সময় ভারতে না যাওয়ার ব্যাপারে অনড় থেকেছে বিসিবি। সরকারের তরফ থেকেও বারবার বলা হয়েছে— ভারতে নয়, শ্রীলঙ্কায় হলে বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ। আইসিসির সিদ্ধান্তের পর গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) এই ব্যাপারে কথা বলেছে বিসিবি। বোর্ড সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবর খোলাসা করেন সরকারের দিকটি।
আসিফ বলেন, ‘গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের নিজস্ব প্রশ্ন ছিল এখানে। তাদের একটা গোয়েন্দা প্রতিবেদন থাকে যে আমাদের ক্রিকেটার, সাংবাদিক, দর্শক বা ট্যাকটিকাল লোকজন যাবে, তাঁদের নিরাপত্তা ইস্যু ও সেখানে যে ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে, সেগুলোকে মাথায় রেখেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মুহূর্তে যদি কোনো নাশকতামূলক ঘটনাও ঘটে, সেটার দায়দায়িত্ব আমরা নিতে পারি না। এটা সরকারের সিদ্ধান্ত।’
আসিফ যোগ করেন, ‘এখানে আপনারা অনেকে আছেন, সমর্থকরা আছে। তাদের সবার কথা ভাবতে হয়েছে। সরকার সবার কথা ভেবে ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। বিসিসিআই কোনো রাষ্ট্র না। রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র যখন কথা হয়েছে, আমরা নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তা পাইনি। আমরা কখনো বলিনি আমরা খেলতে চাইনি। সরকার থেকে বলা হয়েছে, আমরা নিরাপদ না।’
এক মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়েই যেখানে এত এত নিরাপত্তা শঙ্কা সেখানে পুরো দলের শঙ্কা বাড়বে বৈ কমবে না। শুরুতেই যেটি বুঝতে পারে সরকার। বিসিবিও সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

নাজমুল সাগর