২২ বছর আগে হাইতির অস্থিরতায় শান্তির দূত হয়ে উঠেছিল ব্রাজিল
সময়টা ২০০৪ সাল। আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে। তখন ক্যারিবীয় দেশ হাইতি ভয়াবহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত ছিল। সশস্ত্র গ্যাংয়ের দখলদারি আর লাগাতার সহিংসতায় সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল চরম অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা তখন প্রায় ভেঙে পড়ার মতো অবস্থায়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে এগিয়ে আসে ব্রাজিলের নেতৃত্বে জাতিসংঘের একটি শান্তিরক্ষা মিশন।
আজ ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে ফিলাডেলফিয়ায় ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে ব্রাজিল ও হাইতি মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের আগে আবারও আলোচনায় এসেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের শান্তির দূত হয়ে ওঠার এক পুরোনো ঘটনা।
এই মিশনে সামরিক দায়িত্বে ছিল ব্রাজিলের সেনাবাহিনী। নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল অগুস্তো হেলেনো রিবেইরো পেরেইরা। শুরুতে প্রায় ১২০০ ব্রাজিলিয়ান সেনা হাইতিতে মোতায়েন করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এই সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ৫০০০ পর্যন্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশও এতে যুক্ত হয়। আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়ে থেকে প্রতিটি দেশ প্রায় ৫০০ করে সৈন্য পাঠায়। এর পাশাপাশি কানাডা, মরক্কো, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং স্পেনও এই বহুজাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়।
এই পুরো উদ্যোগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তার লক্ষ্য ছিল শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং মানুষের আস্থা অর্জন করে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। এই চিন্তা থেকেই আসে এক ভিন্নধর্মী কৌশল ফুটবলকে কূটনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা।
২০০৪ সালের ১৮ আগস্ট হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল ও হাইতি। ইতিহাসে এটি “শান্তির ম্যাচ” নামে পরিচিত। দীর্ঘদিনের সহিংসতা আর অস্থিরতার মধ্যে থাকা মানুষ সেদিন প্রথমবারের মতো একটি বড় ক্রীড়া উৎসবের পরিবেশ পায়, যেখানে ভয়ের বদলে আনন্দ ও স্বস্তি ছিল বেশি।
ম্যাচে ব্রাজিল ৬–০ গোলে জয় পায়। রোনালদিনহো হ্যাটট্রিক করেন, রোনালদো করেন দুইটি গোল এবং নিলমার একটি গোল করেন। তবে ফলাফলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সেদিনের আবেগ, মানুষের অংশগ্রহণ এবং পরিবেশের পরিবর্তন।
এই ম্যাচে খেলেন রবার্তো কার্লোস, জিলবার্তো সিলভা, হুয়ান এবং জুলিয়ানো বেলেত্তি সহ ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের একাধিক তারকা। ম্যাচ শুরুর আগে তারা প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ সাঁজোয়া যানবাহনে অতিক্রম করেন এবং পথে প্রায় ১০ লাখ মানুষ তাদের স্বাগত জানায়।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কিছু টিকিট অস্ত্র জমা দেওয়ার বিনিময়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যাতে নিরস্ত্রীকরণে উৎসাহ তৈরি হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তবুও এটি শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ঘটনার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে ফিফা ব্রাজিলিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ফেয়ার প্লে পুরস্কার প্রদান করে। একই বছরে রোনালদিনহো ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি পান। হাইতির সেই ম্যাচ আজও স্মরণ করা হয় একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে, যেখানে ফুটবল কেবল খেলা নয়, হয়ে উঠেছিল শান্তি ও মানবিক সংযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

স্পোর্টস ডেস্ক