গর্ডনের ঝলকে বার্সেলোনার অপ্রতিরোধ্য জয়
কিছু অপেক্ষার শেষ হয় দীর্ঘশ্বাসে, কিছু অপেক্ষা ফুরোয় এক মুহূর্তের ঝলকে। অ্যান্থনি গর্ডনের জন্য গল্পটা ছিল দ্বিতীয়টির মতো। আন্তর্জাতিক বিরতিতে ইংল্যান্ডের জার্সিতে গোলের পর গোল করে নিজের আত্মবিশ্বাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড। সেই আত্মবিশ্বাস সঙ্গে নিয়েই ফিরেছিলেন বার্সেলোনায়। ক্লাবের হয়ে গোলের অপেক্ষা যে এত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে, তা হয়তো প্রতিপক্ষের রক্ষণও আঁচ করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বিরতি শেষে মাঠে ফিরে মাত্র ৭৮ সেকেন্ডেই জালের দেখা পেলেন গর্ডন। যেন ম্যাচের শুরুতেই ঘোষণা দিলেন, এত দিন গোলের যে হিসাব জমে ছিল, এবার তা চুকিয়ে দেওয়ার পালা।
গর্ডনের সেই বিদ্যুৎগতির সূচনাই যেন বাকি ম্যাচের গল্পের ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিল। ১০ অক্টোবর ২০২৬ বার্সালোনার স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু তে অনুষ্ঠিত ম্যাচে হেতাফেকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জয় তুলে নেয় বার্সেলোনা। গর্ডনের পর গোলের খাতায় নাম লেখালেন গাব্রিয়েল জেসুস ও জুলস কুন্দে। তাতে লা লিগায় মৌসুমের প্রথম আট ম্যাচের আটটিতেই জয়ের কীর্তি গড়ল কাতালানরা। ২৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থানও ধরে রাখল তারা। প্রতিপক্ষ বদলেছে, মাঠ বদলেছে, কিন্তু বার্সেলোনার জয়ের গল্পে আপাতত কোনো ছেদ নেই।
গর্ডনের গোলটি ছিল শুধু দ্রুততম সূচনার গল্প নয়, ছিল তার আত্মবিশ্বাসেরও প্রতিচ্ছবি। বার্সেলোনার জার্সিতে লা লিগায় প্রথম গোল করার পর তার উদ্যাপনে বাড়তি উচ্ছ্বাসের চেয়ে স্বাভাবিকতাই ছিল বেশি। যেন গোলটি অপ্রত্যাশিত কোনো উপহার নয়, বরং নিজের সামর্থ্যের প্রতি বিশ্বাসেরই স্বাভাবিক পরিণতি। আর সেই গোলের পরও থেমে থাকেননি তিনি। ১২ মিনিটের মাথায় বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে বক্সে দারুণ একটি ক্রস পাঠান। দানি ওলমোর হালকা ছোঁয়াও লাগে বলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। গোল না হলেও আক্রমণে গর্ডনের ধার যে কমেনি, সেটি বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
বার্সেলোনার আক্রমণের গতি বাড়ছিল আর হেতাফে তখন ব্যস্ত নিজেদের দুর্গ সামলাতে। গাভির হেড দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দিয়ে গোলরক্ষক সোরিয়া কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি ফিরিয়েছিলেন শিবিরে। তার প্রতিটি সেভ যেন হেতাফেকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখার নতুন সুযোগ তৈরি করছিল। কিন্তু একের পর এক আক্রমণ সামলাতে গিয়ে রক্ষণে যে সামান্য ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, তারই প্রমাণ মিলল ৩০ মিনিটে। নিজেদের বক্সে বলের নিয়ন্ত্রণ হারালেন জাইদ রোমেরো। সুযোগসন্ধানী গাব্রিয়েল জেসুস সেই উপহার ফিরিয়ে দেওয়ার মানুষ নন। মুহূর্তের মধ্যেই বল জালে, ব্যবধান ২-০। রাফিনিয়া দলে না থাকলেও বার্সেলোনার গোল করার লোকের যে অভাব নেই, সেটি আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল।
