দেড়শো বছরের নস্টালজিয়ায় মোড়া লালকুঠির অন্দরমহলে
পুরান ঢাকার ইট-সুরকিতে ঘেরা অলিগলি, রিকশার টুংটাং শব্দ আর ব্যস্ততার ভিড় ঠেলে যখন বুড়িগঙ্গার পাড়ে পা রাখবেন, তখন হঠাৎ করেই বাতাসের গতি বদলে যাবে।
নদীর চঞ্চল জলের মৃদু হাওয়া আর দেড়শো বছরের পুরোনো এক লাল ইটের ইমারত আপনাকে এক পলকে ফিরিয়ে নেবে টাইম মেশিনের পেছনের কোনো অধ্যায়ে। ব্রিটিশ, মুঘল ও ইউরোপীয় শিল্পশৈলীর অপূর্ব সংমিশ্রণে গড়া এই ঐতিহাসিক লালকুঠি বা ‘নর্থব্রুক হল’ যেন কালের সাক্ষী হয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চলুন, ইতিহাসের নানা পটপরিবর্তন পেরিয়ে নতুন রূপে প্রাণ ফিরে পাওয়া এই লালকুঠির অন্দরমহল থেকে ঘুরে আসি।
১৮৭৪ সালে ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে এই টাউন হলটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এরপর ১৮৮০ সালে জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক স্বয়ং ভবনটি উদ্বোধন করেন এবং তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ হয় ‘নর্থব্রুক হল’। তবে এর নজরকাড়া লাল রঙের কারণে স্থানীয়দের মুখে মুখে এটি ‘লালকুঠি’ নামেই বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে।
ঢাকার স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নির্মিত এই ভবনের মূল অংশে একসময় ছিল নাট্যশালা, সভাকক্ষ, মিলনায়তন ও গ্রন্থাগার। ফলে খুব দ্রুতই এটি হয়ে ওঠে ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। এই ভবনের ইতিহাসের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, যেদিন ঢাকা পৌরসভা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এই প্রাঙ্গণেই সংবর্ধনা দিয়েছিল।
কালের পরিক্রমায় ও বহু বছর ধরে অবহেলার কারণে ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটি একসময় জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে। এমনকি ২০১৬ সাল থেকে এটি মিলনায়তন হিসেবেও সম্পূর্ণ অব্যবহৃত ছিল। তবে বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ভবনটির পুনঃসংস্কার ও সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটিতে পুরোদমে সংস্কার কাজ চলছে। নতুন রঙের প্রলেপে যেন সজীবতা ফিরে পেয়েছে দেড়শো বছরের পুরোনো এই লালকুঠির সৌন্দর্য। ভবনের সম্মুখে তৈরি করা হয়েছে একটি মার্বেল পাথরের বৃহৎ ফোয়ারা।
লালকুঠির এই সংস্কার কাজ স্থানীয় মানুষের মনেও নতুন করে আনন্দের জোয়ার ও আগ্রহ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের মতে,“এটি শুধু একটি দালান নয়, আমাদের জীবনের অংশ ছিল। সংস্কারের ফলে সেই স্মৃতিগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে।” দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় অনেকের আগ্রহ কমলেও, সংস্কার শেষে এই ভবন তার পুরোনো জৌলুস ফিরে পাবে বলে সবাই আশাবাদী।
যেহেতু এটি একটি সংবেদনশীল ঐতিহাসিক স্থাপনা, তাই প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের মাধ্যমেই এর সংস্কার কাজ করানো হচ্ছে। এখানকার কারিগররা দেশের ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলোর সংস্কারে অভ্যস্ত। ভবনটি ঠিক ১০০ বছর আগে যে রূপে ছিল, সেই রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
সন্ধ্যা নামছে বুড়িগঙ্গার বুকে। নদীর জলে প্রতিফলিত হচ্ছে লঞ্চের মিটমিটে আলো আর লালকুঠির নতুন রূপের দীপ্তি। ফোয়ারার জলে ছিটকে পড়া জলের ফোঁটায় যেন ইতিহাস ফিসফিস করে বলছে—রবীন্দ্রনাথের পায়ের ধুলো পড়া এই আঙিনা আবারও মুখরিত হবে নাটকের ডায়লগে, সুরের মূর্ছনায় আর মানুষের পদচারণায়। অতীত আর বর্তমানের এই সেতুবন্ধন ছুঁয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নেন পথচারী, বুঝি দীর্ঘ ঘুমে থাকা এক পুরোনো রাজকুমার চোখ মেলে তাকাল নতুন সকালের আলোয়।
লালকুঠিতে কীভাবে যাবেন
ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া বা সদরঘাটগামী বাসে চড়ে রায় সাহেব বাজার বা বাবুবাজার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় নামতে হবে। বাবুবাজার ব্রিজ বা ওয়াইজঘাট এলাকা থেকে রিকশা নিয়ে সোজা চলে যাওয়া যায় বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা ফরাশগঞ্জ লেনে, যেখানে এই লালকুঠিটি অবস্থিত। রিকশাওয়ালাকে শুধু ‘লালকুঠি’ বা ‘নর্থব্রুক হল রোড’ বললেই তারা সরাসরি পৌঁছে দেবে আপনাকে।

ফিচার ডেস্ক