নতুন ফোন নয়, পুরোনোটাই দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখবেন যেভাবে
প্রতি বছরই নতুন স্মার্টফোন নিয়ে হাজির হয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। নতুন মডেলে থাকে আকর্ষণীয় নকশা, নতুন কিছু ফিচার কিংবা আগের তুলনায় সামান্য উন্নতি। এসব দেখেই অনেকের মনে হয়, পুরোনো ফোনটি বুঝি আর রাখার মতো নয়। কিন্তু আপনার বর্তমান ফোনটি যদি ভালোভাবেই কাজ করে, তাহলে শুধু নতুন মডেল এসেছে বলেই সেটি বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই।
সঠিকভাবে যত্ন নিলে একটি স্মার্টফোন প্রতি বছর তো নয়ই, এমনকি দুই বছর পরপরও বদলানোর প্রয়োজন পড়ে না। বরং ফোনের আয়ু বাড়াতে পারলে একদিকে যেমন নতুন ডিভাইস কেনার খরচ বাঁচবে, অন্যদিকে কমবে ইলেকট্রনিক বর্জ্যও।
সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বেশিরভাগ মানুষ দুই থেকে তিন বছর পরপর ফোন পরিবর্তন করেন। অনেক মোবাইল অপারেটরের প্ল্যানেও দুই বছর পর ফোন আপগ্রেড করার সুযোগ থাকে। তবে ফোনটি ঠিকঠাক থাকলে সেই সুযোগ নেওয়া জরুরি নয়। বরং কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুললেই বর্তমান ফোনটিকে আরও দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব। তাই ফোনকে যথাসম্ভব দীর্ঘস্থায়ী করার ছয়টি উপায় নিচে দেওয়া হলো।
ফোনের ব্যাটারির স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন
ফোন দীর্ঘদিন ভালো রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ব্যাটারির যত্ন। ব্যাটারি ভালো রাখতে মূলত দুটি বিষয়ে নজর দিতে হবে—চরম তাপমাত্রা এড়িয়ে চলা এবং সঠিক নিয়মে ফোন চার্জ দেওয়া।
অ্যাপল, গুগল ও স্যামসাংয়ের পরামর্শ অনুযায়ী, ৬২ থেকে ৭২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা ফোনের জন্য আদর্শ। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রির নিচে বা ৯৫ ডিগ্রির ওপরে চলে গেলে ব্যাটারির ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় ফোন থাকলে ব্যাটারির স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
তাপমাত্রার পাশাপাশি ফোন কখন এবং কীভাবে চার্জ দিচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অবাক করার মতো হলেও বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত ফোন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ না করার পরামর্শ দেন।
আইফিক্সিটের লেখক চার্লি সরেলের মতে, ব্যাটারির স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করে এটি কতগুলো চার্জিং সাইকেলের মধ্য দিয়ে যায় তার ওপর। নির্দিষ্টসংখ্যক চার্জিং সাইকেলের পর ব্যাটারি আগের মতো কার্যকরভাবে চার্জ ধরে রাখতে পারে না।
সারারাত ফোন চার্জে রেখে দেওয়ার অভ্যাসও ব্যাটারির জন্য ভালো নয়। দীর্ঘ সময় চার্জে থাকার কারণে ধীরে ধীরে ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে। তবে অনেক অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও আইফোনে এ সমস্যা কমাতে ‘অপ্টিমাইজড চার্জিং’ সুবিধা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোনের চার্জ ২০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে রাখলে ব্যাটারির আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
৮০ শতাংশেই থামবে ফোনের চার্জ
ফোন চার্জ দেওয়ার সময় প্রতিবার ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর অপেক্ষা করতে হবে না। নতুন মডেলের আইফোন, স্যামসাং গ্যালাক্সি ও গুগল পিক্সেল ফোনে এমন সুবিধা রয়েছে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমায় চার্জ থামিয়ে রাখা যায়।