দুই গোলের ব্যবধান তৈরি হওয়ার পরও বার্সেলোনা আক্রমণের ঝাঁজ কমায়নি। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন কুন্দে। রদ্রির ভাসানো ক্রস ধরে অফসাইডের ফাঁদ এড়িয়ে একেবারে সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। সামনে তখন গোলের সুবর্ণ সুযোগ, কিন্তু শট নিতে সামান্য দেরি করে ফেলেন ফরাসি ডিফেন্ডার। সেই ছোট্ট বিলম্বই সোরিয়াকে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। বল জালে না জড়ালেও বার্সেলোনার চাপ যে বিরতির আগেই হেতাফেকে কোণঠাসা করে ফেলেছিল, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল না।
বিরতির পর মাঠে ফিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে গর্ডন। লামিনে ইয়ামালের নিখুঁত থ্রু পাস পেয়ে গতির ঝড় তুলে এগিয়ে যান গোলের দিকে। সামনে তখন আরও একটি গোলের হাতছানি, আর গর্ডনের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ বাধা সোরিয়া। গোলরক্ষক এবারও নিজের দায়িত্বে অবিচল। বক্সের বাইরে পর্যন্ত ছুটে এসে গর্ডনের পা থেকে বল কেড়ে নেন তিনি। গোলের ব্যবধান বাড়াতে না পারলেও গর্ডনের গতি, মুভমেন্ট আর আক্রমণে জায়গা খুঁজে নেওয়ার দক্ষতা বারবার হেতাফের রক্ষণকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
তবে গর্ডনের দ্বিতীয় গোল না পাওয়ার আক্ষেপ বেশিক্ষণ আলোচনায় থাকেনি। কারণ বার্সেলোনার আক্রমণভাগে তখনও বাকি ছিল আরও একটি সুন্দর দৃশ্য। ম্যাচের ৭৩ মিনিটে ডান দিক থেকে বল নিয়ে এগিয়ে আসেন ইয়ামাল। তার ক্রসটি ছিল নিখুঁত, আর সেই ক্রসের শেষ ঠিকানা খুঁজে নেন কুন্দে। আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে দারুণ ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠান তিনি। স্কোরলাইন ৩-০। এবার আর ফেরার কোনো পথ খোলা রইল না হেতাফের সামনে। ম্যাচের ফলাফল তখন অনেকটাই নির্ধারিত, বাকি সময়টুকু যেন শুধু বার্সেলোনার আধিপত্যের শেষ দৃশ্যগুলো দেখার অপেক্ষা।
শেষ বাঁশি বাজার আগে গোলের উৎসবে যোগ দিতে চেয়েছিলেন ইয়ামালও। তার নেওয়া ভলি অল্পের জন্য দূরের পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায়। গোলটি হলে রাতের গল্পে আরও একটি উজ্জ্বল মুহূর্ত যোগ হতো। তবে সেটি না হলেও বার্সেলোনার আনন্দে ঘাটতি ছিল না। তিন গোল, আরও একটি জয় এবং লিগে শতভাগ সাফল্যের ধারাবাহিকতা, সব মিলিয়ে দিনটি তাদের জন্য ছিল পরিপূর্ণ।
এই জয়ের সবচেয়ে বড় স্বস্তি হয়তো শুধু তিন পয়েন্টে নয়, বরং দলের আক্রমণভাগের বৈচিত্র্যে। গর্ডনের দ্রুত গোল, জেসুসের সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা আর কুন্দের নিখুঁত ফিনিশিং দেখিয়ে দিয়েছে, একজন খেলোয়াড় অনুপস্থিত থাকলেও বার্সেলোনার গোলের পথ বন্ধ হয়ে যায় না। আর আট ম্যাচে আট জয় বলে দিচ্ছে, এই দলটি আপাতত শুধু প্রতিপক্ষকে হারাচ্ছে না, নিজেদের ছন্দকেও প্রতিনিয়ত আরও ধারালো করে তুলছে।
গর্ডনের অপেক্ষা শেষ হয়েছে মাত্র ৭৮ সেকেন্ডে। কিন্তু বার্সেলোনার জয়ের অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নয়। একের পর এক ম্যাচে নতুন নায়ক, নতুন মুহূর্ত আর একই পরিণতি। লা লিগার দৌড়ে আপাতত কাতালানদের গতি থামানোর মতো কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

স্পোর্টস ডেস্ক