রাস্তায় ফল বিক্রি থেকে হোটেলের ওয়েটার– সেই হায়দার এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে
যে কোনো খেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে থাকে সব অ্যাথলেটের। কারও স্বপ্ন পূরণ হয়। কারও থাকে অধরা। প্রত্যেকের গল্প আলাদা। সেসব গল্পে মিশে থাকে রোমাঞ্চ। কারও গল্প কয়েক কাঠি সরেস। যা শুনলে সুপ্ত ইচ্ছে জেগে ওঠে। সঙ্গে যদি যোগ করা যায় পরিশ্রম, তাহলে ভাগ্য এসে ধরা দেয় আপনা থেকেই। হায়দার আলীর গল্পটাও তেমন। জীবিকার তাগিদে যিনি রাস্তায় ফল বিক্রি করতেন, পেট চালাতে বেছে নিয়েছিলেন ওয়েটারের কাজ। সেই তিনি এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে জ্বলজ্বল করছেন আপন আলোয়।
গত বছর বাংলাদেশকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশের বিপক্ষে সিরিজ জয় করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেই জয়ে স্বাগতিকদের হয়ে বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন বাঁহাতি স্পিনার হায়দার আলী। ইতোমধ্যে নিজেকে আরও শাণিত হিসেবে প্রমাণ করেছেন বাঁহাতি এই স্পিনার। এবার তিনি জায়গা করে নিয়েছেন স্বপ্নের বিশ্বকাপ দলে। মাঠেও নেমে পড়েছেন তিনি।
হায়দারের যাত্রা মোটেও এমন সহজ ছিল। জীবনযুদ্ধে লড়াই করেই ক্রিকেটের মাঠে লড়তে হয়েছে তাকে। হায়দার নিজের সংগ্রামী জীবনের গল্প বলেছেন ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে।
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে জন্ম হায়দারের। শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। এরপর তার বেড়ে ওঠা চাচার কাছে। শৈশবেই স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন পাকিস্তানের সবুজ জার্সিটা গায়ে জড়ানোর। সেই লক্ষ্যে ছেড়েছিলেন বাড়িও। পাড়ি জমান লাহোরে। ক্রিকেটকে চালিয়ে নিতে রাতের বেলা কাজ করতেন ওয়েটারের। আবার কখনও ফল বিক্রি করেছেন রাস্তায়।
নিজের স্বপ্নের পথে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন হায়দার। দেশটির প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটেও অভিষেক হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সবুজ জার্সিটা গায়ে জড়ানো হয়নি। অজানা কারণেই পাকিস্তানে তার ক্যারিয়ারে শুরুর আগেই ফুলস্টপ পড়ে যায়।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে দেয় হায়দার আলীর জন্য। মহামারির সেই কঠিন পরিস্থিতি আর্থিকভাবে আরও দুর্বল করে দেয় তাকে। কিন্তু, ‘মেঘ দেখে তুই করিসনেরে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ –রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা সেই পঙক্তি যেন হায়দারের জীবনে বাস্তব হয়ে আসে। উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানেই ধরা দেয় নতুন স্বপ্ন।
আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, তিন বছর অবস্থান করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এরপর ২০২৫ সালে ইউএই দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি। গত বছরের মে-তে অভিষেক হয় বাংলাদেশের বিপক্ষে। অভিষেকেই নজর কাড়েন তিনি। সেই ম্যাচে হায়দারের বোলিং ফিগার ছিল ৪-১-৭-৩। এরপর জাতীয় দল আর আরব আমিরাতের ঘরোয়া লিগ আইএল টি-টোয়েন্টিতে পারফর্ম করে জায়গা করে নিয়েছেন স্বপ্নের বিশ্বকাপ দলে।
হায়দার বলেন, ‘এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চ এবং বিশ্বকাপে খেলা প্রত্যেক ক্রিকেটারের স্বপ্ন। আমি এমন অনেক খেলোয়াড়কে দেখেছি যারা ১০ বছর ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, কিন্তু কখনও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাননি। আমরা যদি তারকা হতে চাই এবং দেশের জন্য বিশেষ কিছু করতে চাই, তবে আমাদের মাঠে পারফর্ম করতে হবে।’
আইএল টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ছয় ওভারে তার ইকোনমি রেট ৫.৯৩, যা অন্তত ২০ ইনিংস বল করা বোলারদের মধ্যে সেরা। বিশ্বকাপের পাওয়ারপ্লেতে নিজের দক্ষতা দেখাতে উদগ্রীব হায়দার।
হায়দার বলেন, ‘আমি আইএল টি-টোয়েন্টি, আবুধাবি টি-১০ ও ইউএই-র ঘরোয়া ক্রিকেটে পাওয়ার প্লেতে বল করেছি। আমি পাওয়ার প্লেতে বল করতে ভালোবাসি এবং অস্ট্রেলিয়া, ভারত বা নিউজিল্যান্ড যার বিপক্ষেই খেলি না কেন, কোনো চাপ নেই না। আমি শুধু বলের দিকে মনোযোগ দেই এবং দলের জন্য কী করা প্রয়োজন তা ভাবি।’
ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে ডেভিড ওয়ার্নার ও রভম্যান পাওয়েলের মতো তারকাদের সঙ্গে ড্রেসিংরুমে সময় কাটিয়েছেন হায়দার। বিশ্ব ক্রিকেটে পারফর্ম করতে যেটি তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
হায়দার বলেন, “আইএল টি-টোয়েন্টি আমার জীবন বদলে দিয়েছে। এমিরেটস ক্রিকেট বোর্ডকে অনেক ধন্যবাদ। প্রথম বছর যখন স্কোয়াডে ছিলাম, তখন সুপারস্টারদের পাশে দেখে কিছুটা নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু শারজাহ ওয়ারিয়র্সের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দারুণ বল করার পর ডেভিড ওয়ার্নার এসে আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমিই সেরা। তোমার মতো বাঁহাতি স্পিনার আমি আগে দেখিনি’।’’
হায়দার কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে করা তার ওই স্পেলটি নিয়েও। তার ভাষ্যমতে, ওই ম্যাচটি ছিল তার ক্যারিয়ারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ–, ‘বাংলাদেশের বিপক্ষে ওই স্পেলটি আমার ক্যারিয়ারের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সেটি ছিল সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ। আমি আমাদের কোচ লালচাঁদ রাজপুত স্যারকে বলেছিলাম যে, আমি এই দেশটির জন্য বিশেষ কিছু করতে চাই। কারণ এই দেশ আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছে। আমি ইউএই ব্যাজের জন্য খেলি, যা আমাকে সবকিছু দিয়েছে।’
নিজের সাফল্যের জন্য দুজনকে কৃতিত্ব দিয়েছেন হায়দার। এর মধ্যে একজন হলেন সাবেক ইউএই স্পিনার আহমেদ রাজা, আর আরেকজন হলেন টিম অ্যানালিস্ট মনপ্রীত সিধুর। হায়দার রসিকতা করে বলেন, ‘আমি সবসময় বোলিং নিয়ে অজস্র প্রশ্ন করে তাদের বিরক্ত করি।’

নাজমুল সাগর