দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চান হলি আর্টিজানে নিহত এসি রবিউলের মা
গুলশানের হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে ২০১৬ সালের ১ জুলাই যে দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন, তাঁদের একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) রবিউল করিম।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রামে কথা হয় পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিমের মা কারিমুন্নেসা বেগমের সঙ্গে। ছেলের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকারীদের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়। এ রায় যেন সবার কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। আমি চাই না আর কোনো মা যেন অকালে তার সন্তানকে হারায়। কোনো সন্তান যেন এভাবে তার বাবাকে না হারায়। কোনো স্ত্রী যেন তার স্বামীকে না হারায়।’
আজ সেই জঙ্গি হামলার রায় ঘোষণা করবেন আদালত। রায়ে দোষীদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় এমন আশা নিহত রবিউলের পরিবারের সদস্যদের।
রবিউলের মৃত্যুর পর একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি। দুই বছর আগে রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র রবিউলের আত্মাহুতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চিন্তা থেকেই রবিউলের স্ত্রীকে চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চাকরির সুবিধার্থে তিনি ঢাকার ধামরাই উপজেলার কালামপুরে বাবার বাড়িতে থাকছেন।
রবিউলের দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে সাজিদুল করিম (৮) পড়ছে ধামরাইয়ের স্থানীয় একটি স্কুলে। ছোট মেয়ে রাইমার বয়স সাড়ে তিন বছর। বাবার মৃত্যুর এক মাস পরেই পৃথিবীর মুখ দেখে রাইমা।
রায় নিয়ে প্রত্যাশার কথা জানতে কথা হয় রবিউল করিমের স্ত্রী উম্মে সালমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীরা যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। দেশ ও দেশের বাইরের সবার কাছে যেন এই রায় অনুকরণীয় হয়ে থাকে। তাহলেই রবিউলের আত্মা শান্তি পাবে।’
তিনি আরো জানান, ২০১২ সালে রবিউল তাঁর নিজ উদ্যোগে গ্রামের ঝরে পড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়াশোনার জন্য ব্লুমস নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন। মৃত্যুর পর রবিউলের কয়েকজন বন্ধু কোনোরকমে স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছেন। নিহত পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী বলেন, ‘সরকার যদি এই স্কুলটির দিকে একটু নজর দিত, তাহলে রবিউলের স্বপ্নটা বেঁচে থাকত।’
উম্মে সালমা আরো বলেন, ‘আমার স্বামীকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু তার কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। সরকার যদি একটা সনদের ব্যবস্থা করে, তাহলে ভবিষ্যতে আমার সন্তানেরা তার প্রমাণ দিতে পারবে।’
এসি রবিউল করিমের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস বলেন, ‘একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হবে যে দেশবাসী ও সরকার জঙ্গিবাদকে কখনো প্রশয় দেয়নি বা ভবিষ্যতেও দেবে না। এই রায়ের দিকে শুধু দেশ নয়, বিশ্ববাসীও তাকিয়ে আছে।’
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। হামলার পর রাতেই তারা ২০ জনকে হত্যা করে। সেদিনই উদ্ধার অভিযানের সময় বন্দুকধারীদের বোমার আঘাতে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরের দিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে নিহত হয় পাঁচ হামলাকারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরেকজনের মৃত্যু হয়।
জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপত্র ‘আমাক’ হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’। এ ঘটনায় গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। এ মামলায় আজ রায় ঘোষণা করা হবে।
আট আসামি হলো জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, রাশেদুল ইসলাম ওরফে র্যাশ, সোহেল মাহফুজ, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, হাদিসুর রহমান সাগর, শরিফুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।
গত বছরের ২৬ নভেম্বর মামলাটির বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ২৩ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়। পরে হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস।
এ মামলায় অভিযোগপত্রে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন আসামি বিভিন্ন অভিযানে ও পাঁচজন হলি আর্টিজানে অভিযানের সময় নিহত হয়েছে। অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গি হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল।
এ ছাড়া বিভিন্ন ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযানে নিহত আটজন হলো তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