আইফোন ১৫ বা পরবর্তী মডেলে ‘সেটিংস’ থেকে ‘ব্যাটারি’, এরপর ‘চার্জিং’ এবং ‘চার্জ লিমিট’-এ গিয়ে ৮০ শতাংশ চার্জের সীমা নির্ধারণ করা যায়। আইফোন ১৪ ও আগের মডেলগুলোতেও ‘অপ্টিমাইজড ব্যাটারি চার্জিং’ সুবিধা রয়েছে, তবে সেখানে ৮০ শতাংশে চার্জ সীমাবদ্ধ করার সুযোগ নেই।
স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোনে ‘সেটিংস’ থেকে ‘ব্যাটারি’ এবং এরপর ‘ব্যাটারি প্রটেকশনে’-এ গিয়ে ‘ম্যাক্সিমাম’ অপশন নির্বাচন করলে ৮০ শতাংশ চার্জের সীমা নির্ধারণ করা যায়।
গুগল পিক্সেল ফোনে রয়েছে ‘অ্যাডাপ্টিভ চার্জিং’। এটি ব্যবহারকারীর চার্জ দেওয়ার অভ্যাস বুঝে চার্জিংয়ের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। ‘সেটিংস’ থেকে ‘সেটিংস’ এবং এরপর ‘অ্যাডাপ্টিভ চার্জিং’ অপশনে গিয়ে এটি চালু করা যায়। তবে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করার একটি অসুবিধাও আছে—একবার চার্জ দিলে তা স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক কম সময় স্থায়ী হবে।
ব্যাটারি দীর্ঘক্ষণ চালাতে কমান স্ক্রিনের ব্যবহার
স্মার্টফোনের ডিসপ্লে ব্যাটারি খরচের বড় একটি কারণ। তাই ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে গেলে ‘ডার্ক মুড’ ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি ‘অটো ব্রাইটনেস’ বা ‘অ্যাডাপ্টিভ ব্রাইটনেস’ চালু রাখলেও কিছুটা ব্যাটারি সাশ্রয় করা সম্ভব। ফোন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকার পর স্ক্রিন কতক্ষণ জ্বলবে, সেটিও কমিয়ে দিন। ‘স্ক্রিন টাইমআউট’ ৬০ সেকেন্ডের নিচে রাখলে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহারে ব্যাটারি খরচ কমবে।
ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে এলে গুগল ম্যাপস বা স্ট্রাভার মতো জিপিএস নির্ভর অ্যাপের ব্যবহার কমানো যেতে পারে। প্রয়োজনে ‘লো পাওয়ার মুড’ চালু রাখুন। আর বাইরে দীর্ঘ সময় থাকলে সঙ্গে একটি পাওয়ার ব্যাংক রাখাও কাজে আসতে পারে।
মাঝে মধ্যে দেখে নিন ব্যাটারির অবস্থা
ফোনের ব্যাটারি কতটা ভালো আছে, সেটিও সহজেই জানা যায়। আইফোনে ‘সেটিংস’ থেকে ‘ব্যাটারি’ এবং এরপর ‘ব্যাটারি হেলথ’-এ গেলে ব্যাটারির অবস্থা দেখা যায়। সেখানে ‘ম্যাক্সিমাম ক্যাপাসিটি’ অপশনে ব্যাটারি কতটা চার্জ ধরে রাখতে পারছে, তার ধারণা পাওয়া যায়। এই মান ১০০ শতাংশের যত কাছাকাছি থাকবে, ব্যাটারির সক্ষমতাও তত ভালো।
অ্যান্ড্রয়েড ফোনে প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোনে ‘সেটিংস’ থেকে ‘ডিভাইস কেয়ার’-এ যেতে হবে। এরপর ‘ডায়াগনস্টিক’, তারপর ‘ফোন ডায়াগনস্টিকস’ নির্বাচন করলে ব্যাটারি পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া যাবে। এর জন্য স্যামসাং মেম্বারস অ্যাকাউন্টে লগইন করতে হবে। এরপর ‘ব্যাটারি স্ট্যাটাস’ নির্বাচন করে ব্যাটারির অবস্থা পরীক্ষা করা যাবে।
গুগল পিক্সেলের ক্ষেত্রে ব্যাটারি-সংক্রান্ত সুবিধা মডেলভেদে ভিন্ন হতে পারে। পিক্সেল ৮এ এবং পরবর্তী মডেলগুলোতে অ্যান্ড্রয়েড ১৬ বা নতুন সংস্করণ চললে ‘ব্যাটারি হেলথ’ সুবিধা পাওয়া যায়। ‘সেটিংস’ থেকে ‘ব্যাটারি’ এবং এরপর ‘ব্যাটারি হেলথ’-এ গেলে ব্যাটারির স্বাস্থ্য, ধারণক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় কিছু পরামর্শ দেখা যাবে।
ফোনকে বাহ্যিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখুন
আধুনিক স্মার্টফোনগুলো আগের তুলনায় পানি ও ধুলাবালি প্রতিরোধী এবং অনেক বেশি শক্তিশালী স্ক্রিন নিয়ে বাজারে আসে। তারপরও দুর্ঘটনা এড়াতে ফোনে ভালো মানের কভার ও স্ক্রিন প্রটেক্টর ব্যবহার করা জরুরি।
ফোন হাত থেকে পড়ে গেলে স্ক্রিনে ফাটল, আঁচড় কিংবা অন্য কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কভার ও স্ক্রিন প্রটেক্টর এসব দুর্ঘটনার ক্ষতি অনেকটাই কমাতে পারে। পাশাপাশি ফোন ভালো অবস্থায় থাকলে ভবিষ্যতে বিক্রি বা ট্রেড-ইন করার সময়ও তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
নিয়মিত পরিষ্কার করুন ফোন
শুধু ফোনের স্ক্রিন পরিষ্কার রাখলেই হবে না। চার্জিং পোর্ট, স্পিকার গ্রিলসহ বিভিন্ন অংশেও ধুলা ও ময়লা জমতে পারে। দীর্ঘদিন এসব জায়গা অপরিষ্কার থাকলে চার্জিং বা স্পিকারের কার্যকারিতায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফোন পরিষ্কারের জন্য মাইক্রোফাইবার কাপড়, অল্প ডিশ সোপ, কাঠের টুথপিক এবং ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল বা উপযুক্ত জীবাণুনাশক ওয়াইপ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে পরিষ্কার করার সময় চার্জিং পোর্টে অতিরিক্ত তরল ঢোকানো কিংবা ধাতব কোনো বস্তু দিয়ে খোঁচানো উচিত নয়।
সফটওয়্যার আপডেট করুন
পুরোনো ফোনকে অনেকটাই নতুনের মতো অনুভব করানোর সহজ উপায় হলো নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করা। নতুন অপারেটিং সিস্টেমে বিভিন্ন ফিচার যুক্ত হওয়ার ফলে পুরোনো ফোনেও নতুন মডেলের কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
তবে নতুন সফটওয়্যার ব্যবহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিরাপত্তা। সফটওয়্যার ও প্রাইভেসি আপডেটের মাধ্যমে বিভিন্ন নিরাপত্তা দুর্বলতা দূর করা হয়। কোনো ফোন নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট না পেলে সেটি নতুন ধরনের সাইবার ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে পুরোনো সফটওয়্যার সংস্করণে অনেক অ্যাপের নতুন ও নিরাপদ সংস্করণ ব্যবহারেও সমস্যা হতে পারে। তাই ফোনে নতুন সফটওয়্যার বা সিকিউরিটি আপডেট এলে সম্ভব হলে দ্রুত ইনস্টল করা ভালো।
ফোনের স্টোরেজ খালি রাখুন
ফোনের স্টোরেজ পুরোপুরি ভর্তি হয়ে গেলে এর স্বাভাবিক কর্মক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। ছবি, ভিডিও, গান, গেম ও বিভিন্ন ডাউনলোড ধীরে ধীরে স্টোরেজের বড় অংশ দখল করে নেয়। বিশেষ করে বড় আকারের গেমগুলো অনেক জায়গা নিতে পারে। যেমন, ‘কল অব ডিউটি’র মতো একটি গেমের ফাইলের আকার ১২ জিবি পর্যন্ত হতে পারে। অতিরিক্ত ম্যাপ ও রিসোর্স যুক্ত হলে জায়গার প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
তাই নিয়মিত অপ্রয়োজনীয় ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলুন। পুরোনো ডাউনলোড সরিয়ে দিন এবং যেসব অ্যাপ বা গেম ব্যবহার করেন না, সেগুলো আনইনস্টল করুন। বড় ফাইল চাইলে ক্লাউড স্টোরেজেও সরিয়ে রাখা যায়। মেসেজে জমে থাকা অপ্রয়োজনীয় ছবি ও ভিডিও মুছে ফেললেও অনেকটা জায়গা খালি হবে।
ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণের জন্য আইক্লাউড বা গুগল ড্রাইভের মতো ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার স্পটিফাই বা অ্যাপল মিউজিকের মতো স্ট্রিমিং সেবা ব্যবহার করলে ফোনে বিপুল পরিমাণ গান ডাউনলোড করে রাখার প্রয়োজন হয় না। মাঝেমধ্যে ক্যামেরা রোলও গুছিয়ে নেওয়া ভালো। একই ছবির একাধিক কপি, ঝাপসা ছবি কিংবা পুরোনো স্ক্রিনশট মুছে ফেললে অল্প সময়েই অনেক স্টোরেজ খালি করা সম্ভব।
নতুন ফোন কেনার আগে পুরোনো ফোন মেরামত করুন
ফোনের কোনো একটি অংশ নষ্ট হলেই পুরো ডিভাইস বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত বা প্রতিস্থাপন করলেই ফোন আরও কয়েক বছর ব্যবহার করা সম্ভব। বিশেষ করে পুরোনো ফোনের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে গেলে নতুন ফোন কেনার আগে ব্যাটারি পরিবর্তনের কথা ভাবা যেতে পারে। এতে তুলনামূলক কম খরচে ফোনটির ব্যবহারযোগ্য সময় আরও বাড়ানো সম্ভব।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

ফিচার ডেস্ক