আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ড দ্বৈরথ ফিরিয়ে আনছে পুরোনো ইতিহাস
বিশ্ব ফুটবলে কিছু ম্যাচ আছে, যা কেবল খেলা নয়, ইতিহাসের পুনর্জন্ম। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া ঠিক তেমনই এক দ্বৈরথ, যেখানে প্রতিটি পাস, প্রতিটি গোলের ভেতর লুকিয়ে থাকে কয়েক দশকের ক্ষোভ, স্মৃতি আর প্রতিশোধের গল্প। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই শক্তির সংঘর্ষ ঘিরে উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
শেষ ষোলোতে মিসরের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর থেকেই উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে আর্জেন্টিনা শিবিরে। ড্রেসিংরুমে লিওনেল মেসি ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজদের কণ্ঠে শোনা যায় ইংল্যান্ড বিরোধী গান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও বুয়েনোস আইরেসে সমর্থকদের কণ্ঠেও ওঠে ইংল্যান্ডবিরোধী স্লোগান, যদিও তখনও প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ড নিশ্চিত ছিল না।
টুর্নামেন্টের অগ্রগতির সঙ্গে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয়। কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের ম্যাচ জিতে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। আগামী বুধবার (১৫ জুলাই) আটলান্টায় ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দেখা হবে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর।
কানসাসে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোর পরই যেন ম্যাচটির আবহ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত সময়ে জয় নিশ্চিত করার পর গ্যালারির সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাসে মাতেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা। সেই সময় তাদের মুখে ধ্বনিত হয় বহুল পরিচিত স্লোগান, ‘কো এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস’ যার অর্থ যে লাফাবে না, সে ইংরেজ। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই মানসিক চাপ তৈরির এই লড়াই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই দ্বৈরথের পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, যা আর্জেন্টিনায় মালভিনাস নামে পরিচিত, সেই সংঘাতই দুই দেশের সম্পর্ককে চরম তিক্ত করে তোলে।
দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাত্র ৭৪ দিনের যুদ্ধে প্রাণ হারান আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনা সদস্য। এই পরাজয় আর্জেন্টিনার মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি। সেই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যায় ফুটবল মাঠে।
যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই দল। সেই ম্যাচে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় লিখে দেন। প্রথমে হাত দিয়ে করা গোল, যা হ্যান্ড অব গড নামে পরিচিত, এরপর একক নৈপুণ্যে করা অবিশ্বাস্য গোল, যা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করার পর ম্যারাডোনা জানান, এই জয় ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রতিশোধের প্রতীক। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে তার মনে ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি।
এই বৈরিতার শুরু আরও আগে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিত লাল কার্ড দেখানো হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে মাঠে। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন এবং তাদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। সেই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে।
মেসির জন্য এই ম্যাচটি হতে যাচ্ছে বিশেষ এক অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তিনি কখনোই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামেননি। ফলে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে প্রথমবারের মতো এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হতে যাচ্ছেন তিনি। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছেও এটি ১৯৮৬ সালের ঐতিহ্য ধরে রাখার বড় সুযোগ।
এই দ্বন্দ্বের প্রভাব রেফারিংয়েও পড়ে। আর্জেন্টিনার ম্যাচে সাধারণত ইংলিশ রেফারি এবং ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ দেওয়া হয় না, যাতে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে এই দুই দল। ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালে জয় পায় ইংল্যান্ড। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার নৈপুণ্যে জিতে শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। ১৯৯৮ সালে টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা, আর ২০০২ সালে বেকহ্যামের পেনাল্টিতে ১-০ ব্যবধানে জিতে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। এরপর ২০০৫ সালের পর আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুখোমুখি হয়নি দল দুটি।

স্পোর্টস ডেস্ক