সংগ্রহশালা : কষ্ট দেয়, প্রেরণা দেয়
দেওয়ালে লাগানো বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ছবি। প্রতিবাদী পোস্টার, যা অনুপ্রেরণা দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার। আছে ১৯৫২ আর ১৯৬৯ সালের উজ্জীবিত মিছিলের ছবি। যেসব মিছিলের স্লোগান কাঁপিয়ে দেয় শাসকশ্রেণির ভিত। দর্শনার্থীরা নীরবে দাঁড়িয়ে দেখেন স্বাধীনতার এসব নিদর্শন। সঙ্গে ভাসে মুক্তিযুদ্ধের গান। আবহটাই এমন যে কেউ প্রেরণা নিতে বার বার ছুটে আসতে চাইবে এখানে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’ এমনই একটি প্রেরণার নাম। শিক্ষার্থীর পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতার আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন দেখতে এখানে আসে। আর ফিরে যায় গভীর অনুভব নিয়ে, এক বুক প্রেরণা নিয়ে।
১৯৭৬ সালে চালু হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’। এ সংগ্রহশালায় আছে প্রায় দুই হাজার মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত বই।
১৯৭৬ সাল ২১তম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন কমিটির সভায় ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়। পরে ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। চমৎকার নৈপূণ্য সমৃদ্ধ এই সংগ্রহশালায় ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২৫০টি নিদর্শন সংগ্রহ করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে তা এখনো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়।

আছে প্রেরণার স্মারক
সংগ্রহশালায় আছে ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ ২৫ মার্চ কালরাত্রি ও মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ের কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র। এর মধ্যে ২০০৭ থেকে ২০১৩ সালে প্রায় ৫৫০টি ছবি লেমিনেটিং ও ফ্রেম সংস্কার করে তিনটি গ্যালারিতে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।
এই আলোকচিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৫২ সালে আমতলা সভা, প্রথম কালো পতাকা উত্তোলন, শহীদ বরকত, ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি, মিছিলের অগ্রভাগে ড. জোহা, ছাত্রীদের মিছিল, ২১ ফেব্রুয়ারির ঢাকা, নগ্নপদ মিছিল, শহীদ বরকতের মাজারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, ১৯৬৯ সালের মওলানা ভাসানী, পুলিশের হামলায় আহত শিক্ষার্থী, ১৯৬৯ সালে জনতার রোষ, শহীদ আসাদ ও শহীদ মতিউরের ছবি, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ড. জোহা, স্বাধীনতার ডাক ’৭১, সংগ্রামী জনতা ও সামরিক বাহিনী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মিছিল, ১৯৭১ সালে গুলি চালানোর পূর্ব মুহূর্ত, শহীদের শবযাত্রা, কুকুর খাচ্ছে বাঙালির লাশ, যশোরে ধর্ষিতা, ১৯৭১ সালে জগন্নাথ হল হত্যাকাণ্ড, শহীদ ড. ফজলে রাব্বীর মৃতদেহ, বুদ্ধিজীবী হত্যার রায়ের বাজার বধ্যভূমি, হানাদার মুক্ত ঢাকা শহরসহ আরো অনেক নিদর্শন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার দলিল-দস্তাবেজে আছে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রশীদুল হাসান, সিরাজুদ্দিন হোসেন প্রমুখের দুর্লভ রোজনামচা, শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের সেই বিখ্যাত পোস্টার ‘অ্যানাইহিলেট দিস ডেমোস’। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রচারপত্র ‘জয় বাংলা’র কপিসমূহ, আত্মসমর্পণের দলিলের চিত্র, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গণকবর থেকে প্রাপ্ত নাম না জানা শহীদদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র প্রভৃতি।

শিল্পী মনীন্দ্র নাথ রায়ের ম্যুরাল চিত্র খচিত সংগ্রহশালা ভবনের ভিতরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বহু তৈলচিত্র, ছাপচিত্র ও জলরঙের চিত্র। শিল্পী হাশেম খান, রফিকুন নবী, মুস্তফা মনোয়ার, মুস্তফা আজিজ, দেবদাস চক্রবর্তী, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ চিত্রশিল্পীর শিল্পকর্ম এখানে স্থান পেয়েছে।
‘চোখের কোণে জল এসে গেছে’
সংগ্রহশালার গ্যালারিগুলোতে মৃদু শব্দে বাজে মুক্তিযুদ্ধের গান। দর্শনার্থীরা অনেকটা নির্বাক চোখে দেখে বাংলার বীরদের। তারপর মনে ভিতরে জমা হওয়া কষ্ট, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার কথা আপন মনে লেখে যাচ্ছেন মন্তব্যের খাতায়। তাই দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা না বলে তাঁদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁদের অনুভূতি জানতে সাহায্য নেই মন্তব্যের খাতার।
এ রকমই একজন দর্শনার্থীর নাম সুবাহ বিনতে আহসান। নরসিংদীর পশ্চিম ব্রাহ্মন্দীর এই বাসিন্দা লেখেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের নানা রকম নিদর্শনের সঙ্গে আমার এর আগেও গণমাধ্যমের বদৌলতে সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু এই সংগ্রশালা ভ্রমণ ছিল অনেকটাই টাইমমেশিনের মধ্য দিয়ে একে একে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশকে সরজমিনে ঘুরে দেখা। দেখার পর ভালো লেগেছে, আবার অদ্ভূত বিষাদে মন ভরে যাচ্ছে। সত্যিই কি শহীদদের ভাষার কথা বলছে বাংলাদেশ?’

আরেক দর্শনার্থী মাহমুদা মামুন মুন্না লেখেন, ‘মানুষের মানবিকতার অবক্ষয় যদি যুগ যুগ ধরেই থাকে তবে মানুষের প্রয়োজন কী? সংগ্রহশালাটি কষ্টের ও বেদনাদায়ক।’
সংগ্রশালাটি ঘুরতে এসে অনেকেই হয়ে পড়েন আবেগতাড়িত। এমনই একজন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এস. মাহমুদ রিহাব। তিনি লেখেন, ‘রাবিতে অবস্থিত শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা দেখে আমি বিস্মিত। আমার চোখের কোণে জল এসে গেছে। আমি সত্যিই গর্বিত এ দেশে জন্মগ্রহণ করে। তাই গভীরভাবে শ্রদ্ধা জানাই মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদকে।’
‘কখনো কোনো মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রশালা দেখা হয়নি আজকের আগে। বাবা, চাচাদের কাছে গল্প শুনেছি শুধু। এমনই নিজের শহীদ চাচার গল্প শুনেছি। কিন্তু ভিতরে এতটা নাড়া দেয়নি, গায়ে কাঁটা দেয়নি আগে এভাবে। আজ এসে সবচেয়ে বেশি যে কাজটা করছে তা হলো স্তব্ধতা।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন আরেক দর্শনার্থী ফারজানা রীমা।
এই মন্তব্যগুলো সংগ্রহ করতে করতে কথা হয় সংগ্রহশালার গ্রন্থাগার সহকারী রওশন রোজির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাইরের মানুষও প্রচুর আসে এখানে। এখানে না থাকলে বোঝা যাবে না কত মানুষ এটা দেখতে আসে। আবার বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান হলে ওই সময় তো দর্শকের উপস্থিতি হাজার ছাড়িয়ে যায়।’

প্রদীপ সরকার